স.ম. শামসুল আলম
পুরানা পল্টন ফুটপাতে দাঁড়িয়ে পুরোনো বই ঘাঁটছিলাম। দেখলাম একটি মেয়ে গটগট করে হেঁটে আসছে। সূর্যের বিপরীতে থাকায় কালো সানগ্লাস পরা মেয়েটিকে অতটা সুন্দর লাগছিল না। আড়চোখে তাকানোটাই অপরাধ হয়ে গেল। মেয়েটি আমাকে অতিক্রম করে যাবার সময় পিঠে তার পার্টসের একটি খোঁচা দিয়ে গেল। মনে হলো দুই নম্বর, মানে, খারাপ মেয়েমানুষ।
আমি সেটা বুঝতে পেরেই হাত থেকে বই নামিয়ে তার পিছু নিলাম। সে হাউস বিল্ডিংয়ের দিক থেকে ফুটওভারব্রিজে উঠল। মুখে ফোর কালারের হাসি লেগে আছে। আমি দ্রুত হেঁটে তার সাথ ধরলাম। এবার পাশাপাশি। দুজনেই উপরে উঠে গেছি। সাহস করে মিনমিন করে সরাসরি বললাম, যাবা নাকি আমার সাথে?
মেয়েটি দাঁড়িয়ে পড়ল। আমিও দাঁড়ালাম। আমার মুখের দিকে মুখ রেখে জিজ্ঞেস করল, কই নিয়া যাবেন?
তাই তো, কোথায় নিয়ে যাব তাকে? আমার তেমন যাবার জায়গা নেই। ভাবলাম তাকে নিয়ে একটু ঘোরাঘুরি করি। একটু আনন্দ কিনে নেওয়া যাকে বলে। পাশাপাশি থাকলে, ক্লোজ হলে একটু ধরাধরি, ছোঁয়াছুঁয়ি এমনকি চুমোচুমিও সম্ভব। মিষ্টি হেসে বললাম, রমনা পার্কে। সে একটু রেগে গেল মনে হয়। সুন্দর মুখের মিষ্টি রাগ। আমার বুকের ওপর আঙুলের টোকা দিয়ে বলল, পার্কে পুঙা মারি না।
সে গটগট করে হেঁটে গেল বায়তুল মোকাররমের দিকে। আমি আহম্মকের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। আরে মাগী, মারব তো আমি। তুই কেন মারার কথা বলিস? মন বেজার করে বায়তুল মোকারমের দিকে নামলাম। কোত্থেকে যেন হুট করে মেয়েটি এসে হাজির। গাঢ় লাল লিপস্টিক ঠোঁটে মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল, ইনকাম নাই। পার্কেই সই। তয় সেইখানে তো কিছু কইরতে পারবা না।
—না না। আমার ওসব লাগবে না। একটু সঙ্গ দিলেই হবে।
কথা সত্য। আমি কিছু লেখার উপাদান খুঁজছি। হয়তো মেয়েটি বলবে তার বাবা আরেকটা বিয়ে করে পালিয়ে গেছে। মা আগেই মারা গেছে। অথবা উলটোটা। খালার কাছে মানুষ। খালা তাকে এপথে নামিয়েছে। ইত্যাদি।
সে বলল, তুমি সামনের দিক আগাইতে থাকো, আমি আসতাছি। দুই মিনিট।
আমি এগিয়ে গিয়ে ফুটপাতের দোকানের কাছে দাঁড়াই। টি-শার্ট বিক্রি করছে দুজন বিক্রেতা। সুর করে একজন বলছে, একদাম এক শ, যেটা নেবেন এক শ। আমি এক শ টাকার জিনিস বাছতে থাকি। মেয়েটি ফিরল ১০ মিনিট পর। আমার বুকে একটি টোকা মেরেই দ্রুত হাঁটতে লাগল। আমি ভাবলাম সে অনুসরণ করতে বলছে। হঠাত্ দেখতে পেলাম বেশ কয়েকজন যুবক ছেলে এসে আমাকে ঘিরে ধরেছে। তার মানে টোকা মেরে মেয়েটি আমাকে চিহ্নিত করে দিয়ে গেল। হাতঘড়িটা গেল, মানিব্যাগ গেল, এমনকি বুকপকেটের কলমটাও মারধর করে ছিনিয়ে নিয়ে গেল! রিকশাভাড়াও নেই। হেঁটে বংশাল যেতে হবে—মেসবাড়িতে। চোখে জল এসে গেল।
সব লেখকই বারবনিতা নিয়ে কিছু না কিছু লিখেছে। এ বিষয়ে আমার একটি লেখাও নেই। আমি তবে কিসের লেখক?
একদিন সন্ধ্যায় শাহবাগ থেকে হেঁটে মত্স্যভবনের দিকে যাচ্ছি। হঠাত্ একটি মেয়ে আমার সামনে পড়ল। আমার প্রবল ইচ্ছেটা ঘূর্ণিপাকের মতো পাক খেলো মাথার ভেতর। একটু থমকে দাঁড়াতেই মেয়েটি এসে হাত ধরে বলল, লন, পার্কে ঢুকি। পার্কের কথা শুনে আমি ইতস্তত করি। বললাম, না, পার্কে নয়। চলো রিকশায় ঘুরি।
রিকশাভাড়া বাঁচাতেই হাঁটছিলাম। এখন রিকশায় কত গুণ খরচ হবে কে জানে। রিকশা যেন আমাদের জন্য তৈরি হয়েই ছিল। যখনই দুজন সেই রিকশাটিতে উঠলাম, সঙ্গে সঙ্গে আরো দুটি মেয়ে এসে উঠে পড়ল। কথা শুনে বুঝলাম, তারা সবাই হিজরা। দুজনের একজন বলল, খালি চম্পারে নিয়া ফুর্তি করবা, আমরা কী দোষ করলাম? অন্যজন উলটো হয়ে রিকশাওয়ালার সিটে বসল। বুঝতে পারলাম তিন হিজরা থেকে আজ আমার নিস্তার নেই। টাকা-পয়সা তো নেবেই, ঐডাও ছিঁড়ে নিতে পারে। আমি রিকশা থেকে লাফ দিয়ে নেমে ভোঁ-দৌড়।
