আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আবারও বাড়ছে

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২০, ২১:১৩

বগুড়ায় করোনা পরিস্থিতি

স্টাফ রিপোর্টার, বগুড়া

বগুড়ায় করোনা আক্রান্তদের চিকিত্সার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালগুলোতে রোগী আবার বাড়তে শুরু করেছে। গত ২১ আগস্ট এক দিনেই জেলার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ছয় জনের মৃত্যু হয়েছে। জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের হিসাবে এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে এক শিশুসহ মোট ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। দোকানপাট, অফিস-আদালত খুলে দেওয়া, স্বাস্থ্যবিধি না মেনে চলা, মুখে মাস্ক ব্যবহার না করার কারণে এবং আগের মতো প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় বগুড়া করোনার হটস্পটে পরিণত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই করোনার মধ্যেই বগুড়া শহরে সারা দিনই যানজট লেগে থাকে। স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই সবকিছু হচ্ছে। যে কারণে বিভাগীয় শহর রাজশাহীতে যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ৪ হাজার ১৭ জন সেখানে বগুড়ায় ৬ হাজার ছাড়িয়েছে। বগুড়াতে অন্য জেলার তুলনায় মৃত্যুর সংখ্যাও বেশি।

বগুড়ার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মোস্তাফিজুর রহমান তুহিন দাবি করেছেন— বগুড়ার করোনা পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। তার আশা, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসবে। তিনি বলেন, ‘ঈদুল ফিতরের পর বগুড়ায় যেভাবে করোনার সংক্রমণ বেড়েছিল কোরবানির ঈদের পর সেই হারে বাড়েনি। এ জেলায় সুস্থতার হারও ৮১ শতাংশ। তবে যারা মারা যাচ্ছেন তারা কোনো না কোনো ক্রনিক রোগে আক্রান্ত এবং তাদের অধিকাংশই ষাটোর্ধ্ব।’ করোনার বিস্তার ঠেকাতে জেলায় কাজ করা ‘করোনা ও বগুড়া পরিস্থিতি’ নামে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মীরা শনিবার জানান, বগুড়ায় কোভিড-১৯ এর উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। ২১ আগস্ট পর্যন্ত করোনা উপসর্গ নিয়ে ৯৩ ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে।

বগুড়ায় গত ১ এপ্রিল প্রথম কোনো এক ব্যক্তির দেহে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতির প্রমাণ মেলে। তারপর থেকে ২১ আগস্ট পর্যন্ত মোট ৬ হাজার ১৫৪ জন আক্রান্ত হয়েছেন। আর করোনায় আক্রান্ত হয়ে ২১ মে প্রথম একজনের মৃত্যু হয়। এরপর জুন মাসে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে এবং তা এখনো অব্যাহত রয়েছে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, জুন মাসে করোনায় আক্রান্ত হয়ে বগুড়ায় ৫২ জনের মৃত্যু হয়। তখন স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ১০ মে বিপণিবিতান এবং দোকানপাট খুলে দেওয়ার কারণেই করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধি পায় এবং ১০ জুন আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এমনকি নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে আক্রান্তের হার ৬০ শতাংশে উন্নীত হয়। এসব কারণে তখন বগুড়া শহরের ৯টি এলাকাকে রেড জোন ঘোষণা করা হয় এবং বগুড়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নতুন করে ৫০ শয্যার করোনা ওয়ার্ডও চালু করা হয়। কিন্তু তার পরেও করোনায় মৃত্যু রোধ করা যায়নি। বরং পরবর্তী জুলাই মাসেও ৫২ জন মৃত্যুবরণ করেন। আর আগস্ট মাসের ২১ দিনে এক শিশুসহ ৩৯ জনের মৃত্যু হয়।

‘করোনা ও বগুড়া পরিস্থিতি’ নামে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের অন্যতম সমন্বয়ক অরূপ রতন শীল জানান, কোরবানির ঈদের আগে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কমে আসে। কিন্তু ঈদের ১০ দিন পর থেকে দুটোই বাড়তে থাকে। রোগী শনাক্ত বিবেচনায় বগুড়ায় বর্তমানে করোনায় মৃত্যুর হার ২ দশমিক ৩৩। অথচ গত ৪ আগস্ট পর্যন্ত এই হার ছিল ২ দশমিক ১৯ শতাংশ। করোনায় আক্রান্তের পাশাপাশি উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণকারীর সংখ্যা একেবারে কম নয়। আমাদের কাছে এ পর্যন্ত ৯৩ জনের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে, যারা কোভিড-১৯ এর উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন।’ বগুড়ায় করোনা আক্রান্তদের চিকিত্সার জন্য প্রথম যে হাসপাতালকে নির্ধারণ করা হয় সেই মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এ টি এম নুরুজ্জামান সঞ্চয় জানান, ঐ হাসপাতালের মধ্যে করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমে এসেছিল। কিন্তু সম্প্রতি তা বাড়তে শুরু করেছে। তিনি বলেন, ‘১২৮ শয্যার হাসপাতালে গত ৪ আগস্ট মাত্র ৪২ জন ভর্তি ছিলেন। কিন্তু ২২ আগস্ট তা বেড়ে ৫৪তে উন্নীত হয়েছে।’ রোগী বেড়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতাল ও বেসরকারি টিএমএসএস মেডিক্যাল কলেজ ও রফাতুল্লাহ্ কমিউনিটি হাসপাতাল থেকেও। শজিমেকের ৫০ শয্যার করোনা ওয়ার্ডের মুখপাত্র জাহাঙ্গীর আলম জানান, ৪ আগস্ট পর্যন্ত তাদের ওয়ার্ডে ৩০ জন চিকিত্সাধীন ছিলেন। ২২ আগস্ট দুপুর পর্যন্ত ৪১ জন ভর্তি ছিলেন।

টিএমএসএস মেডিক্যাল কলেজ ও রফাতুল্লাহ কমিউনিটি হাসপাতালের মুখপাত্র আব্দুর রহিম রুবেল জানান, ঐ হাসপাতালের ১৩০ শয্যার করোনা ইউনিটে বর্তমানে ৯৭ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। অথচ দুই সপ্তাহ আগেও সেখানে রোগী ছিলেন ৭০ জন। এ ব্যাপারে বগুড়ার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মোস্তাফিজুর রহমান তুহিন হাসপাতালে রোগী ভর্তি বেড়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে বলেন, ‘এটা পজিটিভ হিসেবে নিতে হবে। মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে বলেই হাসপাতালে বেশি মানুষ যাচ্ছে।’