দিনের পর দিন চিনি নিয়ে ছিনিমিনি করে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া মীর গ্রুপকে থামানোর কেউ নেই। বৃহত্ শিল্পগ্রুপ এস আলম গ্রুপের চিনি কারখানার সব চিনি নিজেদের দখলে নিয়ে চিনি সিন্ডিকেট গড়ে তুলে এই প্রতিষ্ঠান গ্রাহককে বেশি দামে চিনি কিনতে বাধ্য করছে। আড়াই বছর আগে এই প্রতিষ্ঠানকে দুই দফায় জরিমানা ও প্রতিষ্ঠানের পরিচালককে কারাদণ্ড দেয়ার পরও এই অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। কিছুদিন ধরে ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কে ওজন স্কেলের অজুহাত দেখিয়ে আবারো চিনির বাজারে আধিপত্য করছে মীর গ্রুপ।
দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ কেন্দ্রিক ব্যবসা পরিচালনা করা এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অতীতে বিভিন্ন সময়ে নানা অভিযোগ উঠে। ২০১৬ সালের জুনে ছোট পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের চিনির সঙ্গে নিজেদের প্রক্রিয়াকৃত সরিষা তেল কিনতে বাধ্য করার অভিযোগ ২২ লাখ টাকা জরিমানা করেছিল চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। একই অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মীর মোহাম্মদ হোসাইন ও সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইবনাত ট্রেডাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মোহাম্মদ হোসাইনকে এক মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়।
সে সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী তত্কালীন ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিলুর রহমান জানিয়েছিলেন, সাতদিনে চিনির সাথে প্রায় ৫৬ হাজার লিটার সরিষার তেল ব্যবসায়ীদের কিনতে বাধ্য করে মীর গ্রুপ। কিন্তু পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা এ তেল ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করতে না পেরে চিনির অতিরিক্ত দাম রেখে তা পুষিয়ে নিতেন।
একই বছরের ৮ জুন মিল থেকে ৪৬ টাকা কেজিতে কেনা চিনি পাইকারিতে ৫৮ টাকায় বিক্রি করায় মীর গ্রুপের আরেক প্রতিষ্ঠান ‘মীর আহমদ ট্রেডার্স’কে ২০ লাখ টাকা জরিমানা করেছিল ভ্রাম্যমাণ আদালত। সে সময় প্রতিদিন দুই কোটি ৪০ লাখ টাকা অতিরিক্ত মুনাফা করার অভিযোগ প্রমাণিত হয় এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।
এসব জরিমানা ছাড়াও মীর গ্রুপ এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান মীর আহমেদ সওদাগর, ইবনাত ট্রেডার্স, মীর আহমদ ট্রেডার্সের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে পণ্য কেনাবেচা নিয়ে কারসাজির অভিযোগ উঠে। সাম্প্রতিক সময়ে চিনির দাম বাড়ানোর ‘উপযুক্ত কারণ’ না পেয়ে প্রতিষ্ঠানটি অজুহাত দেখাচ্ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বড় দারোগাহাটে অবস্থিত ওজন পরিমাপক যন্ত্রকে।
২০১৮ সালের মাঝামাঝি ওই ওজন পরিমাপক যন্ত্র কার্যকর করে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। এরপর থেকে মালবাহী ট্রাকে ১৩ টনের অধিক পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। পরিমাপক যন্ত্রের কারণে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে পণ্য আনা-নেয়ার সময় ১৩ টনের অধিক পণ্য বহন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পণ্যের দাম কিছুটা বেড়ে যায়।
খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে চিনির দাম কেজিপ্রতি দেড় টাকার বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। অথচ মীর গ্রুপ চিনি সংগ্রহ করে চট্টগ্রামের উত্পাদক এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিড’র কাছ থেকে। যাদের কারখানা কয়েক কিলোমিটার দূরের কর্ণফুলী নদী তীরের ইছানগর এলাকায়। যেখানে স্থানীয় কারখানা হওয়ার কারণে চিনির দাম কম হওয়ার কথা সেখানে উল্টো বেশি নিচ্ছে মীর গ্রুপ।
খাতুনগঞ্জের চিনির পাইকারি ব্যবসায়ী আলী আকবর জানান, বর্তমানে ঢাকার পাইকারি বাজারে প্রতিমণ চিনি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬৫০ থেকে ১ হাজার ৬৫৫ টাকায় অর্থাত্ প্রতিকেজি ৪১ দশমিক ৩৭ টাকা। কিন্তু চট্টগ্রামের বাজারে প্রতিমণের দাম এক হাজার ৭১৫ থেকে ১ হাজার ৭২০ টাকা; যাতে কেজিপতি দাঁড়ায় ৪৩ টাকা।
এই ব্যবসায়ীর হিসেব মতে, প্রতিকেজি চিনিতে মীর গ্রুপ অতিরিক্ত আদায় করছে ১ টাকা ৬৩ পয়সা। সেই হিসেবে- প্রতিদিন মীর গ্রুপ যে পরিমাণ চিনি বাজারজাত করে তাতে প্রতি মেট্টিক টনে এক লাখ ৬৩ হাজার টাকা করে নয়শ মেট্টিক টনে দিনে ১৪ লাখ ৬৭ হাজার এবং প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা অতিরিক্ত মুনাফা করছে মীর গ্রুপ। আর এই বাড়তি লাভের পুরোটাই শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করছে।
এ বিষয়ে কথা বলতে মেসার্স মীর আহমদ সওদাগর এর পরিচালক মীর হোসেনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেনি। তবে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা জানে আলমের দাবি, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে আনতে খরচ বেশি পড়ছে, তাই দাম একটু বেশি। এস আলম গ্রুপের চিনির দাম বেশি নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এস আলম চিনি গুণগতভাবে অন্যদের চেয়ে ভাল। তাই দাম বেশি।’
বাজারে এস আলম চিনির পাশাপাশি সিটি গ্রুপ ও মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ ও আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারি লিমিটেডের ইগলু ব্রান্ডের চিনি রয়েছে।
