যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের কিশোরবন্দিদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয় পাঁচ কর্মকর্তার নেতৃত্বে। যত ক্ষণ জ্ঞান না হারায় কিশোররা, তত ক্ষণ চলে নির্যাতন। এভাবে ছয় ঘণ্টার নির্যাতনে তিন কিশোরের জীবনপ্রদীপ নিভে গেলেও কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ জেলা ও পুলিশ প্রশাসন, এমনকি তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সমাজসেবা অধিদপ্তরকেও জানায়নি। বরং একজন কম্পাউন্ডারকে ডেকে চিকিত্সা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। নিহত কিশোরদের নিথর দেহ হাসপাতালে পৌঁছানোর পর সেখান থেকে খবর পেয়ে পুলিশ অভিযানে নামে। কেন্দ্রের অভিযুক্ত পাঁচ কর্মকর্তাকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। এদের মধ্যে প্রধান তিন কর্মকর্তাকে সাত দিন এবং দুজনকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।
‘চুল কাটা নিয়ে বিরোধে’ গত ১৩ আগস্টের এত বড় বর্বর ঘটনা গোটা দেশে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। শনিবার দুপুরে যশোরের পুলিশ সুপার আশরাফ হোসেন তার কার্যালয়ে প্রেসব্রিফিয়ে প্রাথমিক তদন্তের তথ্য সাংবাদিকদের জানান। তিনি জানান, শুক্রবার ১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে হেফাজতে নেওয়ার পর পাঁচ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। গতকাল আদালতে শুনানি শেষে বিচারক তাদের মধ্যে প্রথম তিন জনের সাত দিনের এবং অপর দুজনের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এরা হলেন যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক ও সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, সহকারী তত্ত্বাবধায়ক প্রবেশন অফিসার মাসুম বিল্লাহ, কারিগরি প্রশিক্ষক ওমর ফারুক, ফিজিক্যাল ইন্সট্রাক্টর এ কে এম শাহানুর আলম ও সাইকো সোশ্যাল কাউন্সিলর মুশফিকুর রহমান। এর মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক ও সহকারী পরিচালক আবদুল্লাহ আল মাসুদকে শুক্রবারই সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সাময়িকভাবে বহিষ্কার করেছে। গ্রেফতারকৃত কর্মকর্তাদের ব্যাপারে এসপি বলেন, কেউ হত্যা করার জন্য সরকারি চাকরিতে আসে না। এজন্য যতটা সম্ভব সতর্ক ছিলাম—যেন কারো প্রতি অবিচার না করে ফেলি। কিন্তু এ দায়ভার তাদের নিতে হবে।
পুলিশ সুপার জানান, ঘটনার সূত্রপাত ৩ আগস্ট। এদিন চুল কাটায় পারদর্শী কিশোরবন্দি হূদয়কে চুল কেটে দিতে বলেন কেন্দ্রের নিরাপত্তা প্রধান (হেড গার্ড) নূর ইসলাম। ঈদের আগে হূদয় প্রায় ২০০ বন্দির চুল কাটায় তার হাতব্যথা উল্লেখ করে চুল কাটতে অস্বীকৃতি জানায়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে নূর ইসলাম কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করেন, ‘ওরা ট্যাবলেট খেয়ে নেশাগ্রস্ত হয়ে রয়েছে।’ এছাড়া তিনি হূদয় ও তার বন্ধু পাভেলের মধ্যে অনৈতিক সম্পর্কের ইঙ্গিত করেন। সেখানে উপস্থিত কিশোর নাঈম অভিযোগ শুনে বিষয়টি পাভেলকে জানায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে পাভেল তার কিছু অনুসারী কিশোরকে নিয়ে নূর ইসলামকে মারধর করে। এতে তার হাত ভেঙে যায়। এ ঘটনার সূত্র ধরেই ১৩ আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
কী ঘটেছিল সেদিন : জাতীয় শোক দিবস পালন উপলক্ষ্যে ১৩ আগস্ট যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ১৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন। এই সভায় ‘নূর ইসলামের ওপর হামলাকারীদের শাস্তি প্রদানের’ সিদ্ধান্ত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সিসিটিভিতে শনাক্ত হামলাকারী ১৩ জনসহ আরো কয়েক জনকে বের করে আনা হয়। ওই পাঁচ কর্মকর্তার নেতৃত্বে কয়েক জন কর্মচারী এবং কর্মকর্তার আজ্ঞাবহ সাত-আট জন কিশোরবন্দি ‘অভিযুক্তদের’ মারধর শুরু করেন। এ সময় তাদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয়। মুখে গামছা ঢুকিয়ে জানালা দিয়ে হাত বাইরে বের করে টেনে ধরে পেছনে বেধড়ক মারধর করা হয়। লোহার রড, ক্রিকেট স্ট্যাম্প ইত্যাদি দিয়ে বেপরোয়া মারধর করা হয়। অচেতন হওয়ার পর জ্ঞান ফিরলে আবারও মারধর করা হয়। এরপর এদের হাসপাতালে না পাঠিয়ে প্রায় ছয় ঘণ্টা ফেলে রাখা হয়। পরে অ্যাম্বুলেন্স ও পুলিশের পিকআপে ১৫ জনকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ঘটনার পর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের কর্মকর্তারা ‘দুপক্ষের সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা’ বললেও পরবর্তীকালে আহত কিশোরবন্দিদের বক্তব্যে প্রকৃত ঘটনা বের হয়ে আসতে শুরু করে। পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন আরো জানান, তদন্ত কমিটির পাশাপাশি পুলিশও মামলার তদন্ত অব্যাহত রেখেছে। ১৩ আগস্টের সভায় উপস্থিত ১৯ জনের সাক্ষাত্কার গ্রহণ, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জড়িত হিসেবে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত হওয়ায় পাঁচ কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়াও জড়িত সাত-আট কিশোরবন্দিকে এই মামলায় আইনের আওতায় আনতে আদালতে আবেদন করা হবে।
