রেজাউল করিম খোকন
হ্যাকিং বা ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে দেশের ব্যাংকগুলো থেকে অর্থ চুরি হতে পারে—তেমন আশঙ্কা প্রকাশ করে সম্প্রতি সতর্কাবস্থা জারি করা হয়েছে। এমন আশঙ্কায় এর আগে সতর্কতা জারি করে একাধিক মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা। তারা বলেছে, উত্তর কোরিয়া সরকারের সঙ্গে যুক্ত একদল হ্যাকার এটিএম বুথ ও ভুয়া লেনদেনের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পাঁয়তারা করছে। এই হ্যাকার দলের নাম ‘বিগল বয়েজ’। দলটি বিভিন্ন হ্যাকার গোষ্ঠীর একটি জোট। সতর্কতা জারির পর থেকে দেশের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে সতর্কবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সাবধানতা অবলম্বন করা হচ্ছে—এটিএম বুথের লেনদেন ও ক্রেডিট কার্ডের যাবতীয় লেনদেনে। এ ক্ষেত্রে তদারকি জোরদার করা হয়েছে। অনেক ব্যাংক রাতের বেলা অনলাইন ব্যাংকিং ও এটিএম বুথের লেনদেন বন্ধ রেখেছে। এছাড়াও বিদেশিদের যে কোনো লেনদেনে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করছে ব্যাংকগুলো। এটিএম বুথে প্রবেশে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক হ্যাকার চক্রের সম্ভাব্য সাইবার হামলা প্রতিরোধে বিশ্বের অন্যান্য দেশের ব্যাংকগুলোতেও সতর্ক অবস্থা জারি করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় উত্তর কেরিয়ার হ্যাকার গ্রুপ জড়িত ছিল বলে আগে জানানো হয়। এ কারণেই তড়িঘড়ি করে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সব ব্যাংককে সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করতে বলা হয়। হঠাত্ করে ব্যাংকের সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন ধরনের সতর্কতা ও সাবধানতা অবলম্বন করতে হচ্ছে। এ কারণে ব্যাংকের গ্রাহকদের কিছুটা ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হয়েছে ইদানীং।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে চুরি হওয়া ঘটনায় দেশ জুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। সর্বস্তরের মানুষ এ বিষয়ে কৌতূহলী হয়েছেন, সবার মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ, দুঃখ, হতাশা ছড়িয়ে পড়েছিল । চুরি বন্ধ করার ক্ষেত্রে দুইটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এ মধ্যে একটি হলো, ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা দুর্বলতাগুলো অবিলম্বে কাটিয়ে ওঠা এবং অপরটি সেই প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবল তৈরি করা। প্রযুক্তির কল্যাণে বিশ্ব এখন একটি গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে। চাইলেই আমরা এর বাইরে থাকতে পারব না।
আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর সেবায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে ব্যাংকের সব গ্রাহক। আজকাল প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে ব্যাংকগুলোও। আর এ সুযোগ কাজে লাগাতে তত্পর হয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ নানা চক্র। রাজধানী ঢাকা শহরের বেশ কয়েকটি এটিএম বুথ থেকে একদল বিদেশির জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা চুরির চাঞ্চল্যকর ঘটনা জনমনে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। ইতিমধ্যে তদন্তের মাধ্যমে উদ্ঘাটিত হয়েছে অনেক অজানা তথ্য। এর আগে এটিএম কার্ড কোলন করে জালিয়াতির মাধ্যমে বুথ থেকে অবৈধভাবে অর্থ আত্মসাতের অনেক ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা কেবল ব্যাংকের গ্রাহকদের জন্যই নয়, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্যও উদ্বেগজনক। যদিও বহু আগে থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ ধরনের ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংক থেকে অর্থ চুরির ঘটনা ঘটে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে শুরু করায় সংশ্লিষ্ট সবাই নড়েচড়ে বসছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কর্মকর্তা, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ, গ্রাহক সবাই দারুণ এক উত্কণ্ঠার মধ্যে পড়ে গেছেন। এ ক্ষেত্রে আরো উত্কণ্ঠার বিষয় হলো—এ ধরনের ঘটনায় বিদেশিদের জড়িত থাকা।
একটা সময়ে আইটির জন্য আলাদা নিরাপত্তা বিভাগ বলতে কিছু ছিল না ব্যাংকগুলোতে। আমরা সাধারণত তথ্যপ্রযুক্তির সুযোগসুবিধা, সাফল্যগুলো ভোগ করেই পরিতৃপ্তি ও সন্তুষ্টিতে আচ্ছন্ন থাকছি। সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে তেমন সিরিয়াস না হওয়ায় এ দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে সংঘবদ্ধ জালিয়াত চক্র। ব্যাংক খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং সেই কারণে ব্যাংকিং কর্মকাণ্ডে দারুণ গতির সঞ্চার হয়েছে। এই আইসিটিকে ব্যাংক খাতের প্রধান একটি ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো ভিন্ন। এখনো আইসিটিকে ব্যাংক খাতের মূল ব্যবসা থেকে আলাদা করে দেখার একটি মানসিকতা বহাল রয়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নতুন গতি সঞ্চারকারী আইসিটি খাতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব না দিয়ে অবহেলিত অবস্থায় রেখে দিলে বড় ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা দেশের কোনো ব্যাংকে না ঘটতে পারে সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে ও সচেতন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অবহেলা, দায়িত্বহীনতা, গাফিলতির কোনো সুযোগ নেই। ব্যাংক খাতের সর্বস্তরে এ বিষয়ে সতর্কতামূলক সচেতন মনোভাব জাগিয়ে তুলতে হবে। আমাদের ব্যাংকিং খাতে বিশ্বমানের সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক এবং সিরিয়াস হতে হবে।
