সরকারি বাসভবনে দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানম। গত বুধবার গভীর রাতে উপজেলা কমপ্লেক্সের ভেতরে অবস্থিত ওয়াহিদা খানমের বাসায় ঢুকে দুর্বৃত্তরা তাকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত জখম করে। এ সময় তার বাবাকেও দুর্বৃত্তরা হাতুড়ির আঘাতে জখম করে। তাদেরকে গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে ঘোড়াঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও পরে বৃহস্পতিবার সকালে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে ওয়াহিদা খানমকে বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারযোগে এনে ঢাকার নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গতকাল সন্ধ্যায় তার জ্ঞান ফিরে আসে। রাতে তার মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করা হয়।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিউরো সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. রাজিউল হক ও নিউরো সায়েন্স হাসপাতালের নিউরো সার্জন অধ্যাপক ডা. জাহিদ হোসেনের নেতৃত্বে ছয় জনের টিম রাত সাড়ে ৯ টায় অপারেশন শুরু করেন। দেড় ঘন্টা ধরে অপারেশন চলে। অধ্যাপক ডা. রাজিউল হক জানিয়েছেন, অপারেশন সফল হয়েছে। ওয়াহিদা খানম শংকামুক্ত বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। হাসপাতালের যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম জানিয়েছেন, তাকে ৭২ ঘন্টার জন্য নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
সংসদ সদস্য শিবলী সাদিক ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে বলেন, ডাকাতি নয়, হত্যার উদ্দেশ্যে এ হামলা চালানো হয়েছে। ঘোড়াঘাট থানার ওসি আমিরুল ইসলাম বলেন, পূর্বশত্রুতার জেরে এ হামলা হতে পারে। তবে দোষীকে খোঁজা হচ্ছে।
এই ঘটনায় ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ভাই ফরিদ শেখ বাদী হয়ে ঘোড়াঘাট থানায় মামলা দায়ের করেছেন। হামলায় জড়িত সন্দেহে গতকাল রাত সোয়া দশটার দিকে উপজেলার রানিগঞ্জ বাজার এলাকা থেকে সাদা পোশাকের একদল পুলিশ মাসুদ (২৫) নামের স্থানীয় এক যুবলীগ নেতাকে আটক করেছে। সে একই উপজেলার দক্ষিণ দেবিপুর গ্রামের আদু মিয়ার ছেলে।
ঘোড়াঘাট ইউএনওর ওপর হামলার ঘটনার পরপরই দেশের সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ও বাসভবনের নিরাপত্তা জোরদারের জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ডা. কনককান্তি বড়ুয়াকেও আহত ইউএনওকে দেখভালের বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কনককান্তি বড়ুয়া রাতে অপারেশনের আগে ওয়াহিদা খানমকে দেখতে হাসপাতালে যান। এ সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, তার অবস্থা কিছুটা উন্নতির দিকে। তিনি কথা বলছেন। মাথায় আঘাতের কারণে ডান হাত ও ডান পা প্যারালাইজড হয়ে গেছে। তবে তার মাথার রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়েছে।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমেদ কায়কাউস, বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. হেলালুদ্দীন আহমেদ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মো. ইউসুফ হারুন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া হাসপাতালে ইউএনওকে দেখতে যান। পরে প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। মো. হেলালুদ্দীন আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, অ্যাসোসিয়েশন এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও দোষীদের গ্রেফতারের দাবি জানাচ্ছে। আজ শুক্রবার রাত ৯টায় অ্যাসোসিয়েশনের জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে। সেখানে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ থেকে ইতিমধ্যে সব ইউএনওর বাসভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইজিপিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আগামী সপ্তাহ থেকে এ নির্দেশনা কার্যকর হবে বলে আশা করেন তিনি।
এদিকে দিনাজপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য শিবলী সাদিক, জেলা প্রশাসক মাহমুদুল আলম, পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন এবং র্যাব, সিআইডি ও ডিবির প্রতিনিধিদল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে দুই জনকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে বলে ডিসি জানিয়েছেন।
ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) জাকির হোসেনকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন রংপুর বিভাগীয় কমিশনার। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন রংপুর ডিআইজির একজন প্রতিনিধি ও দিনাজপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আসিফ মাহমুদ।
যেভাবে হামলার ঘটনা ঘটে : বুধবার রাত আড়াইটা থেকে ৩টার মধ্যে এক থেকে দুই জন ইউএনওর সরকারি বাসভবনের ২য় তলার বাথরুমের ভেন্টিলেটর দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। তারা ওয়াহিদা খানমের শয়নকক্ষে ঢুকে হাতুড়ি দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি আঘাত করে। এক পর্যায়ে পাশের কক্ষে অবস্থানরত তার বাবা ওমর আলী শেখ তাহাজ্জদের নামাজ পড়তে ওঠেন। এ সময় এ দৃশ্য দেখে মেয়েকে উদ্ধারে এগিয়ে আসেন। দুর্বৃত্তরা তখন তাকেও হাতুড়ি দিয়ে মাথায় আঘাত করে। তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। হাতুড়ির আঘাতে ওয়াহিদা খানম রক্তাক্ত জখম হন ও জ্ঞান হারান। এ সময়ে পাশে থাকা তার তিন বছরের শিশুপুত্রের চিত্কার শুনে বাড়ির নাইটগার্ড তার ঘর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় ঘরের দরজা বাইরে থেকে তালা দেওয়া ছিল। এরপর তার চিত্কারে পাশের ভবনে অবস্থানরত বিভিন্ন অফিসের লোকজন এসে ওয়াহিদা খানম ও তার বাবাকে উদ্ধার করে প্রথমে ঘোড়াঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।
