মুর্তজা বশীর :নামেই যার পরিচয়

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২০, ২২:১০

সাইফুজ্জামান

একটা সময় ছিল সিনিয়ররা আলোচনা করলে সেখানে আমরা ঢুকতে চাইতাম না। এমন হয়েছে, আমরা পাশ কাটিয়ে অন্য কোথাও চলে যেতাম ভয়ে, লজ্জায়, অজ্ঞানতায়। কিন্তু তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম। তারুণ্যে ভরপুর। দীর্ঘ আলোচনায় অংশ না নিলেও আসরে বসলে চোখ খুলে যেত। জাতীয় জাদুঘরে চাকরির সুবাদে অনেক মনিষীর সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হয়েছে। তিনি আসতেন একজন মুদ্রাতত্ত্ববিদ ও একজন পোড়ামাটির ফলক বিশারদের কাছে। দূরে থেকে শুনতাম, তাদের আলোচনা, হই-হুল্লোড়। তার আগমন ও প্রস্থান ছিল শব্দময়। তাকে নিয়ে লিখতে গিয়ে আমি পেছনে ফিরে তাকাচ্ছি।

মুর্তজা বশীর ছিলেন একের মধ্যে অনেক। তার কাছাকাছি যারা এসেছেন, তারা শুধু জানেন এ খবর।

দ্রোহী, শিল্পী, সাহিত্যিক, মুদ্রাতত্ত্ববিদ ও টেরাকোটা বিশেষজ্ঞ ইত্যাদি। হঠাত্ জ্বলে উঠতেন। নানা বিষয়ে তার জ্ঞানের পরিধি ছিল অবারিত। জীবনের শেষ দিকে তিনি কিছুটা অসুস্থ ছিলেন। পরে তার সঙ্গে দেখা হতো কম। সুস্থ অবস্থায় যখন তার সঙ্গে দেখা হয়েছে তিনি স্মৃতির ভেতর থেকে তুলে আনতেন মণিমাণিক্য। মুডি মানুষ ছিলেন—তর্কে মাততে পারতেন অসাধারণ জ্ঞানগর্ভ আলোচনায়। জাতীয় জাদুঘরের কোনো অনুষ্ঠানে, কোনো সহকর্মীর কক্ষে মুদ্রাপাঠে মগ্ন অথবা টেরাকোটার কোনো মটিফ বিশ্লেষণে তাকে কখনো ক্লান্ত হতে দেখিনি। চা, কফি, সিগারেট সহযোগে যে আড্ডা চলমান থাকত তা অম্লমধুর।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পুত্র বশীর উল্লাহ হয়েছিলেন মুর্তজা বশীর। দেশ-বিদেশ দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। রাগ, অভিমান ও ভালোবাসার অপূর্ব মিশ্রণে তৈরি ছিল তার হূদয়। জীবনের শেষ দিকে তাকে এক নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মধ্যে চলে যেতে হয়েছিল। তিনি নিয়মিত ছবি আঁকায় ফিরে আসতে চেয়েছিলেন। শুরুও করেছিলেন, ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। তার জন্ম ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ আগস্ট। চিত্রশিল্পে দেশীয় ধারার সঙ্গে পাশ্চাত্য রীতির সমন্বয়ে এক বৈশিষ্ট্য প্রচলন করেছিলেন। কার্টুনে দ্রোহ, সংগ্রাম ছিল মুখ্য। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ঢাকা গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্টসে (ঢাকা চারুকলা ইনস্টিটিউট) ভর্তি হন। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম বিভাগে পাশ করেন শিল্পী আমিনুল ইসলামের সঙ্গে। চারুকলা ইনস্টিটিউটে আমিনুল ইসলামকে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি বাদ পড়েন। ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে নবাবপুর সরকারি স্কুলে ড্রয়িং শিক্ষক হিসেবে মুর্তজা বশীর নিযুক্ত হন। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে ইতালির ফ্লোরেন্সে তিনি গমন করেন। আকাদেমিয়া দ্য বিল্লি আর্ট ও ফ্রেসকো দুই বছর পাঠ গ্রহণ করেন। মুর্তজা বশীর ইতালির শিল্পীদের রেনেসাঁস আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ চিত্রকলাচর্চায় ব্রতী হন। চিত্রকলার ফিগার তৈরি ও রং ব্যবহারে পাশ্চাত্য দ্বারা প্রভাবিত হন। তার উল্লেখযোগ্য চিত্রে অ্যাকর্ডিয়ান বাদক, জিপসি মানব, মা-মেয়ে এবং বাজারের রকমারি দৃশ্যের বহুমাত্রিকতা উন্মোচিত হয়েছে। মুর্তজা বশীর ছিলেন আত্মমগ্ন শিল্পী। তার বিখ্যাত দেওয়াল সিরিজে ধস, রূপান্তর ও ভাঙা-গড়া প্রত্যক্ষ করা যায়। ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ইংল্যান্ডে কিছু সময় কাটান। এই সময় তিনি চিত্রকলার আধুনিক চাহিদা নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করেন। ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ মার্চ থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত তার চিত্রপ্রদর্শনী প্রশংসিত হয়। ‘মুজিমেন্টো প্রিমোরিও’ যার অন্য নাম আদিমতার আন্দোলন নামে পরিচিত এক শিল্পীগোষ্ঠী সৃষ্টি করেন মুর্তজা বশীর। দেশে ফিরে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।

তিনি এপিটাফ সিরিজের ২০টি চিত্রকর্ম নিয়ে বিশেষ প্রদর্শনী করেন। এ প্রদর্শনী শিল্পী-বোদ্ধাদের নজর কাড়ে। তিনি ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর  নেন। মুর্তজা বশীর ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের আমন্ত্রণে আটটি রাজ্যের জাদুঘর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সফর করেন। তিনি মন্দির ও টেরাকোটা শিল্প বিষয়ে গবেষণা করেছেন। মুর্তজা বশীর একজন ভাষাসৈনিক। তিনি ভাষা আন্দোলনে শহিদ বরকতকে নিয়ে হাসপাতালে যান এবং পরে মিছিলে যোগ দেন। মুর্তজা বশীর অঙ্কিত লিনোকার্ট ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ সংকলনে প্রকাশিত হয়। তিনি রাজনৈতিক কারণে ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে কারাগারের অভ্যন্তরে অন্তরিন ছিলেন।

মুর্তজা বশীর একজন আধুনিক শিল্পী ছিলেন। সমাজ, রাষ্ট্র ও চারপাশের মানুষের দিন যাপন, সংগ্রাম তার চিত্রশিল্পে গভীরভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। তিনি সংবেদনশীল ও ইতিহাস অনুসন্ধানী ছিলেন। দেশ, জাগৃতি, ঐতিহ্য তার গবেষণায় নব আঙ্গিকে লিপিবদ্ধ হয়েছে।

২০২০ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ আগস্ট মুর্তজা বশীর মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যু শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। এ শূন্যতা সহজে পূরণ হবার নয়।

n  লেখক :প্রাবন্ধিক, উপকিপার, জাতীয় জাদুঘর