ডা. বিমল কুমার আগরওয়ালা
বিবর্তনের ধারায় আমাদের পূর্বপুরুষেরা যখন থেকে দুই পায়ে হাঁটতে শুরু করলেন, তখন থেকেই সভ্যতার গোড়পত্তন ও ক্রমবিকাশের নতুন ইতিহাসের জন্ম। প্রাগৈতিহাসিক এক ক্রান্তিলগ্নে দুই পায়ে হাঁটা মানুষকে দিল অন্যান্য প্রাণিকুলের এক অনন্য সুবিধা, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে হাতের নানাবিধ ব্যবহার। তারপর ক্রমশ তৈরি হতে থাকল বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য শিকারের বিভিন্ন অস্ত্র ও যন্ত্রপাতি। সেই সঙ্গে পাথরের গুহায় ছবি আঁকা, যা আজকের আধুনিক শিল্পকলার পথিকৃত্। হাঁটার সঙ্গে মানবদেহের সম্পর্ক নিবিড়। হাঁটা বিনা দেহ-মনের সুস্থতা যেন কল্পনাতীত। তাই তো সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই স্বাস্থ্যসচেতন মানুষেরা গভীরভাবে অনুভব করেছেন হাঁটার গুরুত্ব। বিকাল কিংবা প্রাতর্ভ্রমণের প্রথা হয়তো এই চিন্তা থেকেই সৃষ্ট।
হয়তো উত্সুক মনে প্রশ্ন জাগবে তাহলে হাঁটা নিয়ে নতুন করে বলা কেন? বর্তমান প্রজন্মের অনেকের মধ্যে কম্পিউটার কিংবা ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তি হওয়া, এমনকি তাদের মধ্যে মাদকাসক্তির প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনেও এই শরীরচর্চার অনভ্যাস অনেকাংশে দায়ী।
আমাদের জীবনযাত্রায় আধুনিক প্রযুক্তির বিভিন্ন প্রভাবের কারণে মানুষের শুধু যে দৈহিক পরিশ্রম কমছে তা নয়, বরং খাদ্যাভ্যাসেও হচ্ছে বেশ পরিবর্তন। অর্থাত্ ফাস্ট ফুড, মিষ্টি, কোমল পানীয়, চকলেট, আইসক্রিমসহ অধিক তৈলাক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। পরিণামে কমছে দেহের রোগপ্রতিরোধক্ষমতা; বাড়ছে দৈহিক ওজন ও বিভিন্ন ধরনের অসংক্রামক ব্যাধি। একসময় কলেরা, ডায়রিয়া, বসন্ত ইত্যাদি সংক্রামক ব্যাধির কারণে মানুষ বেশি মারা যেত। বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নের ফলে এসব রোগ অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব হলেও দুঃসংবাদ হলো বর্তমান সময়ে আমাদের জন্য ঘাতক ব্যাধি হচ্ছে কতক অসংক্রামক রোগ, বিশেষ করে ডায়াবেটিস, হূদেরাগ, ক্যানসার, ওবিসিটি, ফ্যাটি লিভার ডিজিজ, ইনফার্টিলিটি ইত্যাদি।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, জীবনযাপনের মান পরিবর্তনের পাশাপাশি জেনিটিক ফ্যাক্টর ও মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধিও বিভিন্ন রোগ প্রসারের জন্য দায়ী। ডায়াবেটিস এখন এমনি একটি রোগ, যেটি যে কারো যে কোনো বয়সে হতে পারে। শিশুদের ও গর্ভাবস্থায় এ রোগের হার বাড়ছে দিন দিন।
ডায়াবেটিস যেন একটি ‘নীরব ঘাতক ব্যাধি’। এর জটিলতা ব্যাপক। উচ্চ রক্তচাপ, হূদেরাগ, স্ট্রোক, কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়া, অন্ধত্ব, পায়ে সংক্রমণসহ পা কেটে ফেলার মতো সমস্যাসহ বহুবিধ জটিলতা হতে পারে ডায়াবেটিস সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণে না থাকলে।
এ রোগ যেন তিলে তিলে রোগীকে মেরে ফেলে। রোগী ও রোগীর পরিবারেরই যে শুধু চিকিত্সা ব্যয় বাড়ে তা-ই নয়, ডায়াবেটিস এবং এর জটিলতা বৃদ্ধির কারণে রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য খাতেও অর্থনৈতিক বিরূপ প্রভাব পড়ে। তাই তো ‘রোগ প্রতিকার নয়, বরং প্রতিরোধই শ্রেয়’—এ সত্য উপলব্ধি করতে এই প্রতিষ্ঠানের অ্যান্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের উদ্যোগে ২০১৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর চালু হয় ‘ডিএনএমসি হাঁটা দিবস’।
তারপর থেকে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণে প্রতি বছর ৭ সেপ্টেম্বর শোভাযাত্রা, ডায়াবেটিসবিষয়ক আলোচনা ও বিনা মূল্যে রক্ত শর্করা পরীক্ষার মাধ্যমে এই দিবস পালিত হয়। নিয়মিত দ্রুত হাঁটার অভ্যাস ও স্বাস্থ্যপ্রদ খাবার খেলে শরীরের ওজন স্বাভাবিক থাকে, যা অনেকাংশে ডায়াবেটিস প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এই মহতী উদ্যোগকে সফল করার লক্ষ্যে আমরা প্রস্তাব করছি যে, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও দেশি-বিদেশি সংস্থা যেন হাঁটা দিবস পালনের মাধ্যম হাঁটার তাত্পর্য সবাইকে অবহিত করতে এগিয়ে আসুক। মনে রাখা দরকার যে, শরীরের রোগপ্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে সুষম খাদ্য সেবনের পাশাপাশি নিয়মমতো হাঁটতেই হবে। যদি দৈহিক রোগপ্রতিরোধক্ষমতা ভালো থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে করোনার মতো যে কোনো ভয়াবহ সংক্রমণ প্রতিরোধ করাও খুব সহজ হবে।
ডায়াবেটিস প্রতিরোধ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে বাবা-মা, শিক্ষক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের। পাঠ্যপুস্তকে হাঁটা বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত লিপিবদ্ধ থাকলে একজন শিশু শৈশবকাল থেকেই উপলব্ধি করতে শিখবে হাঁটার উপকারিতা। এর পরে আগামী প্রজন্ম রক্ষা পাবে ডায়াবেটিসের মতো জটিল রোগ থেকে।
অতএব, নিজের প্রাত্যহিক জীবনের সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সারা দিনের যে কোনো সময় ৩০-৪৫ মিনিট একটু দ্রুত হাঁটার অভ্যাস অর্জন করা সব বয়সি নারী-পুরুষের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
n লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ
