বহুমাত্রিক চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২০, ১৯:৩৮

শিল্পের ইতিহাস মূলত বিবর্তনের ইতিহাস। সভ্যতার ভিত্তি হচ্ছে এই বিবর্তন বা রূপান্তর। বাংলাদেশের চিত্রকলার ইতিহাসও এই বিবর্তনের মধ্য দিয়ে নানা সময়ে সমৃদ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশ, এই ভূখণ্ডের নিকট অতীতের দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখতে পাব যে বাংলাদেশের চিত্রশিল্প মূলত বিবর্তিত হয়েছে ভারত বিভাগের পর থেকে। পাকিস্তান সৃষ্টির মুহূর্তে যে নতুন একটা পরিচয় এদেশের মানুষ লাভ করে তা থেকে ক্রমবিবর্তিত বাংলাদেশে পৌঁছুনোর মধ্য দিয়ে আমাদের শিল্পধারায় যুক্ত হয় নানান মাত্রা।

আমাদের শিল্পযাত্রার ইতিহাস তাই আমাদের রাষ্ট্রীয় বিবর্তন আর মধ্যবিত্তের বিকাশের সঙ্গে যুক্ত। সূচনাবিন্দুটি ছিল ঢাকার সরকারি আর্ট ইনস্টিটিউট। পথিকৃত্ ছিলেন নিঃসন্দেহে জয়নুল আবেদিন এবং সহযাত্রী শিল্পীরা।

মুর্তজা বশীরের শিল্পযাত্রা ঢাকার এই সরকারি আর্ট ইনস্টিটিউট (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) থেকে। মুর্তজা বশীর ছিলেন এই আর্ট ইনস্টিটিটের দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র। পরবর্তীকালে এই ছাত্রদের (ছাত্রী ছিল না) মধ্যে যাঁরা স্বনামখ্যাত হয়েছেন তাঁরা হলেন—আবদুর রাজ্জাক, কাইয়ুম চৌধুরী, রশিদ চৌধুরী এবং মুর্তজা বশীর। তবে এঁদের মধ্যে আজীবন সৃষ্টিশীল ছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী আর মুর্তজা বশীর। মুর্তজা বশীরের আরেকটি বৈশিষ্ট্য যা চোখে পড়ে তা হলো, ব্যক্তিগত জীবনে যেমন তিনি ছিলেন বোহেমিয়ান মেজাজের মানুষ, অস্থির, শিল্পের ক্ষেত্রেও তেমনি তিনি ছিলেন নিরন্তর নীরিক্ষাপ্রবণ সৃষ্টিশীল এক শিল্পী।

তবে বিস্ময়কর হচ্ছে, শিল্পকলার জগতে আত্মগত গরজে তাঁর অনুপ্রবেশ ঘটেনি। তিনি শিল্পক্ষেত্রে বা শিল্পকলা নিয়ে পড়াশোনা করেছেন কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশনায়। তরুণ বয়সে তিনি ছিলেন প্রবলভাবে প্রগতিশীল, সাম্যবাদী ও অসাম্প্রদায়িক। জীবনের শেষ দিকে একটা সিরিজ আঁকার মধ্য দিয়ে আর স্ত্রীর মৃত্যুর পর ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হলেও নিজেকে সমাজসচেতন শিল্পী বলে মনে করতেন। জীবনের এই পর্বে তিনি সামাজিক অসাম্য ও অনাচারকে তুলে ধরার জন্যে ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করেছেন। নিজেই বলেছেন, এই অধ্যাত্মবোধ তিনি পেয়েছিলেন পারিবরিক সূত্রে। কিন্তু সমাজমনস্কতাই ছিল তাঁর জীবনদৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু। এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, মার্ক শাগালও তো ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করেছেন। আসলে সমাজের সঙ্গে শিল্পের মেলবন্ধন ঘটানোর দিকেই ছিল তাঁর ঝোঁক। নিজস্ব নন্দনভাবনাও ছিল তাঁর। ইতালিতে শিল্পশিক্ষা নিতে গিয়ে এই ভাবনা তাঁর মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছিল। আধুনিক চিত্রশিল্পের বিভিন্ন আন্দোলনের প্রভাবে তিনি বিমূর্ত ছবি এঁকেছেন ঠিকই, সেই সঙ্গে বাস্তবতাকেও ভুলে থাকতে পারেননি। এ প্রসঙ্গে নিজেই তাঁর শিল্পরীতির কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘আর্ট ফর আর্টস সেক’ মতবাদে তাঁর বিশ্বাস ছিল না। বলেছেন, তাঁর নিজের ভাষায়, ‘বারবার আমার চিত্রপটে এসেছে এদেশের সাধারণ মানুষের প্রেম, ভালোবাসা, হাসি-কান্না বা অবসর এবং উচ্চবিত্ত সমাজের নারীদের উগ্র সাজসজ্জা বা প্রাচুর্যের ভেতরে দুঃখের আভাস। শহীদদের শিরোনাম অর্থাত্ এপিটাফ সিরিজ ছাড়া বিমূর্ত চিত্রমালায় আমিও ক্ষয়িষ্ণু সমাজকে তুলে ধরতে চেয়েছি। বলা চলে, এগুলো এক অর্থে প্রতীকী।’

আসলে প্রতীকের প্রতি মুর্তজা বশীরের আকর্ষণ ছিল প্রবল। তাঁর শিল্পশিক্ষার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছেন ইতালির প্রাক-রেনেসাঁ কালের শিল্পীরা। ছাত্রাবস্থায় তাঁকে বেশি অনুপ্রাণিত করেছিল ভ্যান গঘ, এরপর মোদেলিয়ানি। তবে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছেন পিকাসো। পিকাসোর কাজে যে বৈচিত্র্য, পর্বে পর্বে নিরন্তর নতুন ধরনের ছবি আঁকা, মুর্তজা বশীরও সেইভাবে কাজ করে গেছেন। তাঁর বিভিন্ন সিরিজে এর ছাপ স্পষ্ট। অনুপ্রেরণা হিসেবে একদিকে পিকাসো যেমন, তেমনি ইতালির প্রাক-রেনেসাঁ যুগের শিল্পী জোত্তো, সিমাব্যু, দুচ্চিও ফ্রা এঞ্জেলিকার দ্বারাও অনুপ্রাণিত হয়েছেন তিনি। তাঁদের ছবির ‘সিম্পলিফিকেশন অব ড্রইং, সীমিত রঙের ব্যবহার, চরিত্রের ঋজুতা অর্থাত্ মুভমেন্ট কম’ তাঁর ছবিকে বিশিষ্টতা দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সতীর্থদের তুলনায় সবচেয়ে নিরীক্ষাপ্রবণ শিল্পী ছিলেন তিনি। অনেকগুলো সিরিজও এঁকেছেন। এই সিরিজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘দেয়াল’ (১৯৭২-১৯৯৬) ও ‘এপিটাফ ফর দ্য মার্টারস’ (১৯৭১-১৯৭৫)। ‘দেয়াল’ সিরিজের ছবির সংখ্যা ৯২টি। এই সিরিজের মধ্য দিয়ে তিনি তুলে ধরতে চেয়েছিলেন যে, সমাজ ব্যবস্থায় মানুষ একটা অদৃশ্য প্রাচীরের মধ্যে বন্দি। কারো সঙ্গে কারুর যোগাযোগ ঘটছে না। আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় মানুষ ক্রমেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। আর ‘এপিটাফ’ সিরিজের বিষয় হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ। এই সময় তিনি দেশত্যাগ করে প্যারিসে যান। প্যারিসে থাকাকালে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের কথা জানতে পেরে এই সিরিজটির কথা তাঁর মাথায় আসে। সিরিজটির মধ্য দিয়ে তিনি বলতে চেয়েছেন, ‘শহীদদের আত্মদান নক্ষত্রের মতো ভাস্বর, সূর্যের মতো জ্বলজ্বলে।’

এপিটাফের পর তিনি আরও কয়েকটি সিরিজের ছবি আঁকেন : ডিজায়ার, ইটারনিটি, জ্যোতি, ডানা, কান্তোজ, কলেমা তৈয়বা। জ্যোতি আর কলেমা তৈয়বা সিরিজের ছবিগুলো অধ্যাত্ম-আশ্রয়ী। কিন্তু ডানা সিরিজের ছবিগুলোর বিশেষত্ব উল্লেখ করার মতো। সমাজ পরিবর্তনের রূপক হিসেবে তিনি এই সিরিজে বেছে নেন প্রজাপতিকে। এভাবেই তিনি ডানার ছবিগুলো এঁকেছেন। প্রজাপতির ডানার বহুবর্ণিল বিচিত্র রঙের বিন্যাসকে তাঁর মনে হয়েছে ‘ছন্দোবদ্ধ জীবনের স্পন্দনে ভরা।’ কল্পনার ওপর ভর করে নয়, প্রজাপতির ডানাকে ম্যাগ্নিফাইং গ্লাসে দেখে তিনি ছবিগুলো আঁকেন। কলেমা তৈয়বা সিরিজের অনুপ্রেরণা তিনি পেয়েছিলেন আকাশপথে ভ্রমণ করতে করতে সূর্যাস্ত আর সূর্যোদয়ের মেঘের বর্ণচ্ছটা দেখে। এই সিরিজের ছবিগুলোকে তিনি নিজেই চিহ্নিত করেছেন ‘রঙের ব্যাকরণভিত্তিক ছবি’ বলে। এতে তিনি ব্যবহার করেছেন সুলতানি আমলের শিলালিপি ও মুদ্রা থেকে গৃহীত অক্ষর। তিনি মনে করতেন, কালীঘাট ও পাল যুগের শিল্পকলার মতোই সুলতানি আমলের শিল্পও আমাদের ঐতিহ্য। তিনি এইসব শিল্পধারা নিয়েও গবেষণা করেছেন। তাঁর পরবর্তী ছবিতেও এর প্রভাব পড়ে। ‘রঙের ব্যাকরণ’ নিয়ে কাজ করার সূচনা ঘটেছিল যে ‘ইটারনিটি’ সিরিজে, তা-ই ‘কলেমা তৈয়বা’য় একধরনের পূর্ণতা পায়।

এসব সিরিজ ছবির পাশাপাশি তিনি এমন বেশকিছু ছবি এঁকেছেন যে ছবিগুলোর বিষয়আশয় সমকালের ঝোড়ো রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রাম। এরকম কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ছবি হচ্ছে : হোয়েন দ্য উইন্ডস ব্লো (১৯৮৩), ওয়েভ (১৯৮৪), ইরাপশান (১৯৮৮) ইত্যাদি। মুর্তজা বশীর আসলে সমকালীন শিল্পীদের মতোই পাশ্চাত্যের অ্যাকাডেমিক শিক্ষার সঙ্গে বাংলার নানান চিত্ররীতির সংমিশ্রণে নিজস্ব নান্দনিক সূত্রটি খুঁজে পেয়েছিলেন। তবে ফিগারেটিভ কাজে তিনি ছিলেন বৈচিত্র্যপিয়াসী। অর্থাত্ তাঁর ফিগারগুলি একই ঘরানার নয়। তিনি নানান অবয়বে এই ধরনের ছবি এঁকেছেন। সর্বার্থেই তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক শিল্পী। ছবিতে যা প্রকাশ করা যায় না, তা তিনি গল্পে-কবিতায় প্রকাশ করেছেন।

চিত্রশিল্প বা মুরালের পাশাপাশি তিনি উপন্যাস লিখেছেন, লিখেছেন ছোটগল্প, কবিতা, চলচ্চিত্রের জন্য চিত্রনাট্য। তবে সবকিছু ছাড়িয়ে আরও যে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেছেন সেটি হলো, তিনি ভারতীয় চিত্রকলার সামাজিক পটভূমি নিয়ে গবেষণা করেছেন। সম্ভবত তিনিই বাংলাদেশের একমাত্র শিল্পী যিনি মাঠ পর্যায়ে বাংলাদেশ-ভারত (পশ্চিমবঙ্গ) মিলিয়ে এই ধরনের গবেষণা করেছেন। দ্বিতীয়ত তিনি যে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেন তা হলো, বাংলার পোড়ামাটি শিল্পে ইউরোপীয়দের জীবন কীভাবে এবং কেন এসেছে তা নিয়ে গবেষণা। লিখেছেন মুদ্রা ও শিলালিপির প্রেক্ষাপটে বাংলার হাবসি সুলতানদের ওপর। বাংলার ইতিহাসের প্রতি তাঁর যে দুর্বলতা ছিল সেকথা বলেছেন।

জীবনের নানা সময়ে বিভিন্ন পর্বে তিনি বিমূর্ত আঙ্গিকের ছবি যেমন এঁকেছেন, তেমনি রেখা ও রং-প্রধান কম্পোজিশনও করেছেন। মুরালে করেছেন দেশজ উপাদানের চমত্কার শৈল্পিক ব্যবহার। ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাধারণ মানুষ ও নারী হয়ে উঠেছে তাঁর ছবির বিষয়। তবে অন্যদের তুলনায় তিনি ছিলেন সমাজ সচেতন একজন চিত্রশিল্পী। হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত একুশের প্রথম সংকলনে তাঁর এই ধরনের বেশকিছু লিনোকাট ছাপা হয়েছে। আমাদের একুশের আন্দোলনের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। আবার একাত্তরের উত্তাল দিনগুলিতে মিছিলের অগ্রভাগে যে পোস্টার বয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেই পোস্টারও এঁকেছিলেন তিনি। অন্য শিল্পীদের সঙ্গে আন্দোলনের পক্ষের বিবৃতিতেও স্বাক্ষর করেছিলেন। শিল্পের সর্বোচ্চ জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন মুর্তজা বশীর। আমাদের শিল্পের ইতিহাসে তাই তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে নিঃসন্দেহে। তাঁর মৃত্যু তাই আমাদের অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হলো বলা যায়। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন যে মৃত্যুতেই সব নিঃশেষ হয়ে যায় না। এ প্রসঙ্গে তাঁর আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘আমার জীবন ও অন্যান্য’ থেকে একটা অংশ উদ্ধৃত করে এই লেখার পরিসমাপ্তি টানছি :

‘মৃত্যুকে অতিক্রম করে যেতে পারব কি না এটাই আমার প্রশ্ন। আমি সততা ও সমস্ত নিষ্ঠা দিয়ে চিত্র রচনা করেছি। এখনো সেই সাধনায় নিজেকে নিমজ্জিত রেখেছি। যদি সার্থক হই তবে আমার তৃপ্তি, যদি বিফল হই তবে তা হবে বেদনাদায়ক। মানুষ মরণশীল একথা বিশ্বাস করি না। আমি মনে করি, মানুষ অবিনশ্বর।’

মুর্তজা বশীর [১৭ আগস্ট ১৯৩২—১৫ আগস্ট ২০২০] ছবি :সংগৃহীত