প্রণব মুখার্জি :ছোট চেহারার বড় মানুষ

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:৫৯

১ সেপ্টেম্বর দুপুরে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়। আগের দিন সন্ধ্যায় দিল্লির সেনা হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এর আগে গত ৯ আগস্ট দিল্লিতে নিজের বাসভবনে বাথরুমে পড়ে গিয়ে তিনি মাথায় আঘাত পান। পরের দিনই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার মাথায় রক্ত জমাট বাঁধায় অপারেশন করতে হয়। চিকিত্সাধীন থাকার সময়ই তার কোভিট পজিটিভ রিপোর্ট পাওয়া যায়। প্রাথমিকভাবে চিকিত্সায় সামান্য সাড়া দিলেও তিনি ধীরে ধীরে কোমায় চলে যান। চিকিত্সকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি ৩১ আগস্ট সন্ধ্যায় জীবনযুদ্ধে পরাজয় বরণ করেন। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতির এক বিশেষ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। তিনিই প্রথম বাঙালি, যিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

প্রণব মুখার্জির মৃত্যুতে ভারতের বিজেপি সরকার সাত দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে পরিচিত বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী এই নেতার প্রয়াণে বাংলাদেশও ২ সেপ্টেম্বর এক দিনের শোক পালন করে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে। পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনে তিনি প্রায় পুরোটা সময় ভারতের সর্বপ্রাচীন রাজনৈতিক দল জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও অন্য সব দলে তার জন্য শ্রদ্ধা, গ্রহণযোগ্যতা ও ব্যক্তিগত হূদ্যতা ছিল তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম সম্পদ। তার মৃত্যুতে তাই ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ শাসক এবং বিরোধী সব রাজনৈতিক দলের নেতার পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।

বলা হচ্ছে, ভারতের জাতীয় জীবনের সবখানেই তার আসন পাতা ছিল। রাজনীতি থেকে সাহিত্য-সংস্কৃতি, কূটনীতি থেকে চণ্ডীপাঠ—সবকিছুতেই তার স্বচ্ছন্দ বিচরণ ছিল। তার বোধ-বুদ্ধি-প্রজ্ঞার প্রশংসা করা হচ্ছে সব মহল থেকেই। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছেন, ‘২০১৪ সালে আমি দিল্লিতে নতুন এসেছিলাম। প্রথম দিন থেকেই তার পরামর্শ, সাহায্য ও আশীর্বাদ পেয়েছি। তার সঙ্গে আলাপচারিতা চিরকাল মনে থাকবে। কয়েক দশকের রাজনৈতিক জীবনে প্রণব মুখোপাধ্যায় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কৌশলগত ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে গিয়েছেন। তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে ছিলেন দুর্দান্ত। সব সময় প্রস্তুতি নিয়ে রাখতেন। তিনি যেমন সুবক্তা ছিলেন, তেমনি ছিল তার রসবোধ।’ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘তিনি ছিলেন প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি। বঙ্গবাসী ও বঙ্গভাষী হিসেবে আমরা সবাই গর্ববোধ করি। প্রণবদা ছিলেন রাজনীতির রত্ন। তার মতো রাজনীতি অন্তঃপ্রাণ মানুষের জন্য এটাই বোধ হয় বড় শিরোপা।’ ক্যারিশম্যাটিক রাজনৈতিক নেতা বলতে যা বোঝায়, প্রণব মুখার্জি তা ছিলেন না। তার আহ্বানে লাখো মানুষের জমায়েতও হয়তো হতো না। খুব জনভিত্তি ছিল না, ছিল না সেরকম কোনো পারিবারিক গরিমা, তবু রূপকথার চেয়ে কম ছিল না তার রাজনীতির যাত্রাপথ। তিনি অতি সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে উঠেছেন নিজের চেষ্টায়।

প্রণব মুখার্জির জন্ম ১৯৩৫ সালের ১১ ডিসেম্বর বীরভূম জেলার কীর্ণাহারের কাছে কিরিটি গ্রামে। তার বাবা স্বাধীনতা সংগ্রামী কামদাকিঙ্কর মুখোপাধ্যায়। তিনি কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পরিষদের সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে ছাত্রজীবনে প্রণব বাবুর রাজনীতির প্রতি কোনো আগ্রহ ছিল বলে শোনা যায় না। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেছেন গ্রামের এমন এক স্কুলে, যেখানে তাকে গামছা পরে নদী পার হয়ে যেতে হতো। সিউড়ি বিদ্যাসাগর কলেজের পাঠ চুকিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসে এমএ করে তিনি এলএলবিও পাশ করেন। তবে আইন পেশায় তিনি কখনো নিয়োজিত হননি। শিক্ষা শেষে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন পোস্ট অ্যান্ড টেলিগ্রাফে আপার ডিভিশন ক্লার্ক হিসেবে। তারপর শিক্ষকতা করেছেন প্রথমে হাওড়া জেলার বাঁকড়া ইসলামিয়া হাইস্কুলে এবং পরে বিদ্যাসাগর কলেজে। কলেজে শিক্ষতার সময়ই তিনি রাজনীতিতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ১৯৬৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায়ের বাংলা কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে তার রাজনীতিতে হাতেখড়ি। এর আগেই তিনি ১৯৫৭ সালের ১৩ জুলাই নড়াইলের মেয়ে শুভ্রা দেবীকে বিয়ে করেন। ১৯৬০ সালের ২ জানুয়ারি পুত্র অভিজিত্ এবং ১৯৬৫ সালের ৩০ অক্টোবর কন্যা শর্মিষ্ঠার জন্ম। তাই বলা যায়, সংসারজীবনে থিতু হয়েই তিনি রাজনীতির ময়দানে পা রাখেন। কংগ্রেস সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নজরে আসেন তিনি ১৯৬৯ সালে। ইন্দিরা গান্ধীর ছিল প্রকৃত জহুরির চোখ। তাই রাজনীতিতে তুলনামূলক নবাগত প্রণব মুখার্জির মধ্যে তিনি ভবিষ্যতের অমিত সম্ভাবনা লক্ষ করেই তাকে কাছে টেনেছিলেন। প্রণব মুখার্জির মধ্যে বারুদ ছিল, সে জন্য জ্বলে উঠতে সমস্যা হয়নি। ১৯৬৯ সালেই তিনি কংগ্রেসের টিকিটে রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হন। তারপর ১৯৭৫, ১৯৮১, ১৯৯৩ এবং ১৯৯৯ সালেও রাজ্যসভায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে লোকসভার সদস্য হওয়ার জন্য তাকে আরো কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ২০০৪ সালে  জঙ্গিপুর  থেকে তিনি জয়লাভ করে প্রথমবারের মতো লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু ততদিনে তিনি ভারতীয় রাজনীতির এক অপরিহার্য চরিত্রে পরিণত হয়েছেন।

ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৩ সালে তাকে প্রথম কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করেন শিল্পোন্নয়ন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়ে। পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও ব্যক্তিত্বের কারণে তিনি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিশ্বস্ততা অর্জন করেছিলেন। অনেক ক্ষেত্রে ইন্ধিরা গান্ধী তার ওপর নির্ভর করতেন। জরুরি অবস্থা জারির পর ইন্ধিরা গান্ধী সমালোচিত হয়েছেন, ১৯৭৭ সালে নির্বাচনে পরাজিতও হয়েছেন। তখন কংগ্রেস নেতৃত্বের কেউ কেউ সুবিধাবাদী অবস্থান নিলেও প্রণব মুখার্জি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবেই ইন্দিরার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ১৯৮২ সালে কংগ্রেস আবার ক্ষমতায় ফিরলে ইন্দিরা মন্ত্রিসভায় অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন প্রণব মুখার্জি। তিনি তার কর্মদক্ষতার কারণে মন্ত্রিসভায় দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন।

১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর রাজীব গান্ধীর মন্ত্রিসভায় প্রণব মুখার্জির ঠাঁই না হওয়ায় তিনি কংগ্রেস ছেড়ে রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেস নামে একটি দল গঠন করলেও খুব সুবিধা করতে পারেননি। ১৯৮৯ সালে আবার কংগ্রেসে ফিরে আসেন। ১৯৯১ সালে রাজীব গান্ধীর মৃত্যুর পর রাজনীতিতে প্রণব মুখার্জির পুনরুত্থান ঘটে। নরসিংহ রাওয়ের মন্ত্রিসভায়ও তিনি অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৮ সালে সীতারাম কেশরীকে সরিয়ে সোনিয়া গান্ধীকে কংগ্রেসের সভানেত্রী করার ক্ষেত্রে প্রণব বাবু মুখ্য কারিগরের ভূমিকা পালন করেন। ২০০৪ সালে ইউপিএ সরকার গঠনের পর থেকে পরবর্তী মনমোহন সিংয়ের সরকারে প্রণব মুখার্জি কখনো প্রতিরক্ষামন্ত্রী, কখনো পররাষ্ট্রমন্ত্রী, কখনোবা অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। মনোমোহন সিংয়ের মন্ত্রিসভায়ও তিনি কার্যত দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতেই পরিণত হয়েছিলেন। তবে তার মতো নির্ভরযোগ্য একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে প্রধানমন্ত্রী না করে রাজনীতিতে কম অভিজ্ঞ মনোমোহন সিংকে প্রধানমন্ত্রীর পদে বসিয়ে কংগ্রেস হাইকমান্ড ঠিক কাজ করেছিল কি না, সে প্রশ্ন আছে। অনেকে এটা মনে করেন যে প্রণব মুখার্জিকে প্রধানমন্ত্রী করা হলে কংগ্রেসের জন্যই সেটা ভালো হতো।

২০১২ সালে তাকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে সম্মানিত করা হলেও এতে প্রণব মুখার্জি খুব খুশি হয়েছিলেন বলে মনে হয় না। তিনি সরাসরি সক্রিয় রাজনীতির মানুষ। কর্মক্ষম থাকা অবস্থায় তাকে রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিতে হয়। এতে রাষ্ট্রপতি পদের মর্যাদা বাড়লেও কংগ্রেসের রাজনীতির জন্য ক্ষতিকর হয়েছে বলেই মনে করা হয়।  ২০১৫ সালের ১৮ আগস্ট তার পত্নীবিয়োগ ঘটে।  ২০১৭ সালের ২৫ জুলাই তিনি রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ২০১৯ সালে তিনি ভারতরত্ন উপাধিতে ভূষিত হন। এর আগে পদ্মবিভূষণ উপাধিও পেয়েছিলেন।

প্রণব মুখার্জিকে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু মনে করা হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার জন্য প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে বিশেষ সম্মাননা দিয়েছে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যার পর তার দুই কন্যা দিল্লিতে আশ্রয় নিলে প্রণব মুখার্জির সঙ্গে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার হার্দিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। শেখ হাসিনা তাকে অভিভাবকের মতোই মনে করতেন। প্রণব মুখার্জি প্রথমে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে এবং পরে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশ সফর করেন। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উন্নয়নে তার ছিল আন্তরিক প্রয়াস। বাংলাদেশের অনেক মানুষের সঙ্গেই তার ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল।

প্রণব মুখার্জি ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে মানুষ। ভারতের মতো বিশাল দেশের সর্বোচ্চ পদাধিকারী হওয়ার পরও তিনি অতি সাধারণ জীবন যাপন করতেন। তিনি মনে-প্রাণে ছিলেন একজন খাঁটি বাঙালি। পোশাক-আশাকেও তিনি ছিলেন সাধারণ। তিনি সব সময় বিতর্ক-বিসংবাদের ঊর্ধ্বে থাকার চেষ্টা করতেন। সব ক্ষেত্রেই একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলতেন। ছোটখাটো চেহারার প্রণব মুখার্জি  ছিলেন কার্যত অনেক বড় মাপের একজন অসাধারণ মানুষ। তার চলে যাওয়ায় ভারতের অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বড় শূন্যতার সৃষ্টি হলো। শুধু বাঙালি নয়, সমগ্র ভারতবাসীর কাছেই তিনি তার কাজের জন্য চিরজীবী হয়ে থাকবেন।

n লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক