সুমনা মৃধা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইতিহাসের প্রথম স্নায়ুযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের তিন দশক পেরোনোর পর দ্বিতীয় স্নায়ুযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে রাশিয়ার জায়গায় আবির্ভূত হয়েছে চীন। চীন-যুক্তরাষ্ট্রের একের প্রতি অপরের ধাওয়া-পালটাধাওয়ায় সরগরম বিশ্বরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গন। তবে এই শীতল যুদ্ধে চীনের থেকে বেশি আগ্রাসি ভূমিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৪৯ সালে মাও সেতুং চীনে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটালে পুঁঁজিবাদী গণতন্ত্রের ধারক ও বাহক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক যে তলানিতে পৌঁছেছিল, তা ১৯৭১ সালের পিংপং কূটনীতির প্রভাবে ও তত্কালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের বেইজিং সফরের মাধ্যমে ‘কৌশল বন্ধুতে’ পরিণত হয়। এর পর থেকে বিগত পাঁচ দশকে দুই পরাশক্তিকে এমন মারমুখো অবস্থায় কখনো দেখা যায়নি।
অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীনের উত্থান, ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’-এর কর্মসূচির আওতায় ৬১টি দেশকে চীনের পতাকাতলে আনা, দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়া, ভারত মহাসাগরে চীনের নৌবাহিনীর উপস্থিতি প্রভৃতি প্রতিটি বিষয়কেই যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখায় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। এছাড়াও এখনো পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পরেই চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হিসেবে নিজেদের জায়গা পাকাপোক্ত করে ফেলেছে এবং অর্থনীতির দৌড়ে এগিয়ে থাকার জন্য যা যা দরকার, তা-ই করছে। জিডিপি অনুযায়ী ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ছিল ২১.৪৪ ট্রিলিয়ন ডলার এবং চীনের জিডিপি ১৪.১৪ ট্রিলিয়ন ডলার। বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছে, চীন আগামী কয়েক বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে যাবে। এছাড়াও ২০১৯ সালে জাপান সেন্টার ফর ইকোনমিক রিসার্চের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে জিডিপি অনুযায়ী ২০৩০ সালে চীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অতিক্রম করবে। সম্প্রতি প্রকাশিত (মে, ২০২০) ইন্টারন্যাশনাল কম্পারিজন প্রোগ্রামের গবেষণা অনুযায়ী ক্রয়ক্ষমতার দিক থেকে চীনের অর্থনীতি ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। উক্ত প্রতিবেদন মতে, ২০১৭ সালে ক্রয়ক্ষমতার আলোকে চীনের জিডিপি ছিল ১৯.৬১ ট্রিলিয়ন ডলার এবং যুক্তরাষ্ট্রের ১৯.৫১ ট্রিলিয়ন ডলার।
তাই বলা যায়, সংগত কারণেই চীন-যুক্তরাষ্ট্রের স্নায়ুযুদ্ধের সূচনাতেই ছিল বাণিজ্যিক আঘাত।
২০১৯-এর শুরু থেকে এ পর্যন্ত বাণিজ্যযুদ্ধে চীনের ক্ষতি প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতি এর থেকে কম হলেও নগণ্য নয়। ইতিমধ্যে ৩-৪ লাখ মার্কিনি চাকরিচ্যুত হয়েছে। এই স্নায়ুযুদ্ধের ফলে গত বছর বিশ্ব জিডিপির দশমিক ৫ শতাংশ ক্ষয় হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরো বাড়বে।
কিছুদিন আগেও ৫জি প্রযুক্তির জন্য চীনা মোবাইল ফোন কোম্পানি হুয়াওয়ের বিশ্ব জুড়ে দাপট ছিল। তথ্য চুরির অভিযোগ তুলে ট্রাম্প প্রশাসন কোম্পানিটির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এতে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই কোম্পানিটির ক্ষতি হয় ৩০ লাখ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের চাপে হুয়াওয়ের বৃহত্ বাজার ব্রিটেনেও তা নিষিদ্ধের ঘোষণা আসে। সম্প্রতি হুয়াওয়ের সরবরাহকারীদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ অব্যাহতভাবে বেড়ে চলায় ফ্ল্যাগশিপ চিপসেট উত্পাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে হুয়াওয়ে। এতে বড় ধরনের লোকসানে পড়তে যাচ্ছে হুয়াওয়ে। গত কয়েক দশকের মধ্যে এটিই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক চাপ।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা-বিষয়ক মন্ত্রী অ্যালেক্স আজারের তাইওয়ান সফরে ক্ষুব্ধ চীন তাইওয়ানের কাছের সংবেদনশীল প্রণালি দিয়ে দুইটি যুদ্ধবিমান উড়িয়ে যেন যুক্তরাষ্ট্রকে আসন্ন সংঘাতের হুঁশিয়ারিই দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের বেইজিংকে চটিয়ে তাইওয়ানের সঙ্গে প্রকাশ্য সখ্য ‘এক চীন নীতিকে’ অগ্রাহ্য করারই দৃষ্টান্ত। যার ফলে মার্কিন সরকারকে সতর্কবার্তা দিয়েছে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাউ লিজিয়ান, ‘যারা আগুন নিয়ে খেলবে, তারাই বিপদে পড়বে।’
নভেম্বরের আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে চীন-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা আরো বাড়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। ডেমোক্র্যাট জো বাইডেন ও ট্রাম্প উভয়েরই নির্বাচনি প্রচারণার প্রধান জ্বালানি চীনবিদ্বেষ। দেশটিতে চীনকে প্রধান আলোচিত প্রসঙ্গে রাখাকে ট্রাম্পের নির্বাচনি জয় লাভের একটি কৌশলও বলা চলে। পরমাণু শক্তিধর দুই দেশের মধ্যে বিরাজমান উদ্দেশ্যপ্রণোদিত শীতল যুদ্ধ ক্রমেই উত্তপ্ত হতে হতে সামরিক সংঘাতে রূপ নেয় কি না—সেটাই এখন বৈশ্বিক আশঙ্কা!
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
