করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চলে গেলেন বাংলার শিল্পকলা জগতের অন্যতম নক্ষত্র শিল্পী মুর্তজা বশীর। বরেণ্য এই চিত্রশিল্পী গতকাল শনিবার সকাল ৯টা ১০ মিনিটে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে চিকিত্সাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি....রাজিউন)।
শিল্পের টান তাকে ছুটে নিয়ে বেরিয়েছে সবসময়। এই তো পাঁচ বছর আগেও গ্যালারি কায়ায় এক প্রদর্শনী শুরুর আগে মুর্তজা বশীর বলেছিলেন, ‘আমি অসুস্থ। একসময়ে মনে হচ্ছিল আমি মারা যাব। মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে। এই রকম সময়ে মানুষের কী মনে পড়ে আমি জানি না। সম্ভবত প্রিয় মানুষের মুখ মনে পড়ে। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল আমি আঁকতে চেয়েছি এমন কত ছবি আঁকা হলো না।’ শিল্পী মুর্তজা বশীর এমনই। তাই তার মতো ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্বের মৃত্যু হয় না। তিনি বেঁচে থাকবেন আজীবন। তার কাজে, ছবিতে ও তার সংগ্রামে।
শিল্পীর মেয়ে মুনীরা বশীর জানান, হূদেরাগ, ফুসফুস ও কিডনি জটিলতা নিয়ে গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শুক্রবার নমুনা পরীক্ষায় মুর্তজা বশীরের করোনা পজিটিভ ধরা পড়ে। ৮৮ বছর বয়সি এ চিত্রশিল্পীকে এর আগেও বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা নিয়ে একাধিকবার হাসপাতালে চিকিত্সা নিতে হয়েছে। ফুসফুস ও কিডনি জটিলতার পাশাপাশি তার হূদেরাগও ছিল। তার বাবা প্রখ্যাত ভাষাবিদ জ্ঞানতাপস ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ আর মা মরগুবা খাতুন। ৯ ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট তিনি। মুর্তজা বশীরের জন্ম ১৯৩২ সালের ১৭ আগস্ট। জন্মবার্ষিকীর দুই দিন আগে চিরবিদায় নিলেন তিনি। গতকাল বাদ আসর বনানী কবরস্থানে জানাজা শেষে শিল্পী মুর্তজা বশীরকে দাফন করা হয়।
শিল্পীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়া শোক জানিয়ে বাণী দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম প্রমুখ।
এশিয়াটিক সোসাইটি জানিয়েছে, মুর্তজা বশীরের ‘রক্তাক্ত ২১’কে ভাষা আন্দোলনের ওপর আঁকা প্রথম ছবি হিসেবে গণ্য করা হয়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রতিবাদে মুর্তজা বশীর ছিলেন একেবারে সামনের সারির যোদ্ধা। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ভাষা আন্দোলনে শহিদ আবুল বরকতকে রক্তাক্ত অবস্থায় অন্যদের সঙ্গে তিনি হাসপাতালে নিয়ে যান। ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের ছাদে কালো পতাকা উত্তোলনকারীদের মধ্যে তিনিও ছিলেন। ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনার ওপর ‘রক্তাক্ত ২১ শে’ শিরোনামে ১৯৫২ সালে তিনি লিনোকোটে চিত্রটি আঁকেন, যা হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ শীর্ষক সংকলনে ১৯৫৩ সালে প্রথম মুদ্রিত হয়। ১৯৭১ সালে ১৬ মার্চ শহিদ মিনার থেকে বাহাদুর শাহ পার্ক পর্যন্ত বাংলাদেশে চারু ও কারুশিল্পী পরিষদের উদ্যোগে ‘স্বা-ধী-ন-তা’ মিছিলে নেতৃত্ব দানকারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম।
মুর্তজা বশীর ছিলেন একাধারে চিত্রশিল্পী, ভাষাসংগ্রামী, গবেষক ও ঔপন্যাসিক। চিত্রকলায় অবদানের জন্য ২০১৯ সালে স্বাধীনতা পদক, ১৯৮০ সালে একুশে পদক, ১৯৭৫ সালে শিল্পকলা একাডেমি পদক পেয়েছেন তিনি। ‘দেয়াল’, ‘শহীদ শিরোনাম’, ‘কালেমা তাইয়্যেবা’, ‘পাখা’ শিল্পী মুর্তজা বশীরের আঁকা উল্লেখযোগ্য সিরিজ। তিনি ‘বিমূর্ত বাস্তবতা’ নামে একটি শিল্পধারার প্রবর্তক। এছাড়া ফিগারেটিভ কাজে পূর্ব-পশ্চিমের মেলবন্ধনে তিনি স্বকীয়তার স্বাক্ষর রেখেছেন।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে গল্পগ্রন্থ ‘কাচের পাখির গান’, কাব্যগ্রন্থ ‘এসো ফিরে অনুসূয়া’, উপন্যাস ‘অমিত্রাক্ষর’, নির্বাচিত রচনা ‘আমার জীবন ও অন্যান্য’, গবেষণাগ্রন্থ ‘মুদ্রা ও শিলালিপির আলোকে বাংলার হাবশী সুলতান ও তত্কালীন সমাজ’ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ভারতের বেনারস বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জার্নাল অব দ্য নিউম্যাসটেকি সোসাইটি অব ইন্ডিয়ায়’ প্রাক মোগল যুগের মুদ্রার ওপর বেশ কয়েকটি গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে তার। তিনি ১৯৬৩ সালে উর্দু চলচ্চিত্র ‘কারোয়াঁ’র কাহিনি ও চিত্রনাট্য রচনা করেন। ১৯৬৪ সালে হুমায়ূন কবীর রচিত ‘নদী ও নারীর’ চিত্রনাট্যকার, শিল্প নির্দেশক ও প্রধান সহকারী পরিচালক ছিলেন। ১৯৬৫ সালে উর্দু চলচ্চিত্র ‘ক্যায়সে কাহু’র শিল্প নির্দেশক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
মুর্তজা বশীরের শিক্ষাজীবন শুরু হয় পুরান ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউশনে, এরপর তিনি শিক্ষাগ্রহণ করেছেন বগুড়ার করোনেশন ইনস্টিটিউশন, ঢাকা গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্টস (এখন যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) ও কলকাতা আশুতোষ মিউজিয়ামে। এছাড়া ইতালিতে চিত্রকলা ও ফ্রেস্কো বিষয়ে এবং প্যারিসে মোজাইক ও ছাপচিত্রে অধ্যয়ন করেন তিনি। ‘মন্দির টেরাকোটা শিল্প’ বিষয়ে ভারতে গিয়ে গবেষণা করেন। ১৯৫৫ সালে ঢাকার নবাবপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ড্রইং শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। ১৯৭৩ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে সহকারী অধ্যাপক পদে যোগ দেন। ১৯৯৮ সালে অধ্যাপক হিসেবে অবসরগ্রহণ করেন। মুর্তজা বশীর ১৯৬২ সালে আমিনা বশীরকে বিয়ে করেন। তার দুই মেয়ে মুনীরা বশীর ও মুনিজা বশীর ও এক ছেলে মেহরাজ বশীর। ২০১৭ সালে স্ত্রী আমিনা বশীরকে হারানোর পর তিনি আমিনা বশীর স্মৃতি ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করেন। তিনি বাংলা একাডেমি ও এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের আজীবন সদস্য ছিলেন।
