আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

বিদ্রোহী হলেই আজীবন বহিষ্কার

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ০০:৪৫

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আগামী নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ নৌকার বিরোধিতা করলে বা বিদ্রোহী হলে তাকে সংগঠন থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হবে।’ নৌকা প্রার্থীর পক্ষে সব নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আগামী নির্বাচন খুব কঠিন হবে। খুব প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। এই সময় সবার ঐক্যবদ্ধ থাকা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।’

গতকাল বুধবার সকালে গণভবনে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে নৌকা প্রতীক পেতে আগ্রহী ৪ হাজার ২৩ জনের সঙ্গে সাক্ষাত্কালে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, আওয়ামী লীগকে ঠেকানোর অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু কেউ আওয়ামী লীগকে দমাতে পারেনি। এখনও নির্বাচন নিয়ে, আওয়ামী লীগকে নিয়ে ষড়যন্ত্র চলছে। দেশের অগ্রগতির ধারা ব্যাহত করতেই এই ষড়যন্ত্র। তাই সবার সতর্ক থাকতে হবে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থেকে এই ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে হবে। দলীয় সূত্র ইত্তেফাককে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে গতকাল দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাত্ পর্ব শেষ হয়। সাক্ষাত্ পর্বে কারও সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে শেখ হাসিনার আলাপ হয়নি বলে জানান মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। এদিকে আজ বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৩টায় ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।

মনোনয়ন প্রত্যাশীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে জরিপ চালিয়েছি। এর ভিত্তিতে মনোনয়ন দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে ছোট নেতা, বড় নেতা দেখা হবে না। কোনো প্রার্থীর প্রতি ভোটারের সমর্থন আছে, সেটা বিবেচনায় নেওয়া হবে। জানা গেছে, গতকালও ৪টি জরিপ রিপোর্ট শেখ হাসিনার কাছে এসেছে। জরিপ রিপোর্ট আর মনোনয়ন প্রত্যাশীদের বায়োডাটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন শেখ হাসিনা।

‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বাসঘাতকদের দলে ঠাঁই হবে না। আওয়ামী লীগ চায় দেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ করতে। আর দেশকে এগিয়ে নিতে বিশ্বাসঘাতকদের প্রয়োজন নেই। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়া যাবে না। দল করতে হলে দলের সিদ্ধান্ত মানতে হবে। যাকে নৌকা প্রতীক দেওয়া হবে, বৃহত্তর স্বার্থে তাকে বিজয়ী করতে সব নেতাকর্মীকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। যাকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে তাকেই মেনে নিতে হবে। আপনারা কথা দিলেন? আপনারা সবাই নৌকার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ থাকবেন? যাকে নৌকা দিয়ে পাঠাব তার হয়ে কাজ করবেন?  এ সময় প্রধানমন্ত্রীর কথায় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সবাই সম্মতি জানান এবং নৌকার প্রার্থীর সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করেন।

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, যাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে তার বিরুদ্ধে কুত্সা রটাবেন না, মিথ্যাচার করবেন না। নইলে বিপদ হবে।  আমি সবার সম্পর্কে জানি। আপনাদের সব তথ্য আমাদের কাছে আছে। কারা কী করেছেন, কারা কোন দল থেকে এসেছেন সব জানি। বেশি লাফালাফি করার দরকার নেই। কোনো গ্রুপিং করারও দরকার নেই। তিনি বলেন, বর্তমান এমপিদের অবস্থান কেমন তা তিনটি প্রশ্ন করলেই পাওয়া যায়। প্রশ্নগুলো হলো, এমপি সাহেব কেমন, উত্তরে আসলো ভালো, এমপি সাহেব কেমন, উত্তরে আসলো মোটামুটি, এমপি সাহেব কেমন, উত্তরে নিশ্চুপ। জানা গেছে, এভাবেও জরিপ চালিয়েছেন শেখ হাসিনা। 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা সবাই যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ না করেন, তাহলে আগের মতো বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচনের সবার দায়িত্ব নিতে পারবো না। এবার নেত্রীকে বেটে খাওয়ালেও কাজ হবে না। আমরা আগামী নির্বাচন নিয়ে কাজ করছি না। আমরা কাজ করছি আগামী প্রজন্ম নিয়ে।’ আওয়ামী লীগের কোনো কোনো আসনে একাধিক প্রার্থী এমনকি একটি আসনে ৫২ জন মনোনয়ন প্রত্যাশী থাকার বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে  শেখ হাসিনা বলেন, এসব আসনে যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে উঠছে না। আপনারা যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করুন।

জানা গেছে, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্বনামধন্য জরিপ প্রতিষ্ঠান এবং দলের অভিজ্ঞ একাধিক টিমের মাধ্যমে কয়েক দফা মাঠ জরিপ চালিয়ে তিনশ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের জনপ্রিয়তার বাস্তবচিত্র এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ল্যাপটপে রয়েছে। নেতা-এমপি-মন্ত্রীরা যত বড় শোডাউন করুন না কেন, প্রধানমন্ত্রীর হাতেই রয়েছে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের নিজ নির্বাচনী এলাকায় সর্বশেষ অবস্থা ও বিস্তারিত আমলনামা। গত টানা ১০ বছরে কোন মন্ত্রী-এমপি বা সম্ভাব্য প্রার্থী নিজ এলাকায় কী করেছেন, জনপ্রিয়তা বেড়েছে নাকি কমেছে, অনিয়ম-দুর্নীতি কিংবা দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে কিনা, এ সকল আমলনামা রয়েছে দলীয় প্রধানের হাতে। তাই সংসদীয় বোর্ডের ধারাবাহিক বৈঠক থেকে সর্বশেষ জরিপসহ সবকিছু বিবেচনা করেই এবার আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী ঘোষণা করা হবে।

জানা গেছে, ৪ হাজার ২৩টি মনোনয়ন ফরম বিক্রিতে বিস্ময় প্রকাশ করে সভায় শেখ হাসিনা বলেন, এতে দলীয় ফান্ড সমৃদ্ধ হয়েছে। তবে সারাদেশে দল যে নেতৃত্ব শূন্যতায় ভুগছে তা এর মাধ্যমে পরিষ্কার ফুটে উঠেছে। তিনি বলেন, সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। ক্ষমতায় আসলে অনেক পদ ক্রিয়েট করা হবে, সেখানে সবাইকে একমোডেট করা হবে। তিনি আরো বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে দলের যারা ইতোমধ্যে নির্বাচিত হয়ে আছেন তাদেরকে সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হবে না। গত দুই নির্বাচনে ক্ষমতায় এনেছি, এবারো আমিই ক্ষমতায় আনবো- এটা মনে করে কোনো লাভ নেই। প্রার্থীর নিজ নিজ যোগ্যতা, দক্ষতা, রাজনৈতিক ত্যাগ-তিতিক্ষা থাকতে হবে। জনসম্পৃক্ত হতে হবে।

আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংগঠনিক পরিস্থিতি তুলে ধরতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগের সমর্থক আছে, কর্মী আছে, ভোট আছে কিন্তু ইদানীং দৃশ্যমান কর্মী নেই। ১৯৮১ সালে নেতৃত্বে এসে দলকে সংগঠিত করেছি। তিলে তিলে এই দলকে গড়ে তুলেছি। আমি, রেহানা, জয়, পুতুলসহ আমার পরিবারের সদস্যরা অনেক অসহায় সময় পার করেছি।

শরিকদের ৭৫ আসন ছেড়ে দেবে আওয়ামী লীগ

গণভবনে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাত্ শেষে বিকাল ৩টায় ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘গণভবনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাত্কার নেওয়া হয়েছে। সেখানে আমাদের দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, একজনকে নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন দেওয়া হবে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দলীয় ও নৌকার প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে হবে। দলীয় প্রার্থীর বিরোধিতা করলে সঙ্গে সঙ্গেই আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হবে।’

ওবায়দুল কাদের আরো বলেন, মহাজোটের শরিকদের ৭৫টি আসন ছেড়ে দেওয়া হবে। জাতীয় পার্টিসহ (জাপা) মহাজোটের শরিকদের তালিকা অনেক আগেই পেয়েছি। আমাদের দলের তালিকা চূড়ান্ত করছি। এরপর শরিকদের সঙ্গে বসবো। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শরিকদের প্রত্যাশা অনেক। অ্যালায়েন্সের (জোট) বিষয়টি আমরা মাথায় রেখেছি। অল্পদিনের মধ্যেই তাদের সঙ্গে বসে মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হবে। আরেক প্রশ্নের জবাবে কাদের বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনের পদে থেকে যারা আবেদন করেছেন তারা মনোনয়ন পাবেন না। বিশেষ কোনো প্রয়োজন ছাড়া দল তাদের মনোনয়ন দেবে না।

অশনি সংকেত দেখতে পাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমি একটি অশনি সংকেত দেখতে পাচ্ছি, একটি চক্রান্ত দেখতে পাচ্ছি। এই দেশকে নিয়ে আবার খেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। ওই যে পরাজিত শক্তি, যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ক্ষমতায় এসে এ দেশের বিজয়কে ছিনিয়ে নিয়েছিল, যারা বারবার চেষ্টা করেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে, তারা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

প্রধানমন্ত্রী মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, বিএনপির দাবির মুখে নির্বাচনের তারিখ পেছালেও তারা আবারও পেছানোর দাবি তুলেছে। এটার পেছনে নিশ্চয়ই ষড়যন্ত্র রয়েছে। তারা কখন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ায়, তারও ঠিক নেই। তাই সাবধান থাকবেন, বিএনপি যেন দেশের জন্য ক্ষতিকর কিছু করতে না পারে। আবারও জ্বালাও-পোড়াও করতে না পারে। আর সবার প্রতি অনুরোধ, নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিকে ক্ষমতায় আসার পথ সুগম করে দেবেন না। আগামী নির্বাচনকে দলের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে এই নির্বাচন কোনো অবস্থাতেই অবহেলার চোখে না দেখার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ঘরে ঘরে গিয়ে নৌকার পক্ষে ভোট চাইতে হবে। কোনো রকম অবহেলা করলে ১৯৯১ ও ২০০১ সালের নির্বাচনের মতো হারতে হতে পারে। তার প্রাণনাশের চেষ্টায় বার বার হামলার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মৃত্যুকে আমি ভয় করি না। যতক্ষণ বেঁচে থাকব দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে কাজ করে যাব।

বৈঠক সূত্র জানায়, অনানুষ্ঠানিক এই সাক্ষাত্ অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৫ আগস্টের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, পরিবারের সবাইকে হারিয়ে দিনরাত কষ্ট করে দেশকে আজ এ পর্যায়ে এনেছি। তাই আগামী নির্বাচন সামনে রেখে আমাদের সিদ্ধান্ত যদি আপনারা (মনোনয়ন প্রত্যাশী) না মানেন, তবে আমার চলে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। এ সময় হাজার হাজার মনোনয়ন প্রত্যাশী নিজ আসনে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার শপথ নেন।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী কবি জীবনানন্দ দাশের ‘আবার আসিব ফিরে’ এবং কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘ছাড়পত্র’ কবিতার কয়েকটি লাইন আবৃত্তি করে শোনান।

অনুষ্ঠানের শুরুতে সূচনা বক্তব্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে কেউ যদি দলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেন, দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে দল মনোনীত প্রার্থীর বিপক্ষে কাজ করেন তবে এবার আর রক্ষা নেই।