g মা হ বু ব আ ল ম
তখন ১৯৭১ সাল। দিনের হিসেবে ১৫ ডিসেম্বর রাত। রাত পোহালেই বাংলাদেশের কাছে মাথা নুইয়ে পায়ের কাছে অস্ত্র রেখে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে পাকিস্তান সৈন্যদের। তাদের দোসরদের কী হবে তখন? কেউই জানে না সেই কথা। ১৬ ডিসেম্বরের আগ পর্যন্ত পাকিস্তানের সৈন্য ও দোসররা বাঙালিদের ওপরে যে ধরনের অত্যাচার-নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়েছে তারই এক চিলতে উঠে এসেছে ফরিদ কামিল রচিত ‘দি ইন্টারোগেশন’ অবলম্বনে তারিক আনাম খানের রূপান্তরিত নাটক ‘জেরা’তে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের প্রযোজনা ‘জেরা’ নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন বিভাগের অন্যতম নন্দিত শিক্ষক, নির্দেশক ইউসুফ হাসান অর্ক।
এক মাঝ বয়সী নারীকে ধরে নিয়ে আসা হয় ইন্টারেগেশন সেলে। জেরা করা হয় সারারাত। তার কাছ থেকে তথ্য উদ্ধারের দায়িত্ব পরে পাকিস্তানিদের নিযোগকৃত শান্তি কমিটির এক দালালের ওপরে। নানাভাবে তার কাছ থেকে উদ্ধারের চেষ্টা করা হয় কিছু তথ্য। তার ঘরের খাটের নিচ থেকে পাওয়া গেছে দুটি তাজা বোমা। বোমাদুটি কোথা থেকে এলো? শুধু এই একটি প্রশ্নের কোনো জবাব পাওয়া যায় না নারীটির কাছ থেকে। তার দুই ছেলে রফিক ও সেলিম মোটর গ্যারেজে কাজ করে। স্বামী মৃত। খুব স্বভাবতই ছেলেরা ছাড়া তার ঘরের মধ্যে কেউ বোমা রাখতে আসবে না। কিন্তু তার একটাই উত্তর—জানি না। জেরা করতে করতে লোকটি ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে আর নারীটি হতে থাকে অসহায়। কোনো নির্ভরযোগ্য বা সন্তোষজনক উত্তর সে দিতে পারে না। একসময় নারীটি চিত্কার করে সৃষ্টিকর্তার কাছে হাত তুলে সাহায্য প্রার্থনা করে। ঠিক সেই মুহূর্তে লোকটি নির্দেশ দেয় যে—হাত দুটো যেন অনড় অবস্থায় উপরেই থাকে। নড়লেই তার সন্তানদের মেরে ফেলা হবে। দুই হাতে দুই ছেলের ভাগ্য। দীর্ঘক্ষণ নানা ছলে হাত নাড়ানোর চেষ্টা করা হলেও নারীটি তার সন্তানদের জীবনের কথা ভেবে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। হাত নড়ে না, কাঁপে না চোখের পাতাও। সকাল হয়ে যায়। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল। পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণের দিন। ছেড়ে দিতে হবে নারীটিকে। বিপদে পড়ে যায় লোকটি। বেছে নেওয়ার জন্য ভাবতে থাকে নানা কৌশল।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজনে ‘মুক্তির সংগ্রাম নাট্যোত্সব ২০১৭’-তে অংশগ্রহণ উপলক্ষে জেরা নাটকটি মঞ্চে আনেন নির্দেশক ইউসুফ হাসান অর্ক। অবশ্য বিভাগীয় প্রযোজনাগুলোর মধ্যে শুধুই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আবর্তিত কোনো নাটক না থাকাও একটি কারণ। কারণ যাই হোক, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় প্রযোজনাগুলোতে সাধারণত ডিজাইনে আধিক্য লক্ষ করা যায়, কারণ হিসেবে অভিনয়শিল্পীদের দক্ষতার সীমাবদ্ধতাও উল্লেখ করা যায় কিন্তু ‘জেরা’ নাটকটি একেবারেই ব্যতিক্রম। নাটকের মাত্র দুটি চরিত্রে অসাধারণ সাবলীল অভিনয় করেছেন বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী হাবিব মাসুদ ও রুবাইয়া জাবিন প্রিয়তা। দুজনের অভিনয় দক্ষতা নাটকের মোহময় করে রাখে দর্শককে।
রূপান্তর নাটকও যে মৌলিকত্বের মাত্রায় পৌঁছাতে পারে সেটা জেরা নাটকের লিখনীতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সত্যিই দারুন। একবারের জন্যেও মনে হয় না বিদেশি একটি নাটকের মঞ্চয়ন চলছে। দারুণ এক প্রেক্ষাপটে ফেলেছেন তারিক আনাম খান।
আবার মঞ্চ আলো ও নির্দেশনার ক্ষেত্রে নির্দেশক ইউসুফ হাসান অর্কের একটি স্বাক্ষর থাকে; তা হলো সরল, সাধারণ ও সাবলীল। উপস্থাপনার সরলতাই যেন তার স্বাক্ষর। সঙ্গে তৌকীর আহমেদের সাধারণ মঞ্চ সজ্জাও অসাধারণ হয়ে ওঠে তার ব্যবহারে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এমন গল্প সবার কল্পনাতেই যেমন আছে, তেমনি এর ছবিটাও সবার চোখে আছে স্থিরচিত্রের মতো। নির্দেশক শুধু নস্টালজিক করে তুললেন সবাইকে, আর অভিনেতারা তাদের অভিনয়শৈলীতে প্রাণবন্ত করে তুললেন পুরো ঘটনা। নিপুণ অভিনয়শৈলীর উপস্থাপন মনে হলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ‘জেরা’ নাটকটিকে।
