রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ সুস্বাদু মাল্টার আবাদ হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূল থাকায় ক্রমে এই ফলের আবাদ বাড়ছে। কয়েক বছরের ব্যবধানে মাল্টার বাণিজ্যিক আবাদ করে ভাগ্য বদলেছে অনেক বেকার যুবকের। রাজশাহীতে সবচেয়ে বেশি চাষ হচ্ছে বারি মাল্টা-১-এর। মিষ্টি জাতের দেশি বারি মাল্টা মহানগরী ও উপজেলার বাজার দখল করে নিয়েছে।
কৃষি বিভাগ ও রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালের দিকে এই অঞ্চলে মাল্টার প্রথম আবাদ শুরু হয়। এরপর ২০১৭ সালে বাণিজ্যিক আবাদ শুরু হয়। মাটি ও আবহাওয়া উপযোগী হওয়ায় উঁচু জমিতে বাণিজ্যিকভাবে মাল্টার আবাদে সংশ্লিষ্টরা বেশি লাভবান হচ্ছেন। রোগবালাই ও ঝরে পড়ার হার কম থাকায় এখন বাণিজ্যিকভাবে আবাদ আরো বেড়েছে। চলতি বছর রাজশাহীতে ১৪৮ হেক্টর জমিতে মাল্টার আবাদ হয়েছে। গত বছর মাল্টার আবাদ হয়েছিল ১১৮ হেক্টর জমিতে। এছাড়া অনেকে পতিত জমি ও বাড়ির আঙিনায় কম খরচে মাল্টা আবাদ করছেন বলে জানা গেছে।
সূত্রমতে, কৃষি বিভাগ প্রকল্পের মাধ্যমে মাল্টার চারা বিতরণ করা হচ্ছে। রাজশাহীতে প্রায় ৩৩০টি বাগান থেকে এবার ১৯০ টন মাল্টা উত্পাদিত হয়েছে। বাগান থেকে ৮০ টাকা এবং বাজারে ১০০ টাকা কেজি দামে বিক্রি হচ্ছে মাল্টা। প্রতি হেক্টরে মাল্টার উত্পাদন হচ্ছে গড়ে ১৮ থেকে ২০ টন। গত বছর রাজশাহীতে মাল্টা উত্পাদিত হয়েছিল ১৬০ টন। বিভিন্ন উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিক্ষিত অনেক তরুণ মাল্টার আবাদ করছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী হাফেজ মশিউর রহমান পুঠিয়ার একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতার পাশাপাশি দেড় বিঘা জমিতে মাল্টার বাণিজ্যিক আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, তুলনামূলক কম খরচে তার নতুন বাগানে ফল ধরতে শুরু করেছে। আশা করছেন ভালো ফলন পাবেন। নগরীর বোয়ালিয়া কৃষি কর্মকর্তা ফাহামিদা নাহার নগরীর তেরখাদিয়ায় এক বিঘা জমিতে মাল্টার বাগান করেছেন। ২০১৭ সালে লাগানো ৮০টি গাছ থেকে গত বছর ১ লাখ টাকার ফল বিক্রি করেছেন। এবার আরো বেশি বিক্রি হবে বলে আশা করছেন। গোদাগাড়ীর নবীনগরের কৃষক খাইরুল ইসলাম চার বছর আগে চার বিঘা জমিতে মাল্টার বাণিজ্যিক আবাদ করেন। কিন্তু দুর্বৃত্তরা তার কিছু গাছ কেটে ফেলায় গত বছর মাত্র ৫০ হাজার টাকার মাল্টা বিক্রি করেন। এবার তিনি ১ লাখ টাকার মাল্টা বিক্রির আশা করছেন। পুঠিয়ার সেনবাগের জুয়েল রাজ ব্যবসার পাশাপাশি ছয় বিঘা জমিতে মাল্টার বাগান করেছেন। ২০১৬ সালে করা বাগানে তার এ পর্যন্ত ৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। গত বছর তিনি ৬ লাখ টাকার মাল্টা বিক্রি করেছেন। এবার তিনি ১০ লাখ টাকার মাল্টা বিক্রির আশা করছেন। এবার মাল্টার বাণিজ্যিক আবাদ করে পুঠিয়া, পবা, মোহনপুর, তানোর ও গোদাগাড়ীর শিক্ষিত বেকার যুবকেরা নিজেদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছেন বলে জানা গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহীর উপপরিচালক শামছুল হক বলেন, আবহাওয়া অনুকূল থাকায় রাজশাহী অঞ্চলে মাল্টার আবাদ বাড়ছে। তারা চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন। মাল্টা আবাদে জেলায় বছরে এখন ২ কোটি টাকা আয় হচ্ছে। ৫ হাজার মানুষ মাল্টা উত্পাদনে সম্পৃক্ত হয়েছেন। তারা চারাসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করছেন। রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ড. আলীম উদ্দিন বলেন, বারি মাল্টা-১ অত্যন্ত সুস্বাদু। বিঘায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ করে প্রতি বছর ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মাল্টা বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে মাল্টা বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে। ফলে বিদেশি মাল্টার আমদানি কমেছে। আবাদ আরো বাড়লে মাল্টা বিদেশে রপ্তানি করা যাবে।
