‘ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ’ এখন চায়ের কাপে ঝড় তুলিতেছে। কোভিডের টিকা কে সার্থকভাবে আগে আবিষ্কার করিবে, কাহারা ইহার প্রয়োগ সর্বাগ্রে শুরু করিবে, কোন কোন দেশ এই টিকার বিশ্বরাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করিবে—ইহা লইয়া নানান গুঞ্জন শুনা যাইতেছে। টিকা আবিষ্কারের দৌড়ে সবচাইতে বেশি পাল্লা দিতেছে চীন ও রাশিয়া। চীনের টিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম মানিয়া উন্মুক্ত হইবার দোরগোড়ায়। অপরদিকে রাশিয়া তাহাদের ‘স্পুিনক-ফাইভ’ ভ্যাকসিনটি প্রাথমিকভাবে প্রয়োগ শুরু করিয়া দিয়াছে। যুক্তরাজ্য তাহাদের অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন লইয়া আগাইয়া চলিয়াছে। বিশ্বের সবচাইতে প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রও কোভিড টিকার একাধিক ট্রায়ালের সাফল্য দাবি করিয়াছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবার কথা আসন্ন নভেম্বরে। অনেকেই মনে করিতেছেন, নির্বাচনের স্বার্থেই নভেম্বরের পূর্বে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে কার্যকর ভ্যাকসিন উন্মুক্ত করিবার জন্য মরিয়া ট্রাম্প প্রশাসন। তবে ভ্যাকসিন লইয়া রাজনীতি হইবে না বলিয়া আশ্বস্ত করিয়াছেন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যান্থনি ফাউচি। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অন্য কথা বলিতেছে। সংস্থাটির মতে, টিকা জাতীয়তাবাদ শুরু হইয়াছে এবং ইহার পরিণাম ভয়ংকর হইবে। ইহাতে সংকটের মোকাবিলা তো সম্ভব হইবেই না, বরং তাহা আরো দীর্ঘায়িত করিবে।
এই ব্যাপারে আমরা ১১ বত্সর পূর্বে ফিরিয়া যাইতে পারি। ২০০৯ সালে সোয়াইন ফ্লু-এর সম্ভাব্য মহামারি ঠেকাইতে বিশ্বের ধনী দেশসমূহ সেই সময় রোগটির কার্যকর ভ্যাকসিনের অগ্রিম বুকিং করিয়া রাখিয়াছিল। অর্থাত্ ভ্যাকসিন কার্যকর প্রমাণিত হইলে সংশ্লিষ্ট উত্পাদনকারী সংস্থা তাহা ঐ দেশসমূহকে দিতে বাধ্য থাকিবে। যাহার ফলে আফ্রিকার বহু দেশ প্রথমদিকে ভ্যাকসিন পায় নাই। কারণ অগ্রিম বুকিং করিবার মতো অর্থ তাহাদের ছিল না। আমরা দেখিয়াছি, শেষাবধি আমেরিকা এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশ নিজেদের মজুত করা ভ্যাকসিনের ১০ শতাংশ অন্য দেশগুলিকে দিতে রাজি হইয়াছিল বটে, কিন্তু তাহাও এমন একটা সময়ে, যখন তাহাদের আর ভ্যাকসিনের প্রয়োজন ছিল না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে কোভিডের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা দেখা দিতেছে বিশ্ব জুড়িয়া। প্রকৃত অর্থে, বিশ্বে আগামী কয়েক বত্সরের অর্থনীতিও ভ্যাকসিন-নির্ভর হইয়া পড়িবার প্রবল শঙ্কা দেখা দিয়াছে। ইহার সহিত জড়িত বিলিয়ন বিলয়ন ডলারের ব্যবসা। তুলনামূলক দুর্বল দেশসমূহ ভ্যাকসিন পাইতে বন্ধুর হাতের উপর নির্ভর করিতেছে। জানা গিয়াছে, বাংলাদেশ ভ্যাকসিন পাইতে ভারত, চীন, যুক্তরাজ্য ও রাশিয়ার কর্তৃপক্ষের সহিত নিয়মিত যোগাযোগ রাখিতেছে। আমরাও মনে করি, ভালো মানের টিকা যেই দেশ হইতে আগে পাওয়া যাইবে, তাহাদেরটাই নেওয়ার স্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
তবে এত কিছুর পরেও বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হইল—কোভিডের কি কার্যকরী টিকা আদৌ আবিষ্কার সম্ভব? এখনো বহু রোগের টিকা আবিষ্কার করিতে পারেন নাই বিজ্ঞানীরা। ৭৩ বত্সর হইতে চলিল, এখনো জিকা ভাইরাসের টিকা আবিষ্কার করা সম্ভব হয় নাই। সার্স, মার্স বা এইডসের মতো ঘাতক ব্যাধির টিকা এখনো অধরাই রহিয়া গিয়াছে। আর যদি কোভিডের টিকা আবিষ্কার হয়ই, তাহা হইলে ইহা হইতে এই বিশ্বকে নিষ্কৃতি পাইতে প্রত্যেক মানুষকে কোভিড-মুক্তির ব্যাপারে নিশ্চিত পদক্ষেপ লইতে হইবে, যেমনটি লইতে হইয়াছে গুটিবসন্ত কিংবা পোলিওর ক্ষেত্রে। এক জনও যদি কোভিড বাহক থাকে, তাহা হইলে এই বিশ্ব পুরাপুরি কোভিডমুক্ত হইবে না। সুতরাং উচ্চগতির এই যুগে বিশ্বের পরাশক্তিরা নিজেদের স্বার্থেই কোভিডের ভ্যাকসিন সহজলভ্য করিতে পারে। নচেত্ এই বিপদ যাইবে না।
