এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির ব্যত্যয় প্রয়োজন

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২০, ২১:২৯

বহুদিন ধরিয়া আমরা একই চিত্র দেখিয়া আসিতেছি রাজনৈতিক অঙ্গনে। ক্ষমতাসীন দল হঠাত্ বিশাল রাজনৈতিক দলে পরিণত হইয়া যায়। তাহার পর এই ক্ষমতাসীন দলের ভুঁইফোঁড়রা অত্যাচার-নির্যাতন, টেন্ডার দখল, অফিস দখলে মত্ত হইয়া উঠেন। ইহাদের কর্মকাণ্ড এতই প্রকট হইয়া উঠে যে, প্রশাসনিক কাজকর্ম দারুণভাবে ব্যাহত হইতে থাকে। কোনো সন্দেহ নাই, এই সকল অনুপ্রবেশকারী আদর্শহীন রাজনীতি-ব্যবসায়ী। অর্থাত্ রাজনীতিই তাহাদের ব্যবসায় এবং সহজে কোটি কোটি টাকার মালিক হইবার পথ। আবার প্রশাসনের কিছু কর্মচারীও তাহাদের সকল কর্মে সহযোগী হইয়া উঠে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের দুরভিসন্ধিতে। এই অনুপ্রবেশকারী কাহারা, উহা কি ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন সিনিয়র পদে থাকা ব্যক্তিরা খতাইয়া দেখেন? না, সেই সময়টুকু তাহাদের হয় না। বরং ক্ষেত্রবিশেষ এই সকল অন্যায়কারী, অপরাধী, সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যতাহীন ব্যক্তিকে চক্ষু মুদিয়া পৃষ্ঠপোষকতা দিয়া থাকেন। এই যে আমরা দেখিতে পাই—সরকারি দলের পরিচয় বহনকারী ব্যক্তি অনেকেই ২ হাজার কোটি, ৩ হাজার কোটি টাকা মানি লন্ডারিং করিয়া ধরা পড়েন, তাহাদের ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্বশীলরা পূর্বে দেখিতে পান না? হঠাত্ করিয়া বিপুল অর্থের মালিক হইয়া যাওয়া ব্যক্তিদের দল কি কখনো জিজ্ঞাসা করিয়াছে, ‘রাজনীতি করিতেছে ভালো কথা; কিন্তু তোমার এই অস্বাভাবিক পরিমাণ অর্থের উত্স কী?’

এই সকল ব্যক্তি দলকে জনপ্রিয়তার কথা শুনাইয়া থাকে। দল তাহা শুনিয়া আত্মতুষ্টিতে ভোগে; কিন্তু প্রকৃত অর্থে সাধারণ মানুষের ভিতরের চিত্কার ক্ষমতাসীনরা আর শুনিতে পায় না। এত দুর্নীতির বিরুদ্ধে মহড়া, এত অভিযানের কথা আমরা শুনিতে পাই; অথচ কী হইতেছে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে তাহার সঠিক খবর দল রাখিতেছে কি? ইহাই যেন আমাদের কমন চিত্র। অতীতেও যাহারা ক্ষমতায় ছিলেন তাহাদের একাংশের দাপটে ঘরবাড়িতে টিকিয়া থাকাই সাধারণ মানুষের জন্য কঠিন কর্ম হইয়া গিয়াছিল। সেই ক্ষমতা যখন চ্যুত হয় তখন ঐ দাপুটে লোকেরা হয় সাধারণ পাবলিকের কাতারে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে, অথবা নিজের খোল-নলচে পালটাইয়া বর্তমানের সহিত মিশিয়া গিয়াছে। সুতরাং যেই দল ক্ষমতায় থাকিবে তাহাকে ভবিষ্যতের দিকেও তাকাইতে হইবে। কারণ ভবিষ্যত্ দেখিতে না পাওয়া অন্ধত্বেরই শামিল। একটি দলের নেতাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছায় নিজেদের রাজনৈতিক মত ও পথের দিকে তাকাইয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতে হয়; কিন্তু সেই ধারা যেন দিনে দিনে ‘নাই’ হইয়া যাইতেছে। বাংলাদেশের অনেক জেলা-উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়েও দেখা যাইতেছে ব্যক্তি পছন্দ, আর্থিক ও বিভিন্ন স্বার্থ দ্বারা বিক্রয় হইয়া অনাকাঙ্ক্ষিত, অগ্রহণযোগ্য ও ভিন্নমতাবলম্বীদের দলের পদ-পদবি দেওয়া হইতেছে। বলিলে অত্যুক্তি হইবে না যে, ইহা দলকে একধরনের বিক্রয় করা ছাড়া আর কিছুই নহে। ক্ষমতাসীন দলই হউক বা ক্ষমতার বাহিরে থাকা দলই হউক সকলেরই উচিত দলকে এহেন অপব্যবহার হইতে যে করিয়াই হউক মুক্ত করা। বিশেষ করিয়া, এই দায়িত্ব সরকারে থাকা দলের জন্য অপরিহার্য। মনে রাখিতে হইবে, একটি দল ক্ষমতায় থাকিতে অপাঙেক্তয় ব্যক্তিদের দ্বারা যতটা দূষিত হয়, দল ততই দুর্বল হইতে থাকে। আর দুর্বল হইতে হইতে এমন স্তরে নামিয়া যাওয়ার ভয় থাকে যে পরবর্তী সময়ে আর কণ্ঠস্বরও শুনিতে পাওয়া যায় না। ইহাও আমরা অতীত ইতিহাসে দেখিয়াছি।