আহমেদ সাঈদ বুলবুল
নড়াইলের জামাই ‘বাঙালি বাবু’ প্রণব মুখার্জি প্রকৃতির নিয়মেই চলে গেলেন। ইতিহাস হয়ে রেখে গেলেন ভারতবর্ষের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতির বিরল সম্মান। বিশ্বে ভারতের মতো উল্লেখযোগ্য ও জনবহুল রাষ্ট্রে প্রণব মুখার্জি দুই দফা করে অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পর রাষ্ট্রপতি ভবনের বাসিন্দা হওয়ার নেপথ্য নায়িকার ভূমিকায় বারবার শুভ্রার নাম উচ্চারণ করেছে সেখানকার গণমাধ্যম। গণমাধ্যমে এ কথা উঠে এসেছে যে, ‘বাঙালি বাবু’ প্রণব মুখার্জির ভারতের রাষ্ট্রপতি হওয়ার পেছনে ছিল শুভ্রা-ম্যাজিক। তবে রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ ঘরের ছেলে হয়ে (অব্রাহ্মণ) শুভ্রার সঙ্গে অসবর্ণ বিয়েটা প্রণব-পরিবারের আপত্তির মুখেই হয়েছিল। তবে প্রথা ভেঙে শুভ্রাকে জীবনসঙ্গী করে তিনি যে মোটেও ভুল করেননি, সেটা শুভ্রা জীবনের বাঁকে বাঁকে বহমান নদীর মতোই বুঝিয়ে দিয়েছেন।
একে তো বাঙালি রাষ্ট্রপতি, তার সঙ্গে নড়াইলের ‘জামাই’ ভারতের রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে উচ্ছ্বাসটা একটু বেশি মাত্রায় আছড়ে পড়ে। আর সে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল নড়াইলের ভদ্রবিলা গ্রামের শুভ্রাকে ঘিরে। প্রায় ৫৮ বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটিয়ে ২০১৫ সালে শুভ্রা মুখার্জি চলে যান না-ফেরার দেশে। এরই মধ্যে রাষ্ট্রপতি হওয়ার এক বছরের মাথায় ২০১৩ সালের ৫ মার্চ ‘জামাইবাবু’ প্রথমবারের মতো পা রাখেন ‘শ্বশুরবাড়ি’। ৫৬টি বছরের দাম্পত্য জীবন পার করে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রপতি হয়ে শ্বশুরালয়ে আসার খবরে সে সময় মিডিয়া জগতে হইচই পড়ে যায়। এ যেন সত্যিই এক অভাবিত ঘটনা। ভদ্রবিলা গ্রামে সেদিন শ্বশুরবাড়ির পরিবারের সদস্যরা রীতিমতো সনাতন ধর্মীয় আচার অনুযায়ী ‘জামাই বরণ’ করে নেন।
ভদ্রবিলা গ্রামটি সুনসান শহর নড়াইলের ৮ কিলোমিটার দূরে। একসময় বৃহত্তর যশোরের মহকুমা শহরটির গায়ে আজ আভিজাত্যের জেলা শহরের তকমা। চিত্রাপারের এই গ্রাম যেন নিজের হাতে সাজিয়েছে নিজেকে। অপরূপ নিসর্গের মাতামাতি যে-কাউকে মুগ্ধ করবে মুহূর্তেই। সেই গ্রামের জমিদার অমরেন্দ্র ঘোষের মেয়ে শুভ্রা ঘোষের জন্ম ১৯৪৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। তার মা মীরা রানী ঘোষ। অমরেন্দ্র ঘোষের দুই স্ত্রীর ঘরে চার ছেলে ও চার মেয়ে। একে একে সবাই ভারতে চলে গেলে গ্রামে একা রয়ে যান কানাইলাল ঘোষ।
তুলারামপুরে বসবাসকারী শুভ্রার মামাতো দাদা কার্তিক ঘোষ জানান, শুভ্রার জন্ম পৈতৃক বাড়িতে নয়। নড়াইলেরই তুলারামপুর ইউনিয়নের চাঁচড়া গ্রামের মাতুলালয়ে দাদু সিতেনাথ সিংহ ও দিদিমা কুসুমকুমারীর বাড়িতে জন্ম শুভ্রার। চাঁচড়া প্রাইমারি স্কুলে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। এরপর বাবা ১৯৫৫ সালে তাকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেন লেখাপড়ার জন্য। ১৯৫৭ সালের ১৩ জুলাই জুটি বাঁধেন শুভ্রা-প্রণব। শুরু থেকেই ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর স্নেহধন্য ছিলেন প্রণব। ইন্দিরা গান্ধীই প্রণবের নবপরিণীতার নাম দেন শুভ্রা মুখার্জি।
শুভ্রা মুখার্জির ছোটবেলার গ্রাম ভদ্রবিলায় তিন একর জমি জুড়ে রয়েছে আম, জাম, লিচু, কতবেল গাছ। এক কোণে একটা পুকুর। বাড়ির চারপাশ পৈতৃক ভিটেয় স্বজন বলতে রয়েছেন তার ছোট ভাই কানাইলাল ঘোষ ও তার স্ত্রী দুলালী ঘোষ, তাদের ছেলে প্রশান্ত ঘোষ ও ছেলেবউ অর্চনা ঘোষ। কার্তিক ঘোষ মাটির সঙ্গে মিশে থাকা জমিদারবাড়ির চিহ্ন দেখিয়ে বললেন, একাত্তরে রাজাকাররা এগুলো ধ্বংস করেছে। বাড়ির এক কোণে পারিবারিক মন্দিরটি আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এটাও একাত্তরে আক্রমণের শিকার হলেও ততটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। পরে সংস্কার করা হয়। নিয়মিত সেখানে রাধাকৃষ্ণের পূজা হয়। শুভ্রার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী দুলালী ঘোষ জানান, ননদের বাড়িতে গিয়ে মাঝেমধ্যে দেখা করতাম। তবে জামাইবাবুর দেখা সচরাচর পেতাম না। দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, ‘১৯৯৫ সালে দিদি এখানে এসেছিলেন। তখন অনেক রান্না করেছিলাম। নারকেলের নাড়ু বানিয়েছিলাম। কিন্তু দিদি তা খাননি। বলেছিলাম, খেতে দেব? দিদি বললেন, সময় নেই। তবে ভালো লাগে তিনি আমাদের দামি কাপড়চোপড় দিতেন। খোঁজখবর রাখতেন। মেয়ের বিয়ের সময়ও টাকা, গহনা আর শাড়িকাপড় দিয়েছিলেন।’
কার্তিক ঘোষ জানান, গ্রাম ছাড়ার ৪০ বছর পর বাংলাদেশে আসেন তাদের দিদি। চিত্রা নদী দিয়ে স্পিডবোটে তিনি ভদ্রবিলায় আসেন। পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে তাকে বরণ করা হয়। কিন্তু সময় না থাকায় আর সেদিন প্রচণ্ড বৃষ্টির কারণে তিনি বাড়িতে বেশি সময় বসেননি। তবে তাকে একনজর দেখার জন্য সেদিন গাঁয়ের লোকেরা হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল।
n লেখক: সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী
