পাথরবৃষ্টির কবলে

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০১৯, ২০:৫৪

জর্জিয়ার এক প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকার সড়কে গাড়ি থামিয়ে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। সামনে এগুবার উপায় নেই। আমাদের গাড়ির পাশেই আরও দুটি গাড়ি আর একটি নুড়িপাথর ভর্তি ট্রাক। তারাও হতভম্ব হয়ে গেছে সামনের দৃশ্য দেখে। শীতের প্রারম্ভে যেমনি করে ওক গাছ থেকে ঝরে পড়ে শুকনো পাতা, তেমনি করে কিছুটা দূরে পথপাশের পাহাড় থেকে ঝরে পড়ছে মুক্ত পাথর। মাধ্যাকর্ষণের টানে সে-সব পাথর ক্রিকেট বলের মতোই বাউন্স করে পথ পেরিয়ে নিজের অন্তিমস্থল হিসেবে বেছে নিচ্ছে বাঁ পাশের খরস্রোতা নদীকে। এই পাথরবৃষ্টির মাঝ দিয়ে যাওয়া মানে হলো, নিজের মাথাটিকে ফাটা কতবেল বানাবার পথে হাঁটা। আমাদের গাড়ির চালক তাই বেশ খানিকটা দূরে গাড়ি দাঁড় করিয়ে উদাস ভঙ্গিতে সস্তা সিগারেটে আগুন ছোঁয়ায়। আর আমরা? আমরা প্রথমে খানিকটা সময় গাড়ির গুমোটস্থলে থাকলেও কিছুক্ষণ পর বুঝে যাই—এই শনির দশা কাটবার কোনো আশু লক্ষণ নেই। আমরা মানে, আমি আর ক্যারোলিন। জার্মান এই ভদ্রমহিলার সাথে গাড়ি শেয়ার করে চলেছি গরি শহরের দিকে। সামনের ওই পাথরবৃষ্টির মতো ইনার সাথে পরিচয় আর এই গাড়ি শেয়ারের বিষয়টিও দৈবাত্; একেবারেই ঘটনার মারপ্যাঁচে পড়ে।

আজ সকালে মেতস্খেতা মঠের সামনে রবিবাসরীয় হাট বসেছিল। সেখানে বসেছিল বিস্তর কার্পেটের পসরা। অবস্থা এমন হয় যে, খুচরো দোকানিরা মঠের সীমানা-দেয়ালে কার্পেট ঝুলিয়ে রাখা শুরু করে। সে-সব পরখ করার একপর্যায়ে গাঢ় নীল রঙে সিল্কের কাজ করা এক কার্পেট বড্ড পছন্দ হয়। কিন্তু দাম শুনে একেবারে অক্কা পাওয়ার দশা। দামের প্রশ্নে আমার উদ্বিগ্নতা দোকানিকে জানালে কী করে সেই সুদূর তুরস্ক থেকে সুতো এনে তারপর এই কার্পেট বুনতে হয়, সেই নিয়ে সে বিরাট এক কাহিনি ফেঁদে বসে। সেই কাহিনির বয়ান শুনতে গিয়ে কেটে যায় বেশ খানিকটা সময়। কিন্তু শেষ অবধি দোকানিকে নিরাশ করে আমাকে যেতে হয় উল্টোদিকের ডালিমের দোকানে। এখানে যিনি ডালিমের রস বিক্রি করছেন, সেই মহিলার দু গালেও যেন দুটি ডালিম। তেমনই লালচে আভা। আমি এক গেলাস রস চাইলে তিনি ঝটপট ডালিম মাড়াইয়ের যন্ত্রে ঢুকিয়ে দেন তাজা ডালিম। রক্তলাল রঙের রস চুইয়ে পড়ে নিচে রাখা কাগজের গেলাসে। আমি দাম চুকিয়ে দেখি—পাশের দোকানে লেগে গেছে বিরাট হট্টগোল। সে-দোকানে বিশাল বপুর অধিকারিণী এক বৃদ্ধা বিক্রি করছেন ছুচকালা। দেখতে সজনে ডাটার মতো এ-বস্তুকে বলা চলে ও-দেশের ঝালমুড়ি। পথে-ঘাটে-মাঠে বহুস্থানেই দেখেছি দেদারছে বিক্রি হচ্ছে ও জিনিস। মূলত ডালিমের রসকে আটার মধ্যে মিশিয়ে ভেতরে পেস্তাবাদাম ভরে দেয়া হয় লম্বাটে এক রূপ। শিক কাবাবের ভেতরে থাকা দণ্ডের মতো এর ভেতরে থাকে মোটা সুতো। সুতো ধরেই ওটিকে ঝুলিয়ে রাখা হয় দোকানের রশিতে। তো সেই পাশের দোকানে এক ব্যক্তি ছুচকালা কিনতে এসে বুড়িকে হয়তো বলে বসেছেন মাত্রাতিরিক্ত কম মূল্য। তাতে বুড়ি চেতেমেতে বলছেন, সেস লারি মানে ছ’ লারির এক পয়সা কমেও তিনি ও-বস্তু বেচবেন না। কিনতে চাইলে কেনো, নইলে ফোট। আমি সেই তামাশা দেখার পর হাঁটতে হাঁটতে পাশের এক পাড়ার গোলকধাঁধায় ঢুকে যাই। মঠের চারদিকেই এমন ঘুপচি গলির পাড়া। বড় রাস্তা থেকে মঠের সীমানায় পৌঁছাতে গেলে এমন কিছু গলির রহস্যময় বাঁক পেরিয়ে তবেই আসতে হয়। তবে সকালে যখন মঠে এসেছিলাম, তখন পথ চিনতে অসুবিধে হয়নি। তিব্লিসি থেকে যে বাসে আসি, সে বাসেই ছিলেন আরও কিছু পুণ্যার্থী। ওই তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেই পৌঁছে গিয়েছিলাম এই চত্বরে। তবে এত জায়গা থাকতে কাকডাকা সকালে এখানে কেন এলাম, সেটিও মনে হয় বলা প্রয়োজন।

জর্জিয়ায় জাগ্রত মঠের অভাব নেই। এখানকার লোকেরা বেশ গর্ব ভরে বলেন, খ্রিস্টধর্ম এককালে এ-অঞ্চলের পথ পেরিয়ে তবেই পৌঁছেছিল ইউরোপের দরজায়। আর সেই যাত্রাকালে পথে রেখে যায় কিছু অমূল্য স্মৃতি। এ মঠও তেমন এক স্মৃতিকে বুকে আঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে। কথিত আছে, যিশুর মৃত্যুর পর এক জর্জিয়ান ইহুদি জেরুজালেম থেকে যিশুর একটি আলোয়ান কেমন করে যেন কুড়িয়ে এনে নিজদেশে ফিরে আসে। পরে এক খ্রিস্টভক্ত সেই আলোয়ান মাটিতে পুঁতে সেখানে লাগান সিডার গাছ। একসময় সেই বৃক্ষ পরিণত হয় মহীরুহে। তারও বহু পরে সেই গাছ কেটে চারধার পরিষ্কার করে সেখানে গড়া হয় মঠ; আর সেই গাছের স্থানটিতে মঠের ভেতরে স্থাপন করা হয় স্তম্ভ। প্রচলিত এমন নানা লোকশ্রুতির কারণে তিব্লিসির আশপাশে ঘুরতে যাবার মতো কোনো স্থানের প্রসঙ্গ এলেই, ধার্মিক জর্জিয়ানরা সোজা দেখিয়ে দেয় এই মঠের পথ।

সেই পথ চিনে মঠে এলেও, এবারে নানা গলি উপগলির মাঝ দিয়ে চলতে গিয়ে দিক হারিয়ে ফেলি। যদিও শেষ অবধি বড় রাস্তার বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছাই আমি। আগে থেকেই জানি, ঠিক দুপুর বারোটায় ওখান থেকে গরি শহর অভিমুখে একটা বাস ছেড়ে যাবে। ওটি না পাওয়া গেলে বিপদ। কারণ, এর পরের বাস প্রায় তিন ঘণ্টা পর। আমি সেই বারোটাকেই নিশানা করে তড়িঘড়ি মঠ আর তার চারপাশে বিচরণ করে বাসস্ট্যান্ডে এসেছি। আমার ঘড়ি অনুসারে এখন বারোটা বেজে চার। চার মিনিট দেরি আর এমন কী? এখানে কিন্তু এখন কোনো বাস নেই। তবে কি ওই মিনিট কয়েকের মাঝেই বাসটা আমাকে ফেলে চলে গেল? চোখটাকে কচলে আশপাশে আরেকটু ভালো করে তাকিয়ে বুঝি, সকালে যে স্থানে এসে নেমেছিলাম, সেই স্থান আর এই স্থান এক নয়। এখন রাস্তা চিনে যদি সেই সকালের স্থানে পৌঁছাই-ও, তবুও বাসটি ধরা যাবে না হয়তো। তাহলে কি ট্যাক্সি ভাড়া করে তিব্লিসিতে ফিরে যাব? ওখান থেকে সস্তায় গরিতে যাবার বাস-ট্রেন কিছু একটা পাওয়া যাবে নিশ্চয়ই।

আমি সাত-পাঁচ ভেবে আবারও শতবর্ষী বাড়ির দেয়াল দিয়ে ঘেরা সঙ্কীর্ণ সড়কে পা রাখি। তখনই দেখি ভদ্রমহিলাকে। পিঠে মাঝারি সাইজের ব্যাকপ্যাক নিয়ে বেশ নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে হেঁটে আসছেন এই দিকে। পরনে ল্যাভেন্ডার রঙের ফুলতোলা লম্বা স্কার্ট। এঁকে কিছুক্ষণ আগে দেখেছি মঠের প্রাঙ্গণে। মঠের ভেতরে ঢুকবার সময়ে কিছুটা বাধা পেরোতে হয়েছিল আমাকে। এখন অগাস্ট মাসের তালপাকা গরমের সময়। শর্টস পরেছি। ওদিকে মঠের নিয়ম হলো, বে-আব্রু হয়ে ভেতরে ঢোকা চলবে না। অগত্যা আমাকে বাইরে বেরিয়ে এসে সদর দরজার বাঁ পাশের ঝুড়ি থেকে তুলে নিতে হয়েছিল এক ফালি কাপড়। সেই দিয়ে কোমরে যখন লুঙ্গির প্যাঁচ মারছি, তখন দেখি, এই ভদ্রমহিলা নিজের পয়েন্ট অ্যান্ড শুট ক্যামেরা নিয়ে ছুটছেন সামনের দূর্বাঘাসপূর্ণ মাঠে উড়ে বেড়ানো এক প্রজাপতির পেছনে। আমি মঠের ভেতরে ঢুকলেও তাকে আর ভেতরে দেখিনি। আমি নিশ্চিত, ইনি হয়তো মঠ বেষ্টনকারী কালচে প্রাচীন প্রাকার আর তদসংলগ্ন হাটের পসরা দেখেই বাড়ি ফিরছেন। তখনই হঠাত্ মনে খেলে যায়, আচ্ছা ইনি যদি এখন তিব্লিসিতে ফেরেন, তবে তো একই গাড়িতে ভাড়া শেয়ার করে যাওয়া যায়। তাই আমিই আগ বাড়িয়ে গিয়ে বলি, ‘আর ইউ অলসো লসট লাইক মি?’ অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সঠিক বা ভুল পথ, কোনোটি নিয়েই এই মহিলার মাথাব্যাথা নেই। তার কথা হলো, ‘হোয়াট এভার। দেখা যাক, ট্যাক্সি, বাস, ভ্যান গাড়ি কিছু একটা তো পাব। আর কিছুই যদি না পাই, তবে সোজা হাঁটা দেবো!’ আমি এমন উত্তরে কিছুটা ভড়কে যাই। সন্দিগ্ধ মনে জানতে চাই, ‘তিব্লিসিতে ফিরছেন নিশ্চয়ই?’ এবারেও সে ঠোঁট উলটে বলে, ‘কোথায় যে যেতে চাই এখন, ঠিক জানি না, কাল সকালের মধ্যে ফিরলেই হবে। তুমি কোথায় যাচ্ছ?’ হঠাত্ মাথায় খেলে যায়, একে ভজিয়ে গরি শহরের দিকে নিয়ে গেলে কেমন হয়? এখান থেকেই ট্যাক্সি নিলে মেলা টাকা ভাড়া গুনতে হবে। সেক্ষেত্রে ইনি যদি পয়সার ভার কিছুটা নিতে সম্মত হন, তবে তো আমার সমস্যার অনেকটুকুই সমাধান হয়ে যায়। ভদ্রমহিলা এককথায় রাজি হয়ে যান।

 

গাড়ি থেকে নেমে আমি আর ক্যারোলিন নদীর পাড় ধরে পেছনদিকে হাঁটতে থাকি। এ পথে গাড়ি খুব একটা চলে না। প্রায় মিনিট দশেকে হয়তো একটি গাড়ির দেখা মেলে। বাকি সময়টা চারপাশ ঢেকে যায় অদ্ভুত নির্জনতায়। শুধু পাশের নদীটির ক্রুদ্ধ স্রোতের নিক্বন কানে বাজে। নদীর উজানে কংক্রিটের নাতিদীর্ঘ সেতু। সেটিতে এই মুহূর্তে কাউকে দেখছি না। একটু দূরে পথের বাঁ পাশে টিনের দোচালা একটি বাড়ি দেখা যাচ্ছে। বাড়ির সমুখভাগে গোলপোস্টের বারের মতো গাঢ় হলদে রঙের পাইপ। এই পাইপ এই পুরো জনপদেই বিস্তৃত। ড্রাইভারের কাছ থেকে জেনেছি, এ নাকি গ্যাসের পাইপ। সেই সোভিয়েত আমলে মাটির ওপর এই পাইপ লাইনগুলো বসানো হয়েছিল। এতে ঝামেলা হলো, কেউ চাইলেই হুট করে বাড়ির সীমানা দেয়াল ভেঙে ভিন্ন স্থানে সদর দরজা বানাতে পারবে না, ওতে পুরো লাইনটিকে বন্ধ করে লাইনের গতিপথ পরিবর্তন করতে হবে, সে নিশ্চয়ই মেলা ঝক্কির ব্যাপার। আশপাশে আর কোনো বাড়ি না থাকায় সেই টিনের বাড়িটি হয় আমাদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। ওটির সদর দরজা হাট করে খোলা। দাওয়ায় খালি গায়ে বসে এক বৃদ্ধ সিগারেট টানছেন। আমাদের দেখে তিনি ‘গামারহবা’ অর্থাত্ হ্যালো বলেন। ক্যারোলিন বুড়োকে আকার ইঙ্গিতে এখানে কোনো টয়লেটের ব্যবস্থা আছে কি-না জানতে চান। বুড়ো বাড়ির কোণের দিককার একটি ঘরের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেন। আমি বিবর্ণ সিমেন্টে ঢাকা উঠোনে এসে দাঁড়াই। তবে আমার মাথার ওপর সূর্যের কোনো উপস্থিতি টের পাই না। ঘাড় উঁচু করে তাকিয়ে দেখি, সেখানটায় মাচার ওপর ঝুলছে অসংখ্য আঙুরের থোকা। এখনো টুসটুসে হয়ে পাকেনি। নতুবা হয়তো হাত বাড়িয়েই পেড়ে খেতাম খানিকটা। এ-বাড়ির ডানদিকে লাইম গাছের তলে ঘুমিয়ে আছে জরাজীর্ণ একটি সোভিয়েত মেইড লাডা গাড়ি। আর ডানদিকে চৌকিদারের খুপরির মতো ছোট্ট একখানা টং ঘর। মাথার কাছটায় কাঠের খড়িতে লেখা ‘১৭০০’। ব্যাপারটা রহস্যময় মনে হয়। ঘরের কাছে গিয়ে ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখি, সেখানে ছোট্ট বেদিতে যিশুর আইকন, আর মোমের ঝাঁঝালো গন্ধ। হুমম, এটি তবে এ বাড়ির গৃহমন্দির। আমি সেটির একটি ছবি তুলে দাওয়ার দিকে তাকিয়ে দেখি, সেই সিগারেট-ফোঁকা বৃদ্ধ আমাকে আধবোজা চোখে চেয়ে দেখছেন। তবে কথা বলার তেমন একটা ইচ্ছে তাঁর মাঝে নেই।

ক্যারোলিন ফিরে আসেন। বুড়োকে ধন্যবাদ জানালে তিনি কেবল মাথা দোলান। আমরা এবারে সেই সেতু অভিমুখে হাঁটতে থাকি। এখানটায় নদীর বুনো বাতাসে প্রায় উড়ে যাবার উপক্রম হয়। গলায় পেঁচিয়ে থাকা কাশ্মিরি স্কার্ফটিকে বাতাসের কবল থেকে উদ্ধার করার একপর্যায়ে বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে ক্যারোলিন বলেন, ‘পাথর ধস হয়ে মনে হচ্ছে ভালোই হলো। না হলে এমন একটা জায়গায় আজকের এই দুপুরে হাঁটা হতো?’ মাঝে মাঝে এমন কিছু এলেবেলে ঘটনা ঘটলে আমারও মন্দ লাগে না। তবে ঘটনা হলো, এমন সব বাউণ্ডুলে কথাবার্তা শুনে এই মহিলাকে আপাত ভবঘুরে মনে হলেও গাড়িতে তাঁর যে পরিচয় পেয়েছি, তাতে বিষম খেয়েছি বেশ খানিকটা। ইনার নিবাস জার্মানির হামবুর্গ শহরে। পেশায় মস্ত উকিল। তবে আদালতে-আদালতে মামলা না লড়ে তিনি মূলত চুক্তিভিত্তিক কাজ করেন নানা বহুজাতিক কোম্পানির আইন বিভাগে। গত বছর দুবাইতে কাজ করে এসেছেন কয়েক মাসের জন্যে। এখন কাজ করছেন লন্ডনের একটি স্বাস্থ্যখাতের কোম্পানির জন্যে। তবে সেখানে তাঁর কাজের ধরনটি কী, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানার আগেই তো আমাদের গাড়িটি পড়ল কি-না সেই শৈলবৃষ্টির মুখে।

আমি সেই পুরনো কথাটির সূত্রেই এবারে জিজ্ঞেস করি, ‘তা এমন এক স্বাস্থ্য কোম্পানিতে আপনার মতো উকিলের কাজটা কি একটু বুঝিয়ে বলবেন?’ ক্যারোলিনের জুতোর মাঝে ঢুকে গিয়েছিল একটি নুড়ি পাথর। উবু হয়ে সেটিকে জুতো থেকে ঝেটিয়ে বিদেয় করার পর বলেন, ‘তুমি তো বাংলাদেশের লোক তা-ই না? আমি কিন্তু তোমার দেশের কথা জানি।’ আমি অবাক হই। বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের মাধ্যমে আমার দেশের কথা জানে কি-না সেটি জিজ্ঞেস করার আগেই আরেকটি বেশ চমকপ্রদ কথা জানতে পারি। ক্যারোলিনের কোম্পানি সরাসরি কোনো স্বাস্থ্যসেবা মক্কেলকে দেয় না। বরং এরা হচ্ছে একপ্রকার দালাল কোম্পানি। যেমন ধরা যাক, আমেরিকায় কারো হয়তো হেপাটাইটিস সি-এর ওষুধ প্রয়োজন। কিন্তু ও-দেশ থেকে কিনতে গেলে সে হয়তো ফতুর হয়ে যাবে। তখন সে দ্বারস্থ হয় এই কোম্পানির। এরা বাংলাদেশের কোনো ফার্মেসি থেকে সেই ওষুধটি আমেরিকার রোগীর ঠিকানায় পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করে। ক্যারোলিন বাংলাদেশের নামটি জানে সেভাবেই। কারণ, বাংলাদেশে খুব সুলভ মূল্যে হেপাটাইটিস সি-এর কার্যকরী ওষুধ পাওয়া যায়। ওর কোম্পানি নাকি বেশ কয়েকবার এমন ওষুধের চালান বিভিন্ন দেশে পাঠিয়েছে। একইভাবে ওরা ইংল্যান্ডের কোনো দাঁতের ব্যথায় ভোগা রোগীকে পাঠিয়ে দেয় হাঙ্গেরির দন্ত চিকিত্সকের কাছে, কিংবা স্পেনের সন্তানহীন দম্পতিকে পাঠায় ইউক্রেনের ফারটিলিটি ক্লিনিকে। তা এমন একধরনের কোম্পানিতে তাঁর কাজটি কী, এমন এক প্রশ্ন করলে যেন খুব অবাক হয়েছেন এমন ভঙ্গিতে ক্যারোলিন বলেন, ‘ওমা, বলো কী? এমন কোম্পানিগুলোতেই তো বেশি উকিল দরকার। বিভিন্ন দেশে কাজ করতে গেলে কোথাকার কোন আইনের মারপ্যাঁচে  পড়বে, তার কোনো ঠিক আছে? আমার কাজ হলো, সেসবকিছু সামলে এদের পিঠ বাঁচানো।’

পিচঢালা রাস্তা আর সেই খরবেগে বয়ে চলা নদীর মাঝে কংক্রিটের বাঁধানো বসবার জায়গা। ক্যারোলিন সেখানে হঠাত্ ধুপ করে বসে পড়ে বলেন, ‘ম্যান, নেক্সট ফিউ ডেইজ উইল বি রিয়েলি হেকটিক ফর মি।’ আমি তখন সেই টিনের বাড়ির পেছন দিকে পাইনের বন ভেদ করে উঁকি দেয়া দুটি চিমনির দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ওগুলোকে মনে হচ্ছে পরিত্যক্ত কোনো কারখানার চিমনি। সোভিয়েত সময়কালে এ-অঞ্চলে হয়তো কিছুটা কর্মচাঞ্চল্য ছিল, কিন্তু এখন এটি একেবারেই মৃতপ্রায় গ্রাম। সেই ভাবনার মাঝে ক্যারোলিনের ‘হেকটিক’ কথাটা কানে বাজায় আমি ভাবি ওকালতির কাজে বুঝি-বা তাঁকে আবার ব্যস্ত হতে হবে। ভুল ধারণা আমার। বরং এদেশে তিনি আরেক বান্ধবীসহ এসেছেন সপ্তাহব্যাপী গহিন বনের মাঝে হাইকিং-এ যাবেন বলে। তাঁর সেই সঙ্গিনীটি আজ হোটেলে অবস্থান নিয়ে আগামী ক’দিনের জন্যে শক্তি সঞ্চয় করছে। কিন্তু সেই সঞ্চয় কর্মে তেমন একটা আগ্রহ না থাকায় ক্যারোলিন আজ একাকী বেরিয়ে পড়েছেন কিছুটা প্রাক-হাইকিং হাঁটাহাঁটির জন্যে। এমন এক দুর্দান্ত পরিকল্পনার কথা জানার পর আমি ক্যারোলিনকে আবারও ভালোভাবে জরিপ করি। বাইরে থেকে দেখে ওঁ-কে কিন্তু মনে হয় তালপাতার সেপাই। কিন্তু সাতদিন বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়াবার শক্তি যাঁর আছে, তাঁর দৈহিক বল-কে কিছুতেই অবজ্ঞা করা চলে না।

বিমানবন্দরের রানওয়েতে সিগনালম্যান যে কায়দায় দু’ হাত তুলে বিমান ট্যাক্সিং-এর নিশানা দেয়, সেই কায়দায় আমাদের ড্রাইভার বহুদূর থেকে আমাদেরকে গাড়িতে ফিরে যাবার নিশানা দেয়। খুব সম্ভবত সেই দুর্যোগ শেষ হবার একটা লক্ষণ দেখা গেছে।