ড. মো. নাছিম আখতার
বুকার পুরস্কার বিজয়ী ব্রিটিশ লেখক হাওয়ার্ড জ্যাকবসন বলেন, স্মার্টফোনের ব্যবহার এবং প্রচুর পরিমাণে ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের কারণে নাটকীয়ভাবে তরুণ প্রজন্মের যোগাযোগের পদ্ধতি বদলে যাচ্ছে। এসবের কারণে তারা হারাচ্ছে বই পড়ার অভ্যাসও। জ্যাকবসন জানান, শুধু তরুণ প্রজন্মই নয়, তিনি নিজেও বইয়ের প্রতি আর তেমন মনোযোগ দিতে পারেন না। তিনি বলেন, ‘আমি আগে যে পরিমাণ বই পড়তে অভ্যস্ত ছিলাম, এখন আর পড়তে পারি না। আমার মনোযোগ চলে যায় ইলেকট্রনিক সব পর্দার দিকে। আমি সাদা কাগজ চাই, কাগজের ওপর আলো চাই।’ জ্যাকবসন বলেন, ‘আগামী ২০ বছরের মধ্যে আমরা এমন শিশুদের পাব, যারা পড়তে পারবে না।’ তথ্যমতে, পশ্চিমা বিশ্বের শিক্ষার মান অনেক নেমে গেছে। গবেষণায় প্রকাশ, গত বছর ৪৩ শতাংশ মানুষ বছরে মাত্র একটি বই পাঠ করেছে। শুধু তাই নয়, প্রতিদিনই বাড়ছে তরুণদের অনলাইনে কাটানো সময়ের হার। ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সিরা প্রতি সপ্তাহে গড়ে ১৫ ঘণ্টা অনলাইনে কাটায়।
কোন দেশ কত বেশি বই পড়ে তার বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে সবচাইতে বেশি এগিয়ে আছে ভারত। তৃতীয় অবস্থানে চায়না। বাস্তবেও এই দেশ দুটির উন্নতি চোখে পড়ার মতো। পশ্চিমা বিশ্বের গবেষণা, তথ্যপ্রযুক্তি, চিকিত্সাসহ যে কোনো খাতেই এ দুটি দেশের নাগরিকেরা এগিয়ে আছে। সুতরাং, নিঃসন্দেহে বিশ্বজয়ের সঙ্গে পড়াশোনার একটি নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে। বিজ্ঞানী টমাস আলভা অ্যাডিসন একক ও যৌথভাবে ১০৯৩টি প্যাটেন্ট তৈরি করেছিলেন। কিশোর বয়সে তিনি সকালের ট্রেনে পেপার বিক্রি করতে করতে পোর্ট হেরন থেকে ডেট্রয়েটে যেতেন। সন্ধ্যার ট্রেনে ফেরা পর্যন্ত তিনি ডেট্রয়েটের লাইব্রেরিতে বসে বই পড়তেন। তিন বছরের মধ্যে লাইব্রেরির সব বই তিনি পড়ে শেষ করেছিলেন। তিনি এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘আমি আজকে বিজ্ঞানী, কারণ আমি শুধু কিছু বই পড়িনি, আমি সম্পূর্ণ লাইব্রেরি পড়েছি।’ আজকে তিনি বেঁচে নেই, কিন্তু জাতি বা ব্যক্তিজীবনে মানুষের সফলতার দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। পড়ুয়া দেশের যে র্যাংকিংয়ের কথা বললাম, সেখানে ১ থেকে ২৯ দেশের ক্রম দেওয়া আছে। কোথাও বাংলাদেশের নাম নেই, যা জাতির পিছিয়ে পড়াকেই নির্দেশ করে।
ফেসবুকে তরুণ থেকে প্রবীণ প্রজন্ম যে সময় কাটাচ্ছে, তা নিছক আনন্দ ও চিত্তবিনোদনের জন্য। কোনো পোস্ট যদি দুই-তিন লাইনের হয়, তা তারা পড়ে দেখে। কিন্তু যদি লেখাটি দীর্ঘ হয়, তাহলে তা না পড়েই স্ক্রল করে। ফলে ভেতরে কী আছে এ সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই থাকে না। এ ধরনের জ্ঞানকে বলা হয় ‘খণ্ডিত জ্ঞান’। এই জ্ঞান প্রকৃতপক্ষে মানুষের কোনো কাজেই আসে না। পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জনের জন্য দরকার যে কোনো বিষয়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়া। এর ফলে জ্ঞানের ধারাবাহিকতা রক্ষা হয় এবং জ্ঞানের পরিপক্বতা অর্জন সম্ভব। একটি বই লিখতে গভীর জ্ঞান ও চিন্তার দরকার হয়। বই লেখার সময় লেখক বোঝেন কীভাবে লিখলে একজন পাঠকের কাছে বিষয়টি বোধগম্য হবে, বইটি থেকে কীভাবে মানুষ জ্ঞান অর্জন করবে। একটি ৩০০ পৃষ্ঠার বইয়ে শিক্ষণীয় সারমর্ম থাকে ২৫ থেকে ৫০ পৃষ্ঠা। সারমর্ম উদ্ঘাটনের জন্যও বইটিকে আদ্যোপান্ত পড়া উচিত। তখনই আসবে জ্ঞানের পূর্ণাঙ্গতা। জ্ঞানের পূর্ণাঙ্গতা ছাড়া নতুন কিছু সৃজন সম্ভব নয়। বিষয়টি আমাদের সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে।
পত্রিকায় নিয়মিত প্রবন্ধ লিখি। আমি যখন লেখা শুরু করেছিলাম, তখন সম্পাদকীয় অংশের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ আমাকে বলতেন, লেখা ৯০০ শব্দের মধ্যে রাখবেন। কারণ মানুষ বড় লেখা পড়তে চায় না। প্রায় চার বছর আমার লেখার বয়স। এখন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বলেন, লেখা ৬০০ থেকে ৭০০ শব্দের মধ্যে হলে ভালো হয়। অর্থাত্, মানুষের পড়ার ধৈর্য কমছে এটা প্রকটভাবে প্রতীয়মান। যেখানে পড়া নেই, জ্ঞানের চর্চা নেই, সেখানে উন্নত ও মেধাবী জাতি তৈরি হতে পারে না। একটা বিষয় আমাদের খুব ভালোভাবে ভাবতে হবে। তা হলো পৈতৃক জমি বিক্রি করে নিজের ভোগবিলাস বাড়ানো আর নিজের জ্ঞান বিক্রি করে সুন্দর জীবনযাপনের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। জ্ঞানবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োগে জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য যা দরকার, তা হলো পড়ার অভ্যাস বাড়ানো। সেই পড়ার অভ্যাস ফেসবুক বা টুইটারে মনোনিবেশ করে নয়, বইয়ের আদ্যোপান্ত পড়ে তার সারমর্ম উপলব্ধি করা। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য মননের বিকাশ। মানুষের মধ্যে ধৈর্য, সহ্য ও পরিশ্রমের ক্ষমতা বৃদ্ধি। কিন্তু শিক্ষাকে আমরা এমন অবস্থায় নিয়ে আসছি, যা মানুষের মধ্যে ধৈর্য তৈরি তো দূরে থাক, অধৈর্য, অশান্ত ও অনিপুণ জনগোষ্ঠীর জন্ম দিচ্ছে। শিক্ষাবিষয়ক কারিকুলাম তৈরির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গকে যদি দেখাতে পারতাম যে সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তরে শিক্ষার্থীরা কী লিখছে, তাহলে তারা হয়তো লজ্জা পেতেন। আমরা পশ্চিমা বিশ্বকে সব সময়ই বলি উন্নত। বাস্তবিক অর্থেই তারা উন্নত। সম্পদ, প্রযুক্তি ও চাকচিক্যে তারা আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। কিন্তু একটি বিষয় গভীরভাবে লক্ষ করেছেন কি? তাদের গবেষণার চালিকাশক্তি কিন্তু আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে যাওয়া মেধাবী শিক্ষার্থীরা। তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে? ওদের অর্থের কারণে সুন্দর সিস্টেম তৈরি করা আছে, যেখানে গবেষক হিসেবে কাজ করেন উন্নয়নশীল দেশের মেধাবীরা। তাই শিক্ষা বৃত্তি দিয়ে যে ছাত্রগুলোকে গবেষণার জন্য পশ্চিমারা নিয়ে যাচ্ছে, তারা তাদের নিজস্ব ছাত্রদের চেয়ে অনেক মেধাবী। তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো, অস্ট্রেলিয়ায় ডাক্তারিতে চান্স পায় সর্বোচ্চ মেধাবীরা। একটি পরিসংখ্যানমতে, সেখানে মোট ডাক্তারিতে চান্স পাওয়ার শতকরা ৯৬ ভাগ শিক্ষার্থীই চীন, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশ থেকে ইমিগ্রেশন নেওয়া। কিছুদিন আগে একটি জাতীয় দৈনিকের খবরে দেখলাম করোনাকালীন আমেরিকায় এইচ-১ বি, এইচ-২ বি, এইচ-৪, জে এবং এল ভিসার অনুমোদন গোটা বছরের জন্য বাতিল করার সিদ্ধান্ত হয়। তাদের প্রশাসন মনে করে, এতে ৫০ হাজার মার্কিন নাগরিকের চাকরি নিশ্চিত করা যাবে। কিন্তুু আমেরিকার অনেক কংগ্রেস সদস্যের মতে, এমনটি করলে মার্কিন অর্থনীতি আরো মুখ থুবড়ে পড়বে। কারণ ভিসা নিয়ে যারা কাজ করে, তারা অত্যন্ত দক্ষ মানবসম্পদ। দেশের ১৬ কোটি মানুষকে টিকে থাকতে হলে ভিশন ঠিক করে সে অনুযায়ী মিশন পরিচালনা করতে হবে।
n লেখক : অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর
