মনজুর আহমেদ
করোনা ভাইরাস মহামারি সারা বিশ্বে স্বাভাবিক জীবন এবং জীবিকা নির্বাহ প্রক্রিয়ার ওপর ব্যাপক ও তীব্র সংকট সৃষ্টি করছে। চাহিদা সরবরাহ এবং উত্পাদন চেইন ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে বড় ধরনের অচলাবস্থা ছেয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর গবেষণা অনুসারে, গত শতাব্দীর মহামন্দার পর থেকে বিশ্ব অর্থনীতি তার সবচেয়ে খারাপ মন্দার সম্মুখীন হবে বলে অনুধাবন করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) কর্মসংস্থানের সংখ্যার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করছে। করোনা ভাইরাস মহামারির স্বাস্থ্যগত এবং অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাভুক্ত দেশগুলোর গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপগুলোর আদলে বাংলাদেশকেও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য এবং পরিবেশগত ঝুঁকি প্রতিরোধ করার জন্য আইএলও কনভেনশন নম্বর ১৫৫ নির্দেশিকার আলোকে একটি নিরাপদ এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ধারা উজ্জীবিত করার লক্ষ্যে আর্থিক, কারিগরি, নীতিগত সুবিধা ও কৌশল সম্বলিত একটি চলমান প্রণোদনা প্যাকেজ প্রণয়ন ও কার্যকর করা জাতীয় স্বার্থে অপরিহার্য। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাভুক্ত দেশগুলোতে বিশেষ তারল্য সহায়তা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। যেমন- রাষ্ট্রীয় ঋণ, ক্রেডিট গ্যারান্টি, স্থগিত কর পরিশোধ, মজুরি সহায়তা, আর্থিক বিধিমালা শিথিল করা, কর হ্রাস, অনুদান, বিদ্যুত্ ফি হ্রাস, বিলম্বিত আমদানি শুল্ক পরিশোধ, দ্রুত কর-ক্রেডিট পরিশোধ, কর ক্রেডিট দ্রুত পরিশোধ, মূসক হ্রাস বা অব্যাহতি ইত্যাদি। একইভাবে বাংলাদেশেও বিভিন্ন বিষয়ে যুগোপযোগী টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারি বাজেট বরাদ্দ, আন্তর্জাতিক তহবিল সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অপারেটিং ব্যাংক দ্বারা উপলব্ধ তহবিলের মাধ্যমে অনুদান এবং ভর্তুকিযুক্ত স্বল্প সুদে ঋণ সরবরাহ করা প্রয়োজন। যার মাধ্যমে চলমান সার্বিক প্রণোদনা প্যাকেজ কার্যকর করা অত্যাবশ্যক।
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের এই ভয়ংকর মন্দার অধীনে রাজস্ব আহরণ কার্যত স্থবির হয়ে পড়বে। তাই এখনই সময় এসেছে বৈশ্বিক আর্থসামাজিক পরিবেশের তাত্ক্ষণিক, স্বল্পমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য একটি জনবান্ধব, বিনিয়োগবান্ধব এবং উত্পাদনশীল রাজস্ব ব্যবস্থা প্রবর্তন করা জাতীয় স্বার্থে অপরিহার্য।
এরকম পরিস্থিতিতে করের আওতা বাড়িয়ে করহার কমিয়ে কর প্রদান সরল ও সহজ করা প্রয়োজন। চিকিত্সা ও স্বাস্থ্য খাত, কৃষি উত্পাদন ও সরবরাহ খাত, ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প খাত এবং ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প খাত কমপক্ষে আগামী তিন বছরের জন্য আমদানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর ও আয়কর (ব্যক্তিগত আয়কর ব্যতীত) মুক্ত রাখা যেতে পারে। রপ্তানি খাত চাঙ্গা রাখতে সব রপ্তানি খাতে উেস আগাম আয়কর প্রত্যাহার করা যেতে পারে।
সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন, তত্ত্বাবধান এবং পর্যবেক্ষণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সমন্বয়ে একটি জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন কাউন্সিল (এনইডিসি) প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এই কাউন্সিল প্রণোদনা প্যাকেজ এবং এর তপশিলে উল্লেখিত বিধানাবলি বাস্তবায়ন এবং প্রয়োগ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
২০১৯ সালের জুন মাসে আইএলও শতবার্ষিকী ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, ‘নিরাপদ এবং স্বাস্থ্যকর কর্মক্ষেত্র কাজের সুস্থ পরিবেশের মৌলিক চাহিদাগুলোর অন্যতম’। এই লক্ষ্যেই কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য এবং পরিবেশগত ঝুঁকি থেকে প্রতিরোধ এবং সুরক্ষার জন্য নির্ধারিত নির্দেশিকা আইএলও কনভেনশন নম্বর ১৫৫ জারি করা হয়েছে। করোনা ভাইরাস মহামারির সংকটের সময় এবং পরে কর্মক্ষেত্রে অসুরক্ষিত কর্মীরা কর্মকালীন, স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তাহীনতা ও সংক্রমণ ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন। এর ফলে তাদের নিজেদের স্বাস্থ্য, অন্যদের স্বাস্থ্য এবং সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতিও দারুণভাবে বিপদগ্রস্ত এবং হুমকির মুখে পড়ছে। এই সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে তাদের সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া অপরিহার্য। এজন্য বিনা মূল্যে কর্মীদের পর্যায়ক্রমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্ঘটনার ঝুঁকি, স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব এবং সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য কর্মীদের পর্যাপ্ত প্রতিরক্ষণমূলক পোশাক এবং সরঞ্জাম প্রদান করতে হবে। সামাজিক দূরত্ব, কাজের শিফট, ডাউনসাইজিং অপারেশন, টেলিওয়ার্ক এবং অন্যান্য এক্সপোজার কমানোর ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সঙ্গে কমসংখ্যক কর্মীদের দ্বারা প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনার বিকল্প ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। করোনার সময়কালে স্বাস্থ্যবিধি মানার পাশাপাশি পরিবেশ এবং বর্জ্যদূষণ ঝুঁকিও মোকাবিলা করতে হবে।
লেখক : সাবেক উপদেষ্টা এফবিসিসিআই, বিসিআই
