নারায়ণগঞ্জ ট্র্যাজেডি :টনক নড়বে তো?

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:৫১

মো. জাহিদ হাসান

গত ৪ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ শহরের পশ্চিম তল্লা এলাকার বায়তুস সালাত মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৪ জনে। এই পরিসংখ্যানে আরো কিছু নাম যোগ হতে পারে; কিন্তু এই মৃত্যু ও মৃত্যুযন্ত্রণার জবাব কী? বর্তমানে আমি নারায়ণগঞ্জে অবস্থান করায় এখানের বেদনাবিধুর পরিবেশ নিজ চোখে দেখতে পেয়েছি। ভয়াবহ ভবন ধস আর ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বাংলাদেশে সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আমরা নিজেরাই কি সযত্নে তৈরি করে যাচ্ছি মৃত্যুকূপ? দেশে এরকম ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নতুন নয়। তবুও কেন শিক্ষা হচ্ছে না আমাদের? এই দুর্ঘটনা আমাদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছে অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি। যদি মসজিদটির নিচ দিয়ে কিংবা পাশে গ্যাস লাইন থাকেও, নির্মাণকালে তা বিবেচনা করা হয়নি কেন? স্থানীয়রা বলছেন, কয়েক মাস আগেই গ্যাস নিঃসারণের বিষয়টি বুঝতে পেরে মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে বিতরণ কোম্পানি তিতাসের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করে সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে উদ্যোগী হননি।

সাম্প্রতিক সময়ে আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে গ্যাস লাইনে ছিদ্রজনিত দুর্ঘটনা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১০ বছরে সারা দেশে গ্যাস বিস্ফোরণ সংক্রান্ত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ৫০০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কয়েক হাজার। মৃত্যুর এই পরিসংখ্যান আরো দীর্ঘ। গ্যাসের হাজার হাজার অবৈধ সংযোগ আজ যেন এক ওপেন সিক্রেট। কেউ দেখছে না, কেউ দেখবে না—এমনটা ভেবে যাপিত জীবনে বেপরোয়া আমরা। বাংলাদেশে ভবন নির্মাণসহ নিরাপত্তাবিষয়ক যেসব নিয়মকানুন বা আইন আছে তার কঠোর এবং কার্যকারী প্রয়োগ নেই। এসব ক্ষেত্রে নানারকম দুর্নীতির কারণে নিরাপত্তার বিষয়টি বেশি আমলে নেওয়া হয় না। পরিতাপের বিষয় এই যে, আমরা নিজের এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে নারাজ। চলাচলের রাস্তাটুকু যেখানে ছাড়তে চায় না, সেখানে ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি যাওয়ার চিন্তা করাটা কল্পনাতীত। আমাদের পদক্ষেপই প্রতিনিয়ত বিপন্ন করছে আমাদের জীবন। আমরা নিত্য দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিচ্ছি। কোনো আইনের পরোয়া করি না আমরা। মূলত, মানুষের আচরণ ও বৈষয়িক মুনাফার চিন্তাধারা পরিবর্তন হয়নি। এভাবে আর কত প্রাণ গেলে আমরা সচেতন হব? অন্যদিকে, একটি দুর্ঘটনা ঘটলে প্রশাসনের টনক নড়ে। আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আবার স্তিমিত হয়ে যায় অনিয়েমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ কার্যক্রম। অসংখ্যবার প্রমাণিত হয়েছে এ ধরনের অবৈধ সংযোগের সঙ্গে সরবরাহ কর্তৃপক্ষের কর্মীরা জড়িত; কিন্তু এর কোনো প্রতিকার হয়নি।

নারায়ণগঞ্জের গ্যাস পাইপলাইন বিস্ফোরণ ঘটনাতেও একাধিক তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। তদন্ত শেষে আবারও কিছু সুপারিশ জমা পড়বে। সেই সুপারিশের স্তূপের উচ্চতা বাড়বে। শত শত সংখ্যা আগুনে পুড়ে, হাজারো সংখ্যা ফাইলের স্তূপে চাপা পড়ে। এরকম দুর্ঘটনার তদন্ত ও তার পরে কার্যকরী ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয়। আমরা আবারও ফিরে যাই বেপরোয়া যাপনের অভ্যস্ততায়। সত্য হচ্ছে—আমরা জাতি হিসেবে অনৈক্য, বিশৃঙ্খল আর আনুগত্যহীন জাতি হওয়ার কারণে নিমতলী, চকবাজারের পর নারায়ণগঞ্জে ভয়াবহ আগুনে এত প্রাণহানির মতো ঘটনা সংঘটিত হলো। তাই এমন মর্মান্তিক আর বেদনাদায়ক ঘটনার আর যেন পুনরাবৃত্তি না হয় সে জন্য আমাদের সবাইকে স্বার্থপরতা আর আত্মকেন্দ্রিকতা পরিহার করে দেশ, জাতি ও মানবতার স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ, সুশৃঙ্খল আর আনুগত্যশীল জাতি হওয়া একান্ত প্রয়োজন। সরকার যদি দেশের স্বার্থে ও জনগণের স্বার্থে কোনো নির্দেশ দেয় তার আনুগত্য করার মতো মানসিকতা আমাদের এখন থেকে তৈরি করতে হবে। নইলে ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে আমরা কেউ রক্ষা পাবো না।

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়