ড. মো. হুমায়ুন কবীর
বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দেবে পুনর্বাসন কার্যক্রম। সেখানে বহুমুখী ও বিভিন্ন মেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী পুনর্বাসন কার্যক্রম গ্রহণ করতে হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট, বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ, হাটবাজার ইত্যাদি অবকাঠামোগত স্থাপনা পুনর্বাসনের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের তাত্ক্ষণিক, সাময়িক, স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অধীনে বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে তাত্ক্ষণিক করণীয় হলো কৃষি পুনর্বাসন কার্যক্রম। ক্ষতির তালিকায় থাকা মূল কৃষির সঙ্গে অন্যতম কৃষির উপখাত হিসেবে মাছ, গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি ইত্যাদির জন্যও বিভিন্ন মেয়াদি পরিকল্পনামাফিক প্রকল্প আকারে বাস্তবায়ন করতে হবে।
কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের জন্যও নিজ নিজ মন্ত্রণালয় হিসেবে কৃষি, খাদ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ, বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং তাদের অধিনস্থ বিভাগসমূহকে একযোগে সম্মিলিতভাবে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে হবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), বাংলাদেশ পরমাণু গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা), বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই), বাংলাদেশ মাত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান, যারা সরাসরি স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পরিককল্পনা ও প্রকল্প গ্রহণ করে কৃষির বিভিন্ন সেক্টরে গবেষণার মাধ্যমে কৃষি পুনর্বাসন প্যাকেজ তৈরি করে থাকে।
ইতিমধ্যে ব্রি ও বিনা থেকে কিছু স্বল্প দিনে উত্পাদনক্ষম ধানের জাত আমন রোপণের কথা বলা হয়েছে। বিনাধান-৭, বিনাধান-৯, বিনাশাইলসহ আরো কিছু আমন মৌসুমে চাষযোগ্য উন্নত জাত রয়েছে। বিআর২২, বিআর২৩, ব্রিধান৩৪, ব্রিধান৪৬, ব্রিধান৫৪, নাইজারশাইল ইত্যাদি উচ্চফলনশীল ও স্থানীয় জাত বন্যা-উত্তর পুনর্বাসনে আবাদ করা যেতে পারে। সাধারণত ৩০-৪৫ দিনের ধানের চারা নাবি জাত হলে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত আমন রোপণ করা যায়। কিন্তু বন্যা-পরবর্তী সময়ে তা একটু বেশি বয়সের, অর্থাত্ ৬০ দিন বয়সের পর্যন্ত ধানের চারা আগস্টের শেষাবধি রোপণ করা যেতে পারে। তাতেও যদি বন্যার পানি না নেমে জমি জো অবস্থায় না আসে, তবে সেখানে দাপগ পদ্ধতিতে (ভাসমান) সবজির আবাদ করা যেতে পারে।
আর বন্যা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উঁচু জায়গায় ধানের চারা তৈরির ব্যবস্থা নিতে হয়। সেভাবে যেসব জমিতে তার পরও ধান আবাদ করা যাবে না কিংবা সবজি আবাদের সময় চলে যাবে, সেগুলোর জন্য আগেই বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বীজ বা চারা লাগিয়ে দিতে হবে। শিম, শীত লাউসহ মাচায় হয় এমন সবজির জন্য মূল জমি প্রস্তুতের পূর্বেই উঁচু বা ভাসমান কোনো স্থানে চারা উত্পাদন করে রাখতে হবে, যাতে ক্ষেতের পানি নেমে যাওয়ার পরপরই সেখানে তা লাগিয়ে দেওয়া যায়। বন্যার কারণে যেসব জমিতে ধান চাষ করা সম্ভব হলো না, সেগুলোতে আগাম শীতকালীন শাকসবজি চাষ করে অধিক লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। টম্যাটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, লেটুস পাতা, শালগম, গাজর, মুলা, লালশাক, ডাঁটা ইত্যাদি শীতকালীন সবজি যাতে মৌসুমের শুরুতে সবার আগে বাজারে তোলা যায়, সেদিকে নজর দিয়ে পরিকল্পনামাফিক কাজ করতে হবে।
n লেখক :কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
