কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা কথাসাহিত্যে প্রথম শ্রেণির গল্পকার ও ঔপন্যাসিকদের তালিকায় সাধারণভাবে পড়েন না। কথাসাহিত্যের ইতিহাস গ্রন্থগুলোতেও তিনি অন্তর্ভুক্ত হননি। কিন্তু তাঁর লেখা মাত্র উনিশটি গল্প এবং তিনটি উপন্যাসে তিনি এমন অনেক মেধাবী স্বাক্ষর রেখেছেন যা পূর্বসূরি, এমনকি সমসাময়িক শক্তিমান কথাসাহিত্যিকদের রচনাতেও দেখা যায়নি।
বিশ বছরের নজরুল ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে প্রথম গল্প ‘বাউণ্ডেলের আত্মকাহিনী’ লিখেছিলেন। ১৯১৯ ও ১৯২০ সালের ভেতরেই বেরিয়ে গিয়েছিল তাঁর দুটি গল্পগ্রন্থ ‘ব্যথার দান’ ও ‘রিক্তের বেদন’-এর সব গল্প। সাথে সাথে চলছিল উপন্যাস ‘বাঁধনহারা’। তারপর পাঁচ-ছয় বছর বিরতি। ততদিনে নজরুল জনপ্রিয় কবি। শুরু করলেন উপন্যাস ‘মৃত্যুক্ষুধা’ ও ‘কুহেলিকা’। এরপর আবার ছোটগল্পে ফিরে আসা। চারটি গল্প যা দিয়ে ‘শিউলিমালা’ গ্রন্থটি। আরও অনেক পরে লিখেছেন ‘বনের পাপিয়া’ গল্পটি।
‘বাঁধনহারা’ উপন্যাসে দেখা যায় প্রচলিত গল্প-কাঠামোকে উপস্থাপন করার রীতি নজরুল অনুসরণ করেননি। উপন্যাসটির ১৮টি পত্র জুড়ে অনেক কিছুই অস্পষ্ট। এই অস্পষ্টতা কিন্তু ঠিক ডিটেকটিভ নভেলের মতোও নয়। গত শতাব্দীর আশির দশক বা নব্বইয়ের দশকে এমন রহস্যময়তা পৃথিবীর অনেক বড়ো বড়ো ঔপন্যাসিকের লেখাতেই আমরা পেয়েছি, যা কিনা নজরুল ষাট-সত্তর বছর আগেই উপস্থাপন করেছিলেন।
‘বাউণ্ডেলের আত্মকাহিনী’ বাঙালি মুসলমানের লেখা প্রথম গল্প। গল্পের সৈনিকজীবন বাংলা সাহিত্যে অদৃষ্টপূর্ব। আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসে জীবনদর্শনের বহিঃপ্রকাশ নজরুলের ‘বাঁধনহারা’-তেই প্রথম। তাঁর অন্য আরেকটি বিশিষ্টতা এই যে মুসলমান ঔপন্যাসিকদের মধ্যে সর্বপ্রথম তাঁর উপন্যাসেই খোলামেলাভাবে প্রেম এসেছে। নজরুলের কথাসাহিত্যেই প্রথমবারের মতো পত্র ও ডায়েরির ব্যবহার লক্ষ করা যায়।
নজরুল তাঁর গল্প-উপন্যাসে মনঃসমীক্ষণ পদ্ধতির ব্যবহারও করেছেন। ‘বাঁধনহারা’য় শুধু মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা নয়, একই সঙ্গে আমাদের চেতনাস্রোতের লিপিরূপ দেওয়া হয়েছে। নজরুল তাঁর গল্প-উপন্যাসের ভাষাকে খুব বেশি মুখের ভাষার কাছাকাছি নিয়ে এসেছিলেন। প্রথম পর্বের লেখায় আরবি, ফারসি শব্দেরও প্রাচুর্য লক্ষ করা যায়। এ পর্যায়ের শেষ দিকের গল্প ‘রাক্ষুসী’-তে দেখি তিনি আঞ্চলিক ভাষাকে কথাসাহিত্যের ভাষা করে ফেলছিলেন সহজেই। বীরভূমের বাগদিদের ভাষায় রচিত ‘রাক্ষুসী’ গল্পটি বাংলা সাহিত্যে প্রথম আঞ্চলিক ভাষার সাহিত্যকর্ম হিসেবে মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য। ‘রাক্ষুসী’র আঞ্চলিক ভাষা ‘মৃত্যুক্ষুধা’র প্রধান অবলম্বন। ভাষা নিয়ে নজরুলের এই নিরীক্ষা পরবর্তীকালে রচিত তাঁর গল্পগুলোতেও লক্ষ করা যায়। ‘অগ্নি-গিরি’ গল্পে ময়মনসিংহের এবং ‘জিনের বাদশা’ গল্পে পূর্ববঙ্গের উপভাষার ব্যবহার বেশ মনোযোগ কাড়ে।
ব্রাত্যজন যে ‘মৃত্যুক্ষুধা’য় প্রথম এসেছে তা নয়। ‘রাক্ষুসী’ও কিন্তু ব্রাত্যসমাজেরই কথা। নজরুলের অসাধারণত্ব এই যে তিনি সে-সমাজকে দেখেছেন ভেতর থেকে, তাঁর পূর্বসূরিদের মতো বাইরে থেকে নয়। তাছাড়া নজরুল আরও অতিরিক্ত যে কাজটি করেছেন তা হলো, তিনি সে-সমাজের মানুষের মুখে সভ্য সমাজের ভাষা না দিয়ে তাদের নিজেদের ভাষা দিয়েছেন। ‘মৃত্যুক্ষুধা’ তো খ্রিস্টান সমাজেরও কথা। নজরুল তাঁর মৃত্যুক্ষুধায় সে-খ্রিস্টানকে জীবন্ত চরিত্র বানিয়েছেন। মৃত্যুক্ষুধার আনসারই বাংলা সাহিত্যের প্রথম সাম্যবাদী চরিত্র।
‘কুহেলিকা’ কাঠামো প্রশ্নে নজরুলের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। নায়ক জাহাঙ্গীরের অন্বিষ্ট মুসলমানত্ব নয়, ভারতীয়ত্ব। শুধু কি তা-ই, নজরুলের জাহাঙ্গীরই তো প্রথম মুসলমান সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবী। এছাড়া, জাহাঙ্গীরই তো বাংলা উপন্যাসের প্রথম নায়ক যে কিনা জারজ বা কামজ সন্তান।
নজরুলের কথাসাহিত্যের দ্বিতীয় পর্বের সর্বশেষ নিদর্শন তাঁর ছোটগল্পের বই ‘শিউলিমালা’। এতে গল্প-কাঠামোর ব্যাপারে তিনি খুব সচেতন হয়ে উঠেছেন। পূর্ববর্তী গল্পগ্রন্থদ্বয়ের ভাবালুতা ও রোমান্টিকতা এখানে অন্তর্হিত। সর্বশেষ গল্প ‘বনের পাপিয়া’ও তা-ই। ‘শিউলিমালা’ থেকে ‘বনের পাপিয়া’র পার্থক্য এই যে, অতিরিক্ত হিসেবে সেখানে প্রতীকী ব্যঞ্জনা যুক্ত হয়েছে। অনেকের মতে, ‘পদ্ম-গোখরো’ থেকেও ‘বনের পাপিয়া’ উত্কৃষ্টতর। ‘পদ্ম-গোখরো’-তে জোহরার যে অতৃপ্ত মাতৃত্ব সেটাই ‘বনের পাপিয়া’র প্রতিপাদ্য। কিন্তু অতিরিক্ত যে প্রতীকী ব্যঞ্জনা তা হলো পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার মিলন। ‘একমাত্র শ্রীকৃষ্ণ পরম স্বামী, বাকি সব প্রকৃতি’ গীতার এই দর্শন রমলার চৈতন্যে ক্রিয়াশীল।
আর এভাবেই কাজী নজরুল ইসলামের গল্প-উপন্যাসের গভীর পাঠ আমাদেরকে দিতে পারে নতুন থেকে নতুনতর ইঙ্গিত, গভীর থেকে গভীরতর অবলোকন।
