২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় শরীরে এখনও স্প্লিন্টার নিয়ে বেঁচে থাকা ঢাকা জেলা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেত্রী সাভারের মাহাবুবা পারভীন এখন চলাফেরা করেন অন্যের সহযোগিতা নিয়ে। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে অপারেশনে মাত্র ৩টি স্প্লিন্টার বের করা হয়েছে তার শরীর থেকে। মাথার মধ্যেও রয়েছে কয়েকটি স্প্লিন্টার।
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার এক যুগ পার হয়ে গেছে কিন্তু শরীরে গ্রেনেডের ক্ষত বহন করে চলছি। অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করি। বিভীষিকাময় সেই দিনটির কথা মনে পড়লে ঘুমের ঘরে মাঝে মধ্যেই আতঁকে উঠি। আইভি আপা মরে বেঁচে গেছে, আর আমি বেঁচেও মরে আছি । এখন আমি অর্ধমৃত একটা আহত মানুষ। কথাগুলো কান্না জড়িত কন্ঠে বলছিলেন ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি মাহাবুবা পারভীন।
মাহাবুবা পারভীন সারা শরীরে গ্রেনেডের অসংখ্য স্পিন্টার নিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে যাচ্ছেন আজও। শরীরে স্প্লিন্টারের যন্ত্রণায় এখনও চিৎকার করেন। বেশি যন্ত্রণা করে মাথায়। সামনের দুটি দাঁতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপার ভালোবাসা পেয়েছি। তিনি দুই বার দশ লাখ করে বিশ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছেন এবং প্রতিমাসে চিকিৎসার জন্য দশ হাজার করে টাকা দিচ্ছেন।
সেই দিনের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট জনসভার ঠিক সামনে ডান পাশে দাঁড়িয়ে নেতাকর্মীদের বক্তব্য শুনছিলাম। শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য শেষে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী আওয়ামী লীগের সভানেত্রী বর্তমান প্রধান মন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বক্তব্য শুরু করেন। বক্তব্য শেষে যখন শেখ হাসিনা জয় বাংলা বলে স্লোগান দিবেন ঠিক সেই মুহূর্তেই বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হতে থাকে প্রাণঘাতী গ্রেনেড। তারপর আর কিছুই মনে নেই তার। জ্ঞান ফিরলে দেখি মহাখালীর মেট্রোপলিটন হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছি।
অসহ্য যন্ত্রণা তখন মাহাবুবার সমস্ত শরীরে। অসংখ্য স্পিন্টার তখন তার শরীরে। বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে গ্রেনেড হামলার পর তাকে উদ্ধার করে মৃত ভেবে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ফেলে রাখা হয়েছিল।
২১ আগস্টের সেই ভয়াল গ্রেনেড হামলার কথা জিজ্ঞেস করতেই আবেগাপ্লুত হয়ে ওঠেন তিনি। বলেন, ‘আমি আমার পরিবারের বোঝা হয়ে বেঁচে আছি। পরিবারের কোনো কাজেই আমি আর আগের মতো তাদের সাহায্য করতে পারি না বরং তারাই আমাকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে থাকেন।’
মাহাবুবা পারভীন জানান, আহত অবস্থায় তাকে শেখ হাসিনার নির্দেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় ভারতের কলকাতায় অবস্থিত পিয়ারলেস হাসপাতালে। সেখানে তাকে প্রায় ২৫ দিন চিকিৎসা দেয়া হয়। শরীর ফিট না থাকার কারণে আরো ছয় মাস পরে গিয়ে স্প্লিন্টার বের করা এবং ব্রেনের চিকিৎসার জন্য সম্ভব হলে ব্যাংকক যেতে পরামর্শ দেন সেখানকার বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা।
চার ভাই বোনের মধ্যে মাহাবুবা ৪র্থ। শরীরে স্প্লিন্টারের ক্ষত নিয়ে দুর্বিসহ জীবনযাপন করছেন তিনি। পাশাপাশি আর্থিক অভাব-অনটনের মধ্যে নিজের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। মাহাবুবা পারভীনের ২ ছেলে আসিফ পারভেজ ও রুশাদ জোবায়ের। তার প্রয়াত স্বামী এমএ মাসুদ বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট সার্জেন্ট ছিলেন।
ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি মাহাবুবা পারভীন বলেন, গ্রেনেড হামলার ১৬ বছর পার হয়ে গেছে। জননেত্রী শেখ হাসিনা ছাড়া সাভারের কেউ তাকে কোন সাহায্য সহযোগিতা করেনি । নেতা কর্মীরা এখন আর তার খোজ খবর নেয়না। অসুস্থ হওয়ার আগে ঢাকায় দলীয় কর্মসূচীতে প্রায়ই অংশ নিতেন তিনি। এখন ইচ্ছা থাকলেও দলের নেতাকর্মীদের কোন সহযোগিতা না পাওয়ায় কোন কর্মসূচীতে যেতে পারছেন না। আমি এখনও দলীয় সকল কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক। দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচীতে অংশগ্রহণের জন্য আমার একটি গাড়ি দরকার।
জীবনের অনেক অপূর্ণতা থাকলেও মাহাবুবা পারভীনের একটিই চাওয়া; জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ বুকে ধারণ করে বাকি জীবন টুকু বেঁচে থাকা।
ইত্তেফাক/ইউবি
