ফের মুখোমুখি আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:০৪

এম এ আলআমিন

 

ফের মুখোমুখি অবস্থানে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান। তবে এবারের লড়াইয়ের ইস্যু নগর্নো কারাবাখ ছিটমহল নয়। ছিটমহলটি নিয়ে সাবেক এই দুই সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।

জুলাই মাসের ১২ থেকে ১৬ তারিখ আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে যে খণ্ড যুদ্ধ হয় তাতে উভয় পক্ষের ১৬ জন নিহত হয়। নিহতদের ১২ জন আজারবাইজানের, ৪ জন আর্মেনিয়ার সৈন্য। জনা কয়েক আহত হয়েছে। নিহতদের একজন আজারবাইজানের মেজর জেনারেল পর্যায়ের সেনা কর্মকর্তা। সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর দুদেশের সম্পর্ক যে এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি সর্বশেষ সংঘর্ষের ঘটনা তারই প্রমাণ। এবার নগর্নো কারবাখ নিয়ে এই লড়াই হয়নি। দুই দেশ ইতিপূর্বে বিষয়টি নিয়ে সময় সময় সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। গত মাসে ঘটনাটি উত্তরে জর্জিয়া সীমান্তের কাছে ঘটে। সেখানে উভয় দেশেরই প্রচুর বেসামরিক স্থাপনা রয়েছে। ঘটনার পর দুই দেশ ঐ এলাকায় নজরদারি বাড়াতে ড্রোন মোতায়েন করেছে। এবারের সংঘাতের উল্লেখযোগ্য দিক আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে সরকার বিরোধী বিক্ষোভ। বিক্ষোভকারীরা লড়াইয়ে অংশ নেওয়া নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি সংহতি প্রকাশ করে সরকারের পরিকল্পনাহীনতার সমালোচনা করে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, এই জন অসন্তোষের জেরেই দেশটির প্রথম দুই প্রেসিডেন্ট ৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে পদত্যাগে বাধ্য হন।

আর্মেনিয়া আজারবাইজান দ্বন্দ্বের কথা এলে অনিবার্যভাবেই আসে নগর্নো কারাবাখের নাম। এ নিয়ে কিছু প্রাসঙ্গিক কথা এখানে বলা যাক। নগর্নো কারাবাখ ককেশাস পর্বতের দক্ষিণে অবস্থিত একটি বিস্তৃত উচ্চভূমি। ছিটমহলটির বাসিন্দাদের শতকরা ৯০ ভাগ জাতিগত আর্মেনীয়। ১৯২৩ সালে তত্কালীন সোভিয়েত শাসক জোসেফ স্ট্যালিন একে আর্মেনিয়ার নিয়ন্ত্রণ মুক্ত করে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে পরিণত করে আজারবাইজানের সঙ্গে জুড়ে দেন। নাম দেওয়া হয় নগর্নো কারাবাখ অটোনোমাস ওব্লাস্ট (এনকেএও)। আর্মেনিয়ান সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক ইস্যুটি এরপর দীর্ঘ সময় অমীমাংসিত অবস্থায় পড়ে থাকে। সোভিয়েত ইউনিয়ন যুগ অবসানের কিছুকাল আগে ১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারি আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে জাতীয়তাবাদীদের বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। তারা আজারবাইজানের কাছ থেকে কারাবাখকে ফেরত চায়। উল্লেখ্য, আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান তখনো সোভিয়েত ইউনিয়নের দুই প্রজাতন্ত্র। উভয় প্রজাতন্ত্রে জাতিগত আজারি ও আর্মেনীয়দের মধ্যে তখন থেকে উত্তেজনা ছড়াতে শুরু করে। বাকু থেকে বহিষ্কৃত হয় আর্মেনীয় জাতিগতরা।

এনকেএওর স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এর অল্প পরেই আর্মেনিয়ার সঙ্গে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের তখনো তিন বছর বাকি। সোভিয়েত নিরাপত্তা বাহিনী তখন দফায় দফায় আর্মেনিয়ায় দমনাভিযান চালায়। আজারবাইজানের ভেতরও উত্তেজনা বেড়ে চলে। ১৯৯১ সালের শেষের দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মধ্য এশিয়ার অনেক প্রজাতন্ত্রের মতো স্বাধীনতা ঘোষণা করে নগর্নো কারাবাখ। শুরু হয়ে যায় পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ। যুদ্ধের এক পক্ষে থাকে কারাবাখ ও আর্মেনিয়া অন্যদিকে আজারবাইজান। ১৯৯৪ সালে দুই পক্ষের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি হয়। তিন বছরের যুদ্ধে ২০ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়, বাস্তুচ্যুত হয় ১০ লাখের বেশি। যুদ্ধের পর কারাবাখ কার্যত স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা ভোগ করছে, যদিও এই স্বাধীনতা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হয়নি। কারাবাখ এখনো আজারবাইজানের আন্তর্জাতিক সীমানার মধ্যে রয়েছে কিন্তু ছিটমহলটির ওপর বাকুর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০১৫ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে তিন শতাধিক যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৬ সালের এপ্রিলে দুদেশের মধ্যে তথাকথিত চার দিনের যুদ্ধের বিষয়টি এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ঐ যুদ্ধে দুপক্ষ শতাধিক সৈন্য হারায়। ১৯৯৪ সালের পর দুই দেশের মধ্যে এত প্রাণহানির ঘটনা আর ঘটেনি। এসব কিছুর পরও কারাবাখ সমস্যার সমাধান হয়নি। দুদেশের মধ্যে সময় সময় লড়াই মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। কবে এর সমাধান হবে কেউ জানে না।