প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীকে বিদ্যুত্ ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, বিদ্যুত্ উত্পাদন খরচ অনেক বেশি হওয়া সত্ত্বেও ভর্তুকি দিয়ে কম পয়সায় তা গ্রাহকদের কাছে সরবরাহ করা হচ্ছে। তাই অহেতুক বিদ্যুত্ অপচয় করবেন না। বিদ্যুত্ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই মিতব্যয়ী হবেন, সাশ্রয়ী হবেন। ২০২১ সাল নাগাদ দেশের প্রতিটি বাড়ি বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে গণভবন থেকে ভার্চুয়াল কনফারেন্সের মাধ্যমে ১৮টি জেলার ৩১টি উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়নের উদ্বোধনকালে তিনি এ কথা বলেন। এছাড়া তিনি এ সময় দুটি বিদ্যুেকন্দ্র, ১১টি গ্রিড সাবস্টেশন এবং ছয়টি নতুন ট্রান্সমিশন লাইনের উদ্বোধন করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিদ্যুত্ ব্যবহারে সচেতন হলে বিদ্যুতের বিল কম আসবে, তাতে গ্রাহকেরই লাভ হবে। অন্তত নিজেদের কথা চিন্তা করে বিদ্যুত্ বিল যাতে কম ওঠে, সেদিকে লক্ষ রেখে বিদ্যুত্টা সবাই ব্যবহার করবেন। অপচয়টা বন্ধ করবেন। এটা আমার বিশেষভাবে অনুরোধ।’ বিদ্যুত্ খাতে গত ১০ বছরে সরকারকে ৫২ হাজার ২৬০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে বলে গত ফেব্রুয়ারিতে সংসদে জানিয়েছিলেন বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এখন এলএনজি আমদানি করছি এবং এখনো বিদ্যুত্ খাতে বিরাট অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু সবাইকে এ কথা মাথায় রাখতে হবে যে সরকারের পক্ষে সব সময় এই বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব নয়। তবু এখন যেহেতু আমরা উন্নয়নের জন্য ব্যাপক কর্মসূচি করছি, সেজন্য মানুষের অসুবিধাগুলো আমরা দূর করতে চাইছি।’
বৃহস্পতিবার ১৮ জেলার ৩১টি উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়ন কার্যক্রমের উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপনে ব্যাপক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। ২০২০ থেকে ২০২১ সাল মুজিববর্ষ ঘোষণা করে ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী বড় পরিসরে পালনের পরিকল্পনা হয়েছিল। কাজেই ২০২০ থেকে ২০২১—এই বছরের মধ্যে আমরা সমগ্র বাংলাদেশের প্রত্যেক ঘরে আলো জ্বালাব। ইতিমধ্যে আমরা জনগণকে ৯৭ দশমিক ৫ শতাংশ বিদ্যুত্ দিতে সক্ষম হয়েছি।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭৫ সালে জাতির পিতাকে হত্যার পর থেকে হত্যা, ক্যু, ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু হয়। মিলিটারি ডিক্টেটররা মার্শাল ল জারি করে এদেশের শাসনভার হাতে নেয় এবং তারা স্বাভাবিকভাবেই অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে সেই ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার জন্য স্বজনপ্রীতি, তোষামোদি ও দুর্নীতিকে স্থায়ী রূপ দিয়ে যায়। বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময় নিজের এলাকা টুঙ্গিপাড়ায় গেলে কেমন অভিজ্ঞতা হতো, সে কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘হয়তো সারা দিনেও বিদ্যুত্ পেতাম কি না সন্দেহ, পেতাম না। জেনারেটর দিয়ে চালাতে হতো বা হারিকেন জ্বালাতে হতো। কিন্তু আমরা যখন উন্নয়ন করি, তখন কিন্তু আমরা এই রকম নির্দিষ্ট কোনো জায়গাকে অবহেলা করি না। কাজেই আজকে সেটার একটা দৃষ্টান্ত পাচ্ছেন যে বগুড়া জেলায় (খালেদা জিয়ার নির্বাচনি এলাকা ও শ্বশুরবাড়ি) ১১০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুত্ উত্পাদনকেন্দ্র আমরাই প্রতিষ্ঠা করেছি এবং আমরা আজকে তা উদ্বোধন করছি।’
শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতায় যে উপজেলাগুলোকে আনা হয়েছে তা হলো :ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর, সরাইল ও আশুগঞ্জ, চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ ও কচুয়া, কুমিল্লা জেলার বরুড়া ও মুরাদনগর, ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা ও বোয়ালমারী, গাইবান্ধা জেলার সাদুল্লাপুর, ঝিনাইদহ জেলার ঝিনাইদহ সদর, মানিকগঞ্জ জেলার মানিকগঞ্জ সদর, দৌলতপুর, সিংগাইর ও শিবালয়, মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর, মান্দা, ধামৈরহাট ও নওগাঁ জেলার শাপাহার, নীলফামারী জেলার ডোমার, নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ, পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জ, রাজবাড়ী জেলার রাজবাড়ী সদর, পাংশা ও বালিয়াকান্দি, রাজশাহী জেলার বাগমারা, সাতক্ষীরা জেলার সাতক্ষীরা সদর, সিলেট জেলার জকিগঞ্জ ও ওসমানীনগর, নরসিংদী জেলার রায়পুরা এবং মাদারীপুরের কালকিনী।
গতকাল প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধন করা বিদ্যুেকন্দ্র দুটি হলো কনফিডেন্স পাওয়ার বগুড়া-১ লিমিটেডের ১১০ মেগাওয়াট বিদ্যুেকন্দ্র এবং নোয়াখালীর এইচএফ পাওয়ার লিমিটেডের ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুেকন্দ্র।
বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ তার মন্ত্রণালয়ের কার্যালয় থেকে অনুষ্ঠানে যোগ দেন। বিদ্যুত্ বিভাগের সচিব ড. সুলতান আহমেদ বিদ্যুত্ মন্ত্রণালয় থেকে ‘বাংলাদেশে বিদ্যুত্ খাত :বঙ্গবন্ধু থেকে বঙ্গবন্ধুকন্যা’ শীর্ষক একটি তথ্যচিত্র উপস্থাপন করেন। অনুষ্ঠানে গণভবন প্রান্তে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিমসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
