বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম
ফলে রিট দুটি খারিজ হয়। তবে হাইকোর্ট বিভাগ রিট আবেদনকারীগণের আইনজীবীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০৩-এর বিধান অনুসারে আপিল বিভাগে আপিল দায়েরের জন্য সার্টিফিকেট প্রদান করে।
এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, হাইকোর্ট বিভাগ তার রায়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে সিদ্ধান্তের অংশে এসে ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, ১৯৭৫’-কে ‘অকার্যকর একটি আইন হিসেবে’ অভিমত ব্যক্ত করলেও রায়ের গর্ভে এই আইনটিকে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৩(১) অনুযায়ী প্রণীত একটি বৈধ সাধারণ আইন হিসেবে উল্লেখ করেছে। হাইকোর্ট বিভাগ আরো অভিমত ব্যক্ত করে যে, ‘যেহেতু খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতি হিসেবে, সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে নয় ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি জারি করেছিলেন, সেহেতু, এটি একটি সাধারণ আইন’; সুতরাং এই আইন সংশোধন বা বাতিলের জন্য সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪২ অনুসরণ অর্থাত্ সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যদের সমর্থনে সংবিধান সংশোধনের কোনো প্রয়োজন নেই এবং সাধারণ আইন দ্বারা সংসদে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় তা বাতিল করা বৈধ। হাইকোর্ট বিভাগ রায়ে আরো অভিমত ব্যক্ত করে যে, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ যেহেতু একটি অকার্যকর আইন হিসেবে ঘোষিত হয়েছে, সুতরাং জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্টের ধারা-৬-এর বিধান অনুযায়ী রিট আবেদনকারীরা কোনো সুবিধা কেউ পাবে না—‘অর্জিত বা প্রাপ্ত অধিকারের’ অজুহাতে। (বি.এল.ডি. পৃষ্ঠা ১১৩, অনুচ্ছেদ ৬৪ ও ৮৭)।
আরো উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে, এ মামলার শুনানিতে রিট আবেদনকারীগণের বিজ্ঞ আইনজীবীর জোরালো বক্তব্য ছিল যে, ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এ একটি বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে।
ঐ বিপ্লবের ফলে সরকার পরিবর্তন হয় এবং একটি নতুন সরকার গঠিত হয়েছিল। সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে ৪র্থ তপশিলে অনুচ্ছেদ ‘৩ক’ ও ‘১৮’ সংযোজনের মাধ্যমে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এবং ৯ এপ্রিল ১৯৭৯-এর মধ্যবর্তী সময়ের সব কর্ম ও কার্যকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে; সুতরাং এ কার্যসমূহকে কোনো আদালতে চ্যালেঞ্জ করার আদৌ কোনো সুযোগ নেই। প্রতিউত্তরে তত্কালীন অ্যাটর্নি জেনারেল কে এস নবীর বক্তব্য ছিল যে, ১৫ আগস্টের ঘটনা কোনো বিপ্লব ছিল না; সশস্ত্র বাহিনীর একটি গ্রুপ অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে পরিকল্পিতভাবে তত্কালীন রাষ্ট্রপতির বাসভবন আক্রমণ করে তাকে সপরিবারে হত্যা করেছে। এটা রাষ্ট্রপতি এবং তার পরিবারবর্গকে খুনের একটি ঘটনা। অস্ত্রধারীদের সহায়তায় খন্দকার মোশতাক আহমেদ অবৈধ ও বেআইনিভাবে রাষ্ট্রপতির পদ দখল করেছিল। তার সব কর্মকাণ্ড অবৈধ ও অসাংবিধানিক এবং আইনের দৃষ্টিতে অকার্যকর। সুতরাং, খন্দকার মোশতাক কর্তৃক জারিকৃত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ আইনের দৃষ্টিতে অস্তিত্বহীন, অকার্যকর, অসাংবিধানিক এবং আসামিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চলতে কোনো বাধা নেই।
হাইকোর্ট বিভাগ, দুই বিজ্ঞ আইনজীবীর উপরিউক্ত পরস্পরবিরোধী বক্তব্যকে ‘আবেগতাড়িত বক্তব্য (emotional contentions)’ মর্মে অভিমত দেন। হাইকোর্ট বিভাগের অভিমত ছিল ‘যেহেতু সংসদে সংবিধানের ৫ম সংশোধনী দুই-তৃতীয়াংশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের ভোটে অনুমোদিত ও গৃহীত হয়েছিল, সুতরাং এটি সংবিধানের অংশ ও বৈধ। হাইকোর্ট বিভাগ এটিকে ‘অতীত ও সমাপ্ত (past and close)’ বিষয় হিসেবে মন্তব্য করে।
প্রাসঙ্গিকভাবে আরো উল্লেখ করা সংগত হবে যে, ৫ম সংশোধনীর বিষয়ে উপরিউক্ত মামলাসমূহে উক্ত সংশোধনীকে বৈধ মর্মে গ্রহণ করে রায় প্রদান করলেও এর প্রায় ১০ বছর পর (২৯.০৮.২০০৫) মাননীয় বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চ ‘ইটালিয়ান মার্বেল ওয়ার্কস লি. বনাম বাংলাদেশ সরকার’ মামলায় সংবিধানের ৫ম সংশোধনীকে অবৈধ, বেআইনি ও অকার্যকর মর্মে ঘোষণা করেন, যা আপিল বিভাগও বহাল রাখে।
হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে রিট আবেদনকারীগণের দায়েরকৃত আপিলসমূহ আপিল বিভাগেও আপিল খারিজ হয়। তবে হাইকোর্ট বিভাগ ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, ১৯৭৫ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও অকার্যকর একটি আইন হিসেবে’ পাঁচ জন অ্যামিকাস কিউরি ও অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে যে অভিমত দিয়েছিলেন তাকে আপিল বিভাগ ‘অযাচিত’ (uncalled for) হিসেবে আখ্যায়িত করে তা সমর্থনযোগ্য নয় বলে অভিমত দিয়েছে।
আপিল বিভাগের অভিমত ছিল ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, ১৯৭৫-এর আইনটিতে ‘অতি জাদুকরি (extra magic)’ কোনো বিষয় ছিল না। রাষ্ট্রপতি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৩(১) অনুসারে ঐ আইন জারি করেছিলেন। সংসদে কোনো অধ্যাদেশ অনুমোদন দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, তা সংবিধানের অংশে পরিণত হবে। সুতরাং, সাধারণ আইন হিসেবে বিবেচিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল বা পরিবর্তন অপর একটি সাধারণ আইন দ্বারা হতেই পারে; অতএব ইনডেমনিটি (বাতিল) আইন, ১৯৯৬ একটি বৈধ আইন।
ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ (বাতিল) আইন, ১৯৯৬ একটি বৈধ আইন হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগ থেকে ঘোষিত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর হত্যা মামলার তদন্ত ও বিচার দ্রুতগতি লাভ করে। মোট ২০ জন আসামির বিরুদ্ধে ঢাকার দায়রা জজ আদালতে বিচারকার্য শুরু হয়। আসামিদের বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ১২০বি/৩০২/৩৪ এবং ২০১ ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়।
চার্জ গঠনের পর একজন আসামি হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করে মামলা থেকে অব্যাহতি লাভ করেন। রাষ্ট্রপক্ষ কর্তৃক আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ঢাকার বিজ্ঞ জেলা ও দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল ০৮.১১.১৯৯৮ ইং তারিখের রায় প্রদান করেন। ঐতিহাসিক এই রায় ও আদেশে ১৯ জন আসামির মধ্যে ১৫ জন আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে সবাইকে ‘মৃত্যুদণ্ড’ প্রদান করেন। অন্যদের খালাস প্রদান করেন।
ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৩৭৪ অনুযায়ী বিচারিক আদালত প্রদত্ত ‘মৃত্যুদণ্ড’ আদেশ অনুমোদনের জন্য হাইকোর্টে রেফারেন্স পাঠানো হয়। হাইকোর্ট বিভাগের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জ্যেষ্ঠ বিচারপতিগণ এই ডেথ রেফারেন্স শুনানিতে বিব্রত বোধ করেন। তাদের এমন অপ্রত্যাশিত মানসিকতা কিছুটা হলেও সর্বোচ্চ আদালতের ভাবমূর্তিতে কলঙ্কতিলক এঁকেছিল। অবশেষে মাননীয় বিচারপতি মো. রুহুল আমিন ও মাননীয় বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চে এই ডেথ রেফারেন্সের শুনানি হয়। শুনানি শেষে বেঞ্চের একজন মাননীয় বিচারপতি মো. রুহুল আমিন ১০ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখেন এবং একজন আসামির দণ্ডাদেশ পরিবর্তন এবং পাঁচ জনকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে খালাস প্রদান করেন। কিন্তু বেঞ্চের অপর মাননীয় বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ১৫ জন আসামিরই মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রেখে তা অনুমোদন করেন। এর ফলে সংগত কারণে ডেথ রেফারেন্সটি তৃতীয় বেঞ্চে গড়ায়। তৃতীয় বেঞ্চের বিচারক হিসেবে মাননীয় বিচারপতি ফজলুল করিম ১২ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশের সাজা বহাল রেখে তিন জনকে খালাস প্রদান করেন।
এরপর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে কারাগারে আটক দণ্ডিত পাঁচ জন পৃথক পৃথকভাবে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ‘লিভ পিটিশন’ দাখিল করলে আপিল বিভাগে ‘লিভ’ মঞ্জুর হয়। আপিল বিভাগ দণ্ডিতদের পক্ষে উপস্থাপিত পাঁচটি আইনি বিষয় বিবেচনার জন্য লিভ মঞ্জুর, যা ছিল—‘‘(১) হাইকোর্ট বিভাগের একটি দ্বৈত বেঞ্চের দুই জন বিচারক ভিন্নমত পোষণ করে পৃথক পৃথক রায় প্রদান করায় তৃতীয় বিচারক পূর্ণাঙ্গভাবে অর্থাত্ সব সাজাপ্রাপ্তের বিষয়ে ডেথ রেফারেন্সটি শুনানি গ্রহণ না করে শুধু ছয় জন সাজাপ্রাপ্তের রেফারেন্স শুনানি করে আইনগত ভুল করেছে; (২) ‘দীর্ঘ বিলম্বে অর্থাত্ ২১ বছর পর রাষ্ট্রপক্ষ অসত্ উদ্দেশ্যে ও পরিকল্পিতভাবে মনগড়া গল্প তৈরি করে আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে’—কিন্তু হাইকোর্ট বিভাগ এ বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে সর্বোচ্চ সাজা ‘মৃত্যুদণ্ড’ দিয়ে চরম ভুল করেছে; (৩) ‘সামরিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সেনা বিদ্রোহের এক পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবারের সদস্যরা নিহত হয়েছেন’—এটা সাধারণ বা প্রচলিত কোনো খুন নয়; সুতরাং প্রচলিত আদালতে এ খুনের বিচার এক্তিয়ারবহির্ভূত ও বিচার কার্যক্রমকে কলুষিত (vitiated) করেছে; (৪) রাষ্ট্রপক্ষ কর্তৃক উত্থাপিত সাক্ষ্যসমূহ প্রমাণ করে না যে, হত্যাকে সংঘটিত করার জন্য কোনো ‘অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র’ হয়েছিল, বরং সামরিক বিদ্রোহ হয়েছিল মুজিব সরকারকে পরিবর্তনের জন্য; (৫) রাষ্ট্রপক্ষ দণ্ডিত আপিলকারীদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য আদালতে উপস্থাপনে এটি প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে যে, তারা দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় কোনো অপরাধ সংঘটিত করেছে এবং সে কারণে হাইকোর্ট বিভাগ আপিলকারীদের দণ্ড ও সাজা বহাল রেখে মারাত্মক ভুল এবং আইনের অপপ্রয়োগ করেছে।”
এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠন করলে আপিল বিভাগে বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচারের শেষ ধাপ থমকে যায়। আপিল শুনানির জন্য আপিল বিভাগে প্রয়োজনীয়সংখ্যক বিচারক নিয়োগ না দিয়ে কৃত্রিমভাবে বিচারকসংকট তৈরি করে রাখা হয়। বিশেষভাবে নিযুক্ত আইনজীবী বর্তমান আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে মামলা পরিচালনার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
অবশেষে দীর্ঘ আট বছর পর ২০০৯ সালে আবারও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে আপিল বিভাগে নতুন বিচারপতি নিয়োগের মাধ্যমে আপিল শুনানি সম্ভব হয়। আপিল বিভাগ সংশ্লিষ্ট পক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবীদের বক্তব্য শোনার পর দণ্ডিত আপিলকারীদের পক্ষে উত্থাপিত আইনগত প্রশ্নসমূহ সম্পর্কে নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত ও অভিমতসমূহ প্রদান করে আপিলসমূহ খারিজ করে দেয়—“(১) ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৩৭৪ ও ৪২৯ অনুসারে তৃতীয় বেঞ্চের বিজ্ঞ বিচারক সম্পূর্ণ এক্তিয়ার রাখেন যে, ‘তিনি বিরোধপূর্ণ কোনো বিষয়ের ওপর শুনানি করবেন’; সুতরাং তৃতীয় বেঞ্চের বিজ্ঞ বিচারক হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চের বিজ্ঞ বিচারকগণ যে ছয় জন আসামির বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন শুধু তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে কোনো ভুল করেননি; (২) বিজ্ঞ দায়রা জজ এবং হাইকোর্টের বিজ্ঞ বিচারকবৃন্দ দীর্ঘ বিলম্বে এজাহার দায়ের সম্পর্কে রাষ্ট্রপক্ষের ব্যাখ্যা ও সাক্ষ্য পর্যালোচনায় যে সিদ্ধান্ত একযোগে দিয়েছেন তাতে হস্তক্ষেপ করার কোনো সুযোগ নেই; শুধু বিলম্বে এজাহার দায়েরের কারণে প্রসিকিউশন অর্থাত্ রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ অবিশ্বাস করার কোনো সুযোগ নেই; বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক ঘটনা ও পরিস্থিতির কারণে এজাহার দায়েরে বিলম্ব হতেই পারে; (৩) আর্মি অ্যাক্ট-১৯৫২-এর ধারা ৫৯(২) অনুসারে ঐ আইনের অধীনে খুনের ঘটনা বিচার তখনই হবে যদি অপরাধীরা ‘সক্রিয় চাকরিরত’ থাকে; কিন্তু আসামিরা আর্মি অ্যাক্টের ধারা ৮(১) অনুসারে ‘চাকরিতে সক্রিয়’ ছিল না বিধায় প্রচলিত ফৌজদারি আদালতে তাদের বিচারে কোনো বাধা ছিল না; দ্বিতীয়ত যদি এটা ধরেও নেওয়া হয় যে, আর্মি অ্যাক্টের ধারা ৮(২) অনুসারে এটা একটি ‘দেওয়ানি অপরাধ’ (সিভিল অফেন্স) তথাপি ঐ আইনের ধারা ৯৪ অনুসারে প্রচলিত আদালতে বিচারে কোনো বাধা নেই; (৪) আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য পর্যালোচনায় এ সিদ্ধান্তে আসার কোনো সুযোগ নেই যে, ‘সেনা বিদ্রোহের কারণেই বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যবৃন্দ ও অপর তিন জন নিরাপত্তাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছিল’; এটা ‘সেনা বিদ্রোহ’ সংঘটিত করার জন্য কোনো অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র ছিল না, বরং ‘অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রটি’ ছিল বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যবৃন্দকে হত্যা করার জন্য; (৫) হাইকোর্ট বিভাগের বিজ্ঞ বিচারকবৃন্দ উপস্থাপিত সাক্ষ্য বিবেচনায় বিশ্বাস করেছেন যে, রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগসমূহ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণে সক্ষম হয়েছে; অন্যদিকে দণ্ডিত আপিলকারীগণ এটা প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে যে, হাইকোর্ট বিভাগ সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণে ও বিবেচনায় ‘গুরুতর কোনো ভুল’ বা ‘অবিচার’ করেছে—যাতে ন্যায়বিচার বিঘ্নিত ও আইনের অপপ্রয়োগ হয়েছে; (৬) দণ্ডিত আপিলকারীগণ আদালতের সামনে এমন কোনো ‘বিশেষ বিষয়’ বা ‘প্রেক্ষাপট’ উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়নি যার ভিত্তিতে তাদের মৃত্যুদণ্ডের সাজা হ্রাস করা যেতে পারে এবং সে কারণে দায়রা আদালত কর্তৃক প্রদত্ত ‘মৃত্যুদণ্ডের’ সাজা যা ডেথ রেফারেন্সে হাইকোর্ট অনুমোদন দিয়েছে—তাতে হস্তক্ষেপ করার কোনো সুযোগ নেই।”
‘বিলম্ব কোনো অপরাধীর বিচারে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না’—এই আইনি নীতিটি আবারও স্বীকৃতি পায়। বিচার চাইবার অধিকার সাংবিধানিক ও সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত। এই স্বীকৃত অধিকারকে স্বৈরাচারী কোনো অধ্যাদেশ দ্বারা রুদ্ধ করা যায় না। আপিল বিভাগের রায়ের পর পরই কারাগারে থাকা দণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ জনের ফাঁসির আদেশ কার্যকর হয় ২৮ জানুয়ারি, ২০১০-এ। সাম্প্রতিক সময়ে আরো এক জন দণ্ডিতকে গ্রেফতার করে ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। জাতি কিছুটা হলেও কলঙ্কমুক্ত হয়েছে; অবসান হয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও গ্লানি। দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট বিলম্বে হলেও জাতির জনকের হত্যার বিচারে অর্পিত সাংবিধানিক ও আইনি দায়িত্ব পালনে সক্ষম হয়েছে বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে। (গতকালের পর শেষাংশ)
n লেখক : বিচারপতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট,
হাইকোর্ট বিভাগ এবং সাবেক চেয়ারম্যান,
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১, বাংলাদেশ
