ধরতে হবে পিরামিডের পাটাতনকে

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২০, ২১:২৯

ড. আতিউর রহমান

ধীরে ধীরে বাংলাদেশের অর্থনীতি আড়মোড়া ভেঙে ঘুড়ে দাঁড়াতে শুরু করেছে। কৃষি, প্রবাসী আয় ও তৈরি পোশাকশিল্প প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরে আসায় অর্থনীতিতে এই গতিময়তা লক্ষ করা যাচ্ছে। মহামারির প্রকোপ সত্ত্বেও সরকার অর্থনীতি খুলে দেওয়ার যে ঝুঁকি নিয়েছে, তাতেই এই পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। কয়েক দিন আগে আমি গাইবান্ধার কমিউনিটি রেডিও সারাবেলার উদ্যোগে আয়োজিত একটি ওয়েবিনারে অংশগ্রহণ করেছিলাম। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আলমগীর কবির, স্থানীয় এনজিও এসকেএসের নির্বাহী প্রধান লিটন এবং দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়াহারা আমার সঙ্গে ঐ আলোচানায় যোগ দিয়েছিলেন। আলোচনায় যেটি বের হয়ে এলো তা ছিল সত্যি স্বস্তিদায়ক। লিটন ও আলমগীর কবির জানালেন, গাইবান্ধায় যে হারে নদী ভেঙেছে, চর ডুবেছে এবং উদ্বাস্তু মানুষকে বাঁধে ও আশ্রয়কেন্দ্রে চলে আসতে হয়েছিল, সেই তুলনায় কষ্ট কমই হয়েছে। আসলেই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ছিল সুসংহত ও সমন্বিত। নিঃসন্দেহে অল্প পরিসরে অনেক মানুষকে একসঙ্গে থাকতে হয়েছে। স্যানিটেশন ও গবাদি পশু দেখভালে সমস্যা হয়েছিল। কিন্তু এর মধ্যে বয়স্ক ও শিশুদের জন্য আলাদা থাকার ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত ত্রাণের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ত্রাণ নিয়ে কোনো অনিয়ম বরদাস্ত করবেন না বলে যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তার ইতিবাচক প্রভাব মাঠে পড়েছে। তাছাড়া, জাতীয় সংসদের মাননীয় ডেপুটি স্পিকারসহ নির্বাচিত সব প্রতিনিধিই ত্রাণ সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ‘রেডিও সারাবেলা’ থেকে বলা হলো যে তারা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্য কেউ কোথাও কোনো অনিয়ম বা সমস্যার কথা তুলে ধরলে প্রশাসন সদিচ্ছা নিয়ে এগিয়ে এসেছে সেসবের সমাধান করতে। আরো বলা হয় যে চরের প্রতিটি বাড়ি বা দোকান যদি একেকটি মিনি আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে বন্যার্তরা ঘরেই থাকবে। নিচে ৮-১০ ফুট খালি রেখে লোহার পিলারের ওপর প্রিফ্যাবরিকেটেড উপকরণ দিয়ে ঘর তৈরি করে দিলে মানুষ ঘরেই থেকে যাবে। আর কমিউনিটিনির্ভর টিলা করে গবাদি পশু রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাছাড়া চরের মানুষের উন্নয়নে একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার ওপরও আলোচকেরা জোর দেন। তবে আলোচনায় সবাই বললেন যে এমনিতে করোনার চাপে অনেকেই আয়-রোজগার হারিয়ে ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে গ্রামে ফিরে গেছেন। বন্যার কবলে পড়ে তারা এবার বেশি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। বর্তমানে স্থানীয় প্রশাসন স্থানীয় এমএফআইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবেই কাজ করছে। তাই অন্তত বন্যার্ত এলাকায় টার্গেট করে কৃষিঋণ ও ক্ষুদ্রঋণ যাদের প্রয়োজন বেশি তাদের কাছে যাতে দ্রুত পৌঁছানো যায়। ভালো কথা যে গত জুলাই মাসে কৃষিঋণ বিতরণ ও আদায় দুইই বেড়েছে। গত বছরের জুলাই মাসে যেখানে ৯৭৭ কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করা হয়েছিল, তা বেড়ে এ বছরের জুলাই মাসে ১ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা হয়েছে। এমএফআই ঋণ বিতরণে গতি আনা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। কৃষি ও এমএফআই ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোকে আরো তত্পর হতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ বছর ২৬ হাজার কোটি টাকা কৃষিঋণের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে। তাছাড়া কৃষি খাতের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এই ঋণের সুদ মাত্র ৪ শতাংশ। বাকি ৫ শতাংশ সুদ ভর্তুকি হিসেবে দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার। এর ওপর আছে ঘূর্ণায়মান ৩ হাজার কোটি টাকার সুদ খাতের জন্য ঋণ। তাছাড়া ২০ হাজার কোটি টাকার যে আরেকটি প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার, তার উপকারভোগী হবেন কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তরা। এর অর্ধেক আবার পুনঃঅর্থায়ন।

সুতরাং টাকার কিন্তু অভাব নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক যথেষ্ট সাহসের সঙ্গে ছোট ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের জন্য (যাদের মধ্যে আধুনিক কৃষকও রয়েছেন) অর্থের জোগান দিয়েছে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো, কী করে এসব অর্থ প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছানো যায় সেটি। বাংলাদেশ ব্যাংক বারবার তাগাদা দিলেও ব্যাংকগুলো এখনো সেভাবে এগিয়ে আসছে না। ব্যাংকের যদি কোনো সমস্যা থাকে, তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে খোলামেলাভাবে আলাপ-আলোচনা করে এসবের সমাধান করা যায়। যেমন বলা হয়েছে, ৩৫ শতাংশ ঋণ ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের দেওয়া যাবে। অথচ এ খাতেই চাহিদা বেশি। তাই ব্যাংকের দাবি, এই অনুপাত ৫০ শতাংশে উন্নীত করা হোক। অন্যদিকে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের চলতি মূলধনের অংশগুলো নিয়ে খানিকটা খটরমটর রয়ে গেছে। কাঁচামাল কেনার অর্থ কি চলতি মূলধন? নিশ্চয়! তাই চলতি মূলধন ‘অ্যাসেসমেন্ট’ ব্যাংকারদের সঙ্গে আলাপ করে সব জটিলতা দ্রুত নিষ্পন্ন করা সম্ভব। প্রতিনিয়ত আলাপ-আলোচনা করে ঋণ বিতরণের চাকা গতিময় করতে হবে এবং যাতে করে নারী উদ্যোক্তাসহ (তারা ১৫ শতাংশ পাবেন) ছোটখাটো উদ্যোক্তাদের খুব সহজেই ঋণ দেওয়া যায়, সেই উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, তারা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণের কাগজপত্র কমিয়ে ফেলেছে। ঋণ আবেদন এক পৃষ্ঠার মধ্যে সীমিত রাখতে বলা হয়েছে। ঋণ আবেদন ও কাগজপত্রের তালিকা দ্রুত একটি ডিজিটাল অ্যাপে ভরে বাংলাদেশ ব্যাংক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জীবন সহজ করে দিতে পারে। অন্তত ২ লাখ টাকার এমন ঋণ জামানত ছাড়াই দেওার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অবশ্য নারী উদ্যোক্তাদের আগেই আরো বেশি ছাড় দেওয়া আছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, এসব সুবিধে কি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা আদৌ পাচ্ছেন? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্যই কেন্দ্রীয় ব্যাংকে একটি ডিজিটাল মনিটরিং কমিটি থাকতে পারে, যাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়, চেম্বার প্রতিনিধি, ব্যাংকারদের প্রতিনিধি এবং ইচ্ছা করলে একজন বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি থাকতে পারেন। এ কমিটি ডিজিটালি প্রতি সপ্তাহে বসবে এবং নির্দিষ্ট কিছু কি পারফরম্যান্সভিত্তিক সূচকের মনিটর করবে। ব্যাংক ও নন-ব্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলোকে যে টার্গেট দেওয়া হয়েছে, সেগুলো ভেঙে মাসওয়ারি টার্গেটে রূপান্তরিত করা যেতে পারে। কোন অঞ্চলে, কোন খাতে কতজন, কত টাকা ঋণ পেলেন, তার অঙ্ক ঐ কমিটির চ্যাটবক্সে দেওয়া হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাচিবিক দায়িত্ব পালন করে ড্যাসবোর্ডের আদলে এমন একটি যথাযথ মনিটরিং কাঠামো নিশ্চয় তৈরি করতে সক্ষম। এলসি নিষ্পত্তির বিষয়ে চমত্কার একটি ড্যাসবোর্ড একসময় তৈরি করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সুতরাং তাদের এ ব্যাপারে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা আছে। তাছাড়া, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনীহার কারণে অনেক উদ্যোক্তাই বাধার মুখে পড়তে পারেন। তারা যাতে তাদের অভিযোগ কোথাও জানাতে পারেন, তার একটা ব্যবস্থা করা নিশ্চয় সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংকেই গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণকেন্দ্র রয়েছে। ১৬২৩৬ নম্বরের একটি হটলাইনও আছে। প্রয়োজনে এর জনবল ও প্রযুক্তির আধুনিকায়ন করা যেতে পারে। আরেকটি কারণে ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণ দিতে চায় না। কারণ এই খাতে খেলাপি হওয়ার আশঙ্কা বেশি। সেজন্য ঘোষিত ‘ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমটি দ্রুত বাস্তবায়নে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক উদ্যোগ নিতে পারে। ভারত কিন্তু শতভাগ এসএমই ঋণকে এই গ্যারান্টি দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। তাছাড়া গ্রামীণ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের এমএফআইগুলো ভালো চেনে এবং জানে। তাদের কাছে পৌঁছানোর জন্য ব্যাংকগুলোকে লিংকেজ কর্মসূচিতে যেতে উত্সাহ দেওয়া যেতে পরে। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর ভালো অভিজ্ঞতা রয়েছে। এখন হয়তো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলার খানিকটা বদলে ব্যাংক ও এমএফআইকে এক মঞ্চে আনতে হবে। এমআরএ এক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বসে নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে প্রত্যেক ব্যাংককে প্রণোদনা খাতের এসব ঋণ বিতরণে সহায়তা করার জন্য প্রত্যেক শাখায় ‘হেল্প ডেস্ক’ তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছে। তাছাড়া জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে এসব ঋণের তত্ত্ববধান ও মনিটরিংয়ের উদ্যোগ নিতে বলেছে।

আমার ধারণা, অর্থনীতি যখন আরেকটু চাঙ্গা হবে, তখন মানুষের আয়-রোজগার বাড়বে। আর আয়-রোজগার বাড়লে ভোগও বাড়বে। ভোগ বাড়লে চাহিদাও বাড়বে। তবে গরিবের আয়-রেজাগার আর্থিক খাত একা বাড়াতে পারবে না। নগদ সহায়তাসহ নানামাত্রিক সামাজিক সুরক্ষা এবং গ্রামীণ পূর্তকর্মে ন্যূনতম ১০০ দিনের কর্মসংস্থানের মতো কর্মসূচিতে রাজস্ব সমর্থনেরও প্রয়োজন রয়েছে। হতাশ না হয়ে ব্যাংকগুলোর এমন সংকটকালে সামাজিক দায়িত্ববোধে উজ্জীবিত হয়েই পিরামিডের নিচের অংশের মানুষগুলোর হাতে অর্থ পৌঁছানোর উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তার মানে সামাজিক পিরামিডের পাটাতনকে আমাদের অবশ্যই ধরতে হবে। এবার বাড়তি সুবিধ এই যে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক তারল্য সমর্থন দিচ্ছে। রয়েছে সাশ্রয়ী মোবাইল আর্থিক সেবা ও এজেন্ট ব্যাংকিং। আশার কথা, সিটি ব্যাংক ও বিকাশকে অতিক্ষুদ্র বা ‘ন্যানো’ ঋণ চালু করার জন্য একটি পাইলট কর্মসূচি পরিচালনার অনুমতি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ‘আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স’ ব্যবহার করে বিকাশে লেনদেনের ওপর ভিত্তি করে কয়েক মিনিটের মধ্যে ঋণের প্রস্তাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদন করা সম্ভব হবে। খুদে উদ্যোক্তারা হঠাত্ সামান্য নগদ অর্থের প্রয়োজন পড়লে এভাবেই পূরণ করতে পারবেন। ব্যাংক এশিয়া একটি ডিজিটাল ব্যাংকের সাবসিডিয়ারির জন্য আবেদন করবে। বিকাশের মতোই একটি উদ্যোগ হতে পারে। এ ধরনের উদ্ভাবনীমূলক ফিনটেকভিত্তিক আবেদন নিশ্চয় বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা অফিসগুলোও আরো তত্পর হতে পারে। সবাই মিলে চেষ্টা করলে নিশ্চয় আমরা দুর্যোগকালের এই অর্থনীতিকে জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হব। সংকট সুযোগেরও সৃষ্টি করে। এই মহামারি আমাদের জন্য বাড়তি সুযোগ নিয়ে আসুক সেই প্রত্যাশাই করছি।

n লেখক :ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর