সৈয়দ মো. রফিকুল ইসলাম
যে শিশুটি সদ্য ভূমিষ্ঠ হলো তার কানেও এক সময়ে ধ্বনিত হবে বঙ্গবন্ধুর নাম, যে আশি বছরের বৃদ্ধ সে-ও শেখ সাহেবকে ভেবে স্মৃতিচারণ করেন। ঘরে-বাইরে, অফিস-আদালতে, আলোচনা-আড্ডায়, সভা-সমাবেশে—যেখানেই মানুষের বিচরণ, সেখানেই উচ্চারিত হয় বঙ্গবন্ধুর নাম। যে নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির গৌরব উজ্জ্বল ইতিহাস, যার নেতৃত্বে জন্ম নিয়েছে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী আজ জেনেছে সবাই। তবে বঙ্গবন্ধুর মতো একজন মহান নেতা শুধু বাংলাদেশের একার নয়, তিনি তো বিশ্ব বন্ধু, বিশ্ব ইতিহাসের এক মহান নেতা। তাই বিশ্বে বঙ্গবন্ধুর নামটি ছড়িয়ে দিতে হবে ব্যাপকভাবে, বিস্তৃত করতে হবে বিশ্বের এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। আজ যদি আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্ব বিখ্যাত রাষ্ট্রনায়কদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর জীবনী পড়ানো হয়, ইউরোপের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা বঙ্গবন্ধুর জীবনী জানতে পারে, অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আলোচনা হয়, আফ্রিকার পার্লামেন্টে বঙ্গবন্ধুর উদাহরণ টানা হয়, কিংবা এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্মদাতার ছবি পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত হয় তাহলে হয়তো বঙ্গবন্ধুর জীবনী থেকে বিশ্ববাসী উপকৃত হবে। যদিও বঙ্গবন্ধু বহুকাল ধরেই বিশ্ববাসীর কাছে এক পরিচিত নাম। ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ আজ বিশ্ব প্রামাণ্য দলিল। কিন্তু আরো ব্যাপক বিস্তৃতির প্রয়োজন, যা বিশ্ব রাজনীতির জন্য সহায়ক এবং বিশ্বে অধিকার বঞ্চিত মানুষের প্রেরণার উত্স হবে। বহুকাল ধরে সংগ্রামে ও অবদানে নিজ নিজ জাতির মুক্তিদাতা হিসেবে মানুষের কাছে যারা অমর হয়ে আছেন, বিশ্ববাসীর কাছে যাদের নাম সর্বদা আলোচিত হয়, যেমন আমেরিকার জর্জ ওয়াশিংটন, তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক, ভারতের মহাত্মা গান্ধী, দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা, কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো প্রমুখ নেতারা; তেমনি বঙ্গবন্ধুর নামটিও আলোচিত হবে তাদের সঙ্গে। যেখানে বিশ্ববাসী জানবে এই মহান নেতাকে, যিনি দেশের জন্য জীবন-যৌবন উত্সর্গ করেছেন, কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছেন দীর্ঘকাল, যার ছিল মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার বিরল প্রতিভা, জাদুকরী নেতৃত্বদান ক্ষমতা, সাহসিকতায় যিনি ছিলেন অদ্বিতীয়।
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রচার-প্রচারণায় আমরা এগিয়েছি অনেক দূর তবে বিশ্বের নতুন প্রজন্মের জন্য যেতে হবে আরো বহুদূর। তাই আমাদের করণীয় হতে পারে : ১. বঙ্গবন্ধুর ওপর লেখা নির্বাচিত বইসমূহ বিভিন্ন ভাষায় মুদ্রণ করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় গ্রন্থাগার ও বিখ্যাত লাইব্রেরিতে পৌঁছে দেওয়া (যদিও অনেক বই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রয়েছে)। উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধুর ওপর দেড় হাজারের ওপর বই প্রকাশিত হয়েছে যার অনেকগুলো বই ইংরেজিতে অনুবাদিত হয়েছে এবং বেশ কিছু বই অন্যান্য ভাষায়ও অনুবাদিত হয়েছে। ২. বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাদুঘরে বিখ্যাত ব্যক্তিদের ছবি, ভাস্কর্য, মুর্যাল, প্রতিকৃতি, টেরাকোটা ইত্যাদি সংরক্ষিত আছে, সেখানে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি/ভাস্কর্য স্থাপনে উদ্যোগ নেওয়া, প্রয়োজনে নিজেরাই তৈরি করে পৌঁছে দেওয়া। ৩. দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক, সামাজিক ও আদর্শিক চিন্তাভাবনা, তার জীবন ও স্বাধীনতা অর্জনের ওপর গবেষণার জন্য এমফিল ও পিএইচডি প্রদান করা (অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে চালু রয়েছে)। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাঙালি যারা উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য যায়, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে তাদের গবেষণার বিষয়বস্তু হতে পারে বঙ্গবন্ধুর জীবনী। ৪. বাংলাদেশ মিশনসমূহ নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানের বাইরেও সে দেশের স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে অনুষ্ঠান আয়োজন করা। ৫. বিশেষ দিবসে বিভিন্ন দেশের ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় বঙ্গবন্ধুর ওপর আলোচনা, লেখা, ডকুমেন্টারি প্রচারের ব্যবস্থা করা। ৬. আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ও বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মাধ্যমে র?্যালির আয়োজনসহ বিভিন্ন স্থানে ডিজিটাল বোর্ডে বঙ্গবন্ধুর ছবি প্রদর্শন করা। ৭. জাতিসংঘের অধীনে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী মিশনগুলো যেসব দেশে নিয়োজিত রয়েছে তাদের মাধ্যমে আলোচনা সভা, সে দেশের স্কুল-কলেজে বই বিতরণসহ শিক্ষা ও খেলাধুলার উপকরণ বিতরণ এবং যেখানে সম্ভবপর সেই স্থানে প্রীতি ম্যাচ/খেলাধুলার আয়োজন করা। নিজ ক্যাম্পে জাতিসংঘের অধীনে কর্মরত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ও দেশের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ ও বঙ্গবন্ধুর ওপর রচিত বই উপহার এবং ভিডিও প্রদর্শনীর আয়োজন করা। ৮. বিশেষ দিবসগুলোতে বাংলাদেশ মিশন কর্তৃক নিজ নিজ দেশের রাষ্ট্রপ্রধান/ সরকারপ্রধানদের নিকট বিশেষ পত্র/শুভেচ্ছা প্রেরণ করা। ৯. দেশে-বিদেশে গড়ে ওঠা বঙ্গবন্ধু গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো কর্তৃক এক্ষেত্রে আরো কার্যকর ও অগ্রণী ভূমিকা রাখা। এভাবেই বঙ্গবন্ধুর জীবনী বিস্তৃত হবে বিশ্বময়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর পরিচিতি ও তার সৃষ্ট বাংলাদেশ তারই স্বপ্নের সোনার বাংলা সম্পর্কে জানবে সবাই।
লেখক :প্রাক্তন অধ্যক্ষ, ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, জাহানাবাদ সেনানিবাস, খুলনা
