স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আর দলীয় প্রতীক চাই না

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২০, ১১:৩০

জাতীয় নির্বাচন আর স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের ধারণা বাংলাদেশের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। অল্পদিন হল শুরু হয়েছে এই চর্চা। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই চর্চা আমাদেরকে কোন সুখকর অনুভূতি এনে দেয়নি। বরং রাজনীতিরি আদর্শহীনতা, কোটারী স্বার্থ আর ইজমের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে নগ্নভাবে। বাংলাদেশের স্থানীয় নির্বাচনে  দলীয় প্রতীক ব্যবহার নতুন হলেও বহু দেশে এই সংস্কৃতি বিদ্যমান।

ভারত ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে হয়ে থাকে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ‘পুর নির্বাচন’ হয়েছে স্ব স্ব দলের প্রতীকে। দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হল ঔপনিবেশিক ও নয়া ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা সর্বদা রাজনীতি-বিযুক্ত নির্বাচন ব্যবস্থা চেয়েছে ও চায়। আমাদের গণতান্ত্রিক দীক্ষা ও উত্তরাধিকার যেখান থেকে পেয়েছি, সেই যুক্তরাজ্যেও কিন্তু দলীয় ভিত্তিতে স্থানীয় নির্বাচন হয়। প্রতিবেশী ভারতেও দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হওয়ার সংস্কৃতি জারি আছে। এই প্রেক্ষাপটেই হয়তা বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক চালু হয়। কিন্তু আমাদের মাঝে যে এখনও সেটি মেনে নেয়ারমত প্রস্তুতি নেই তা বিগত কয়েকটি নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে। আমরা এই ধারায় অভ্যস্থ নই এবং চর্চা করারও আগ্রহ নেই। বর্তমানে এটি পরিবর্তনের কথাও চলছে জোরে শোরে।

রাজনীতি নিয়ে সুযোগ পেলেই এক শ্রেণির মানুষ নেতিবাচক কথা বলেন। কিন্তু রাজনীতি এবং গণতন্ত্রের মাঝেই একটি দেশের এবং সমাজের পরিবর্তন হয়। 

রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই যে টার্মটি ব্যবহার করা হয় সেটিও একটি নেতিবাচক ধারণা থেকে এসেছে। এই কথার মানে হল একজন রাজনীতিবিদ তার সিদ্ধান্ত এবং নীতি আদর্শ যে কোন সময় পরিবর্তন করতে পারেন। যারা সারাজীবন শুদ্ধ রাজনীতি চর্চা করেন তাদের কাছে রাজনীতি নিয়ে এই অবহেলা পীড়াদায়ক। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক দেয়ার পর রাজনীতিবিদদের নীতি ও আদর্শ আরও বড় ধরনের প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

রাজনীতিতে যারাই নেতা হন তারা চেষ্টা করেন ইজম তৈরি করার জন্য। যোগ্য ও ত্যাগী লোককে স্থান না দিয়ে নিজের আস্থাভাজন লোকজনকে বড় বড় পদে আসীন করেন। শুধু তাই নয়, নিজ আত্মীয়-স্বজনকেও নিয়ে আসেন সামনে। এতে করে যারা শুদ্ধ রাজনীতি চর্চা করেন তারা উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক দেয়ার পর মনোনয়ন পেতে তৃণমূলের নেতার সমর্থন প্রয়োজন হয়। ফলে এখন সেই পদে নিজের লোক বসানোর কাজ হবে। আবার যারা দলীয় প্রতীক পান না তারা দলের সিদ্ধান্তের বাহিরে বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। তাদেরও কেন্দ্র এজেন্ট এবং কর্মীর জন্য তারা যে ইউনিটের নেতা সেই ইউনিটে নিজের আস্থাভাজন লোককে বসাবেন।

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমেই একজন নেতার সৃষ্টি হয়। এক সময় ছাত্রনেতারা অনেক ত্যাগ এবং সাধনার মাধ্যমে কর্মী সৃষ্টি করতেন। তারা এই কর্মীদেরকে দলের নীতি ও আদর্শের প্রশিক্ষণ দিয়ে বড় নেতা হিসাবে গড়ে তুলতেন। পরবর্তিতে এখান থেকেই সৃষ্টি সৃষ্টি হতেন জনপ্রতিনীধি। কিন্তু এই ধারার পরিবর্তন হয়েছে অনেক আগেই। এখন আর কেউ আদর্শ দেখে এবং নেতাদের মমতাময় আহবানে সাড়া দিয়ে দল করতে আসেন না। এখন যারা দল করতে আসেন তাদের কাছে ব্যাক্তিগত লাভালাভ গুরুত্বপূর্ণ। গোষ্ঠী অথব্য ব্যাক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য অনেকেই এখন রাজনীতিতে আসেন। ফলে রাজনীতির ভিত্তি দিনে দিনে আরও দুর্বল হচ্ছে।

যে যে দলই করুক না কেন রাজনীতি একটি নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্য দিয়েই করতে হয়। এই নিয়ম –শৃঙ্খলার মধ্যে অবশ্য করণীয় কিছু বিষয় হল দলের সিদ্ধান্ত মেনে চলা, দলীয় প্রতীককে সম্মান দেখানো এবং সেই প্রতীকে ভোট দেয়া এবং ভোট প্রার্থনা করা। পাশাপাশি দলের নেতার প্রতি পূর্ণ আনুগত্য থাকা। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক বরাদ্ধ দেয়ার পর দেখা গেল নেতা-কর্মীরা আর কেই এই ধারার মাঝে নেই। যে কোন নির্বাচনে একজন নেতা দলীয় মনোনয়ন পান।  কিন্তু যখন একজন নেতা দলীয় প্রতীক বরাদ্ধ পান তখন ঐ নেতাকে যারা পছন্দ করেন না অথবা নিজের স্বার্থ হানীর সম্ভাবনা থাকে তখন তারা আর দলীয় মনোনয় পাওয়া নেতার পাশে থাকেন না। অনেকেই নিস্ক্রিয় হয়ে যান। অনেকেই আবার দলীয় প্রার্থীকে ফেল করানোর জন্য তার প্রতিদ্বন্ধি প্রার্থীকে প্রকাশ্যে অথবা গোপনে সমর্থন করেন। অপরদিকে অনেক মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে হয়ে যান স্বতন্ত্র প্রার্থী। ওই স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আবার থাকেন রাজনৈতিক দলের কোন ইউনিট বা সহযোগী সংগঠনের প্রধান নেতা। তখন নির্বাচনে ওই বিদ্রোহী প্রার্থীরা তারা যে ইউনিট অথবা সহযোগী সংগঠনের নেতা সেই ইউনিটের নেতা-কর্মীদেরকে বাধ্য করেন দলীয় প্রার্থী ছেড়ে তার পক্ষে কাজ করার জন্য। নেতা-কর্মীরাও থাকেন মানসিকভাবে দুর্বল। কারন নেতাকে অনেক অনুনয় বিনয় করে এই পদ পেয়েছিলেন তারা। ভবিষ্যতে আরও বড় পদ পেতে হলে ওই নেতার আর্শীবাদ প্রয়োজন। তাই দলীয় প্রধানের সিদ্ধান্তে দলীয় প্রতীক বাদ দিয়ে ইউনিটের নেতাকে তোষনে ব্যস্থ থাকেন তারা। ফলে রাজনীতির গুণগত মান কতটা নিচে নামছে তা কি কেউ ভেবে দেখছেন। এখানে কিন্তু দলের ছেয়ে ব্যাক্তি বড় হয়ে যাচ্ছে। আর নেতা-কর্মীরারা যে দল এবং আদর্শ দেখে রাজনীতিতে আসেন না তারও একটি জলন্ত প্রমাণ। একই সাথে দলীয় প্রতীকের বিরুদ্ধে ওই সকল নেতা-কর্মীরা যখন রাজপথে ভোট প্রার্থনা করেন তখন সাধারন লোকজন মনে মনে হাসতে থাকে। রাজনৈতিক নেতা এবং দলকে তারা খাটো করে দেখার সুযোগ পান।

যদি এখন স্থানীয় সরকার থেকে দলীয় প্রতীক বাদ না দেয়া হয় তাহলে ভবিষ্যতে যখন দলের বিভিন্ন কমিটি হবে তখন নেতারা দলের উন্নতি চিন্তা না করে এবং যোগ্য লোককে দলের পদ না দিয়ে নিজের আজ্ঞাবহ এবং ঘনিষ্টজনদেরকে দিয়ে কমিটির পদ পূরণ করবেন। এতে করে দুর্বল হবে দল। রাজনীতির গূণগত মান আরও কমতে থাকবে। এতে করে নব্য ঔপনিবেশীকদের স্বার্থ চরিতার্থ হবে। তাই এখনই সময় এ ব্যাপারে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেয়ার। আর না হলে দেশের রাজনীতি দেউলিয়াপনা হয়ে যাবে।
লেখক: শাহ ফখরুজ্জামান, সাংবাদিক ও আইনজীবী