করোনায় বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে ব্যাংকিং সুবিধা এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলেও উদ্যোক্তারা ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে প্রত্যাশিত সেবা পাচ্ছেন না। তদুপরি, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সুদ আদায় করে থাকে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো। বিভিন্ন সময়ে অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রীসহ নীতিনির্ধারকদের অনেকেই ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ হারকে শিল্প বিকাশের অন্যতম বাধা হিসেবে আখ্যা দিয়ে আসছিলেন। সর্বশেষ, সিঙ্গেল ডিজিট সুদ হার কার্যকরের উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলেও কোনো কোনো ব্যাংক এখনো তা মানছে না। সরল সুদ হার বাস্তবায়নের বিষয়টি আর আলোচনায়ও থাকছে না। যদিও এই মুহূর্তে সরল সুদ হার বাস্তবায়ন জরুরি বলে দাবি করেছেন উদ্যোক্তা, বিশ্লেষকসহ সংশ্লিষ্ট মহল।
তাদের মতে, ব্যাংক ঋণে সুদের হার গণনায় সরল হিসাব চালুর (সিম্পল রেট) বিষয়টি ঝুলে গেছে। ২০১৯ সালের মে মাস থেকেই এটি কার্যকর করা হবে বলে জানানো হয়েছিল। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালও সরল সুদ হার বাস্তবায়নের পক্ষে জোরালো অবস্থানে রয়েছেন। ব্যাংকারদের অনেকে একমত যে, সরল সুদ চালু করা যৌক্তিক। সরল সুদ প্রথা চালু না হওয়ায় উদ্যোক্তাদের ওপর বোঝা বাড়ছে, যা অন্যায্য। বিশেষত : করোনা আক্রান্ত অর্থনীতির এই সময়ে যত বেশি সাশ্রয়ী পুঁজির জোগান দেওয়া যায়, ততই অর্থনীতির জন্য মঙ্গল। কিন্তু বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত সুদ হার এবং দণ্ডসুদ প্রথার কারণে উদ্যোক্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। চক্রবৃদ্ধির এই সুদ হার সেই যুগের কাবুলিওয়ালাকেও হার মানিয়েছে। চক্রবৃদ্ধির খপ্পর থেকে কবে বাঁচবেন এদেশের উদ্যোক্তারা—এ প্রশ্নও করেছেন তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সরল সুদ চালু হলে ব্যাংক-উদ্যোক্তা উভয়েরই লাভ। তাতে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ যেমন কমে যেত, তেমনি বাড়তি সুদের বোঝা বইতে হতো না উদ্যোক্তাদের। এখন সুদের ওপর সুদ-দণ্ডসুদ আরোপের ফলে উদ্যোক্তার অবস্থা ত্রাহি। করোনা আসার আগে থেকেই উদ্যোক্তারা এই ‘সুদচক্রে’র ঘানি টানতে দিশেহারা। তার মধ্যে করোনাপূর্ব সময়ে জ্বালানি সংকট চলে আসছিল। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় কলকারখানা সক্ষমতা অনুযায়ী চালু রাখার কাজটিও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় করোনার কারণে কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে।
করোনার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে সরকার ১ লাখ কোটি টাকার বেশি অর্থের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও সব উদ্যোক্তা সুবিধা পাচ্ছেন না। বড়রা এতে লাভবান হচ্ছেন। ক্ষুদ্র, মাঝারিদের প্রাধান্য নেই প্রণোদনায়। প্রণোদনার বিপরীতে প্রাপ্ত সুবিধাগুলো নিয়ে ব্যাংক সুসংহত হয়েছে। প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ বিতরণে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনা দিয়েই যাচ্ছে। কিন্তু ক্ষুদ্র, মাঝারি উদ্যোক্তারা এখনো আশায় বুক বেঁধে আছেন।
উদ্যোক্তাদের অনেকেই বলেছেন, প্রণোদনা প্যাকেজের সুবিধা সবাইকে দেওয়া না গেলেও যদি সরল সুদ বাস্তবায়ন করা যায়, তাতেই উদোক্তাদের কষ্টের ভার কিছুটা লাঘব হবে। প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে সরল সুদ হার বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে হলে পুঁজির প্রবাহ বাড়াতে হবে। সরল সুদ চালু ও সিঙ্গেল ডিজিট সুদ হার নিশ্চিত করতে পারলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে। উচ্চ সুদ হার এবং দণ্ডসুদ উদ্যোক্তাকে স্থায়ীভাবে ‘রুগ্ণ’ করার পন্থা।
তিনি বলেন, ২০২৩ সালের মধ্যে বর্তমান সরকারের কর্মসৃজনের যে লক্ষ্য ধরা হয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে হলে উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সেক্ষেত্রে সরল সুদ ও সিঙ্গেল ডিজিট সুদ হার সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
এদিকে, এখনো কোনো কোনো ব্যাংক সিঙ্গেল ডিজিট সুদ হার বাস্তবায়ন করেনি। কিস্তি খেলাপিদের আড়াই থেকে তিন শতাংশ জরিমানা ধার্য করা হচ্ছে। করোনাকালীন সময়ে কিস্তি পরিশোধের সময় বাড়ানো হলেও কিস্তি পরিশোধ না করলে ঠিকই জরিমানা দিতে হচ্ছে গ্রাহকদের। এই জরিমানা আরোপের ফলে গ্রাহকের ওপর চাপ আরো বাড়ছে। প্রকারান্তরে কার্যকর সুদ হার অনেক বেড়ে যাচ্ছে যা শিল্প বিকাশের অন্তরায়।
