সাড়ে ৩ কোটি টাকা আত্মসাত্ অধ্যক্ষসহ তিন জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২০, ০০:১৬

স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটায় অনিয়ম ও  দুর্নীতির অভিযোগে হবিগঞ্জ শেখ হাসিনা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মো. আবু সুফিয়ানসহ তিন জনের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেছে দুদক। রবিবার দুদক হবিগঞ্জ সমন্বিত কার্যালয়ে এসব মামলা দায়ের করা হয়েছে। উভয় মামলায় মোট প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের ফেসবুক পেইজে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক মো. সহিদুর রহমান বাদী হয়ে একটি এবং উপসহকারী পরিচালক মো. ফেরদৌস রহমান বাদী হয়ে অপর মামলাটি দায়ের করেন। মামলার অপর আসামিরা হলেন ঢাকার মোহাম্মদপুরের নির্ঝরা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আফসানা ইসলাম কাকলী এবং ঢাকার ধানমন্ডি এলাকার পুনম ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী এস এম নজরুল ইসলাম নুতন। দুটি মামলাতেই শেখ হাসিনা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মো. আবু সুফিয়ানকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।

দুদকের হবিগঞ্জ সমন্বিত কার্যালয়ের এসআই আব্দুল মোতালেব জানান, সোমবার দুপুরে মামলা দুটি হবিগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, তদন্তের স্বার্থে দুদক চাইলে আসামিদের যে কোনো সময় গ্রেফতার করতে পারে।

একটি মামলার অভিযোগে বলা হয়, আসামিরা সরকারের ১ কোটি ২৯ লাখ ৩৩ হাজার ১২১ টাকা ক্ষতিসাধনপূর্বক আত্মসাত্ করে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ১০৯ ধারাসহ ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

ফেরদৌস রহমান বাদী হয়ে যে মামলা করেছেন, সেখানে বলা হয়েছে, আসামিরা সরকারের ২ কোটি ১৪ লাখ ৪৭ হাজার ৭০০ টাকা আত্মসাত্ করেছেন। আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ১০৯ ধারাসহ ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়।

প্রকাশ, হবিগঞ্জ শেখ হাসিনা মেডিক্যাল কলেজে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বইপত্র, সাময়িকী, যন্ত্রপাতিসহ অন্যান্য সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য ২০১৮ সালে দরপত্র আহ্বান করা হয়। বরাদ্দ ছিল ১৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ভ্যাট ও আয়কর খাতে সরকারি কোষাগারে জমা হয় ১ কোটি ৬১ লাখ ৯৭ হাজার ৭৪৮ টাকা। মালামাল ক্রয় বাবদ ব্যয় দেখানো হয় ১৩ কোটি ৮৭ লাখ ৮১ হাজার ১০৯ টাকা। কিন্তু বাস্তবে ঐ মালামালের মূল্য ৫ কোটি টাকার বেশি নয়, এমনটাই বলেছে দরপত্র প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র। বাকি টাকার পুরোটাই ভাগবাঁটোয়ারা হয়ে যায়। সরবরাহকৃত মালামালের মধ্যে ৬৭টি লেনেভো ল্যাপটপের (মডেল ১১০ কোর আই ফাইভ, কিং জেনারেশন) মূল্য নেওয়া হয় ৯৯ লাখ ৪৯ হাজার ৫০০ টাকা। প্রতিটির মূল্য পড়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ ঢাকায় একই মডেলের ল্যাপটপ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৪২ হাজার টাকায়। ৬০ হাজার টাকা মূল্যের এইচপি কালার প্রিন্টার (মডেল জেড প্রো এম ৪৫২এন ডব্লিউ)-এর দাম নেওয়া হয়েছে ২ লাখ ৪৮ হাজার ৯০০ টাকা। ৫০ জন বসার জন্য কনফারেন্স টেবিল, এক্সিকিউটিভ চেয়ার ও সাউন্ড সিস্টেমে ব্যয় হয়েছে ৬১ লাখ ২৯ হাজার টাকা। জনপ্রতি চেয়ার-টেবিল ও সাউন্ড সিস্টেমের ব্যয় পড়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ টাকা। চেয়ারগুলোতে ‘ইয়ামিন ফার্নিচার’ লেখা থাকলেও টেবিলগুলো কোন প্রতিষ্ঠানের তার কোনো স্টিকার লাগানো নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশের নামিদামি ফার্নিচার প্রতিষ্ঠান হাতিল ও রিগ্যালে এসব চেয়ারের মূল্য ঐ দামের অর্ধেকের চেয়েও কম। শুধু তাই নয়, অত্যন্ত সাধারণ মানের ১৫টি বুকসেলফের মূল্য ৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা, পাঁচটি স্টিলের আলমারি ২ লাখ ৮৫ হাজার, ১০টি স্টিলের ফাইল কেবিনেট ৪ লাখ ২২ হাজার, ২৫টি স্টিলের র্যাক ১৩ লাখ ৯৭ হাজার ও ৬৪৭৫টি বইয়ের জন্য বিলে দেখানো হয়েছে ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৮ হাজার ৬৬৪ টাকা। এছাড়া বিলে মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ১০৪টি প্লাস্টিক মডেলের মূল্য ১ কোটি ১৪ লাখ ৮৬ হাজার ৩১৩ টাকা দেখানোসহ দেশের বাজারে ‘পেডিয়াট্রিক সার্জারি’ (২ ভলিয়মের সেট) বইটির দাম ৩৩ হাজার টাকা হলেও নির্ঝরা এন্টারপ্রাইজ দাম নিয়েছে ৭০ হাজার ৫৫০ টাকা।

এদিকে মতিঝিলের মঞ্জুরি ভবনের পুনম ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে আরেকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা দরে ৮১টি কার্লজিস প্রিমো স্টার বাইনোকুলার মাইক্রোস্কোপ সরবরাহ করেছে, যার মূল্য নিয়েছে ২ কোটি ৬৩ লাখ ৩২৫ টাকা। অথচ এর বাজারমূল্য ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩০০ টাকা। পুনম ইন্টারন্যাশনাল এসির দাম ১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা দরে ৩১টির মূল্য নিয়েছে ৬১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। ওয়ালটনের যে মডেলের ফ্রিজ ৩৯ হাজার ৩৯০ টাকা, একই কোম্পানি ও একই মডেলের ফ্রিজের মূল্য গুনতে হয়েছে ৮৫ হাজার টাকা। এ রকম ছয়টি ফ্রিজ কেনা হয়। ল্যাবরেটরিতে ব্যবহারের জন্য ডিজিটাল ওয়েইং (ওজন মাপার যন্ত্র) মেশিনের দাম নেওয়া হয়েছে ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা, বাস্তবে যার বাজারমূল্য ৪০ হাজার টাকা করে। এছাড়া মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ছবি সংবলিত কাগজে ছাপা চার্ট বাজারে ১০০ থেকে ৫০০ টাকায় পাওয়া গেলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ প্রতিটি চার্ট কিনেছে ৭ হাজার ৮০০ টাকা দরে। এ রকম ৪৫০টি চার্ট ক্রয়ে ব্যয় হয়েছে ৩৫ লাখ ১০ হাজার টাকা। দেশে ১ লাখ ৩৮ হাজার টাকায় পাওয়া যায় ‘স্টারবোর্ড’ নামে হিটাচি কোম্পানির ৭৯ ইঞ্চির ইন্টারেক্টিভ বোর্ড। কিন্তু একই কোম্পানি ও মডেলের এই ইন্টারেক্টিভ বোর্ড কেনা হয়েছে ১৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকায়।

প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালের ১ জানুয়ারি কলেজটি অনুমোদন লাভ করে। ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে ৫১ জন শিক্ষার্থী ভর্তির মাধ্যমে কলেজটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। গত বছরের ৩০ নভেম্বর দৈনিক ইত্তেফাকে ২০ পৃষ্ঠায় ‘এবার শেখ হাসিনা মেডিক্যালে মালামাল কেনায় দুর্নীতি’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়।