যেভাবে শান্তি ফিরছে ভারত-চীন সীমান্তে

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:৩২

তালেব রানা

 

টানা কয়েক মাস ধরে উত্তেজনা বাড়তে থাকার পর হিমালয় সীমান্তে শান্তি ফেরাতে সম্মত হয়েছে ভারত-চীন। রাশিয়ার মধ্যস্থতায় গত বৃহস্পতিবার মস্কোতে বৈঠকে বসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। বৈঠকের পর দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সীমান্তে ‘শান্তি ও স্থিতিশীলতা’ ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে পাঁচটি বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ। এগুলোর মধ্যে আছে সীমান্তে সম্মুখসারির সেনা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সব চুক্তি ও প্রোটোকল মেনে চলা, শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কাজ করা এবং উত্তেজনা তৈরি করে এমন সব কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকা।

বিবিসিতে বিকাশ পাণ্ডের লেখা এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, মস্কোতে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ম্যারাথন বৈঠকের পর এই যৌথ ঘোষণা এসেছে। পরমাণু শক্তিধর দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের মধ্যেই এ সিদ্ধান্ত এসেছে। কয়েক দিন আগেই এক সম্পাদকীয়তে চীনা সরকারের মুখপত্র গ্লোবাল টাইমস জানায়, ভারতের সঙ্গে যে কোনো আলোচনায় ‘যুদ্ধ প্রস্তুতি’ নিয়ে কথা বলা উচিত। কূটনৈতিক বৈঠক ব্যর্থ হলে চীনকে অবশ্যই সামরিক পদক্ষেপ নিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকতে হবে। চীনের সম্মুখভাগের সেনারা যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম হয় এবং যে কোনো সময় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকে সেই বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। অন্যদিকে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষা নিয়ে সন্দেহ করা উচিত হবে না। গত শুক্রবার ভারতের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল বিপিন রাওয়াত প্রতিরক্ষাবিষয়ক সংসদীয় স্টান্ডিং কমিটিকে বলেন, যে কোনো পরিস্থিতির জন্য ভারতের সেনাবাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। তিনি বলেন, সেনাবাহিনী সতর্ক রয়েছে এবং চীনের যে কোনো পদক্ষেপের জবাব দিতে প্রস্তুত।

দুই পক্ষের এ ধরনের বক্তব্যে বোঝা যায়, দুই পক্ষের সেনারা মুখোমুখি অবস্থানে ছিল। গত ১৫ জুন হিমালয়ের পশ্চিমাঞ্চলে লাদাখের গালওয়ান ভ্যালিতে চীন ও ভারতের সেনাদের মধ্যে খালি হাতে মারামারিতে ২০ ভারতীয় সেনা নিহত হন। চীন তাদের সেনাদের হতাহত হওয়ার কথা স্বীকার করলেও সংখ্যা প্রকাশ করেনি। তাহলে এ উত্তেজনা কীভাবে প্রশমিত হলো? বিবিসির ঐ নিবন্ধে সেই উত্তর খোঁজার চেষ্টা হয়েছে। থিংক ট্যাংক উইলসন সেন্টারের উপপরিচালক মাইকেল কুগেলম্যানসহ অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, দুই পক্ষই সংঘাতে জড়াতে প্রস্তুত ছিল। তবে তারা বুঝতে পেরেছেন এ ধরনের সংঘাত দুই দেশ ও এই অঞ্চলের জন্য বিপর্যয়কর হবে। এই যুদ্ধে আর্থিক ক্ষতিও হবে অনেক।

হঠাত্ এই ‘বরফ গলার’ বিষয়ে কুগেলম্যান মনে করেন, এস জয়শঙ্কর চীনে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে বেশ কয়েক বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। চীনের কূটনীতিকদের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্ক সমঝোতার ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারে। এতেই হয়তো বরফ গলেছে। কুগেলম্যানের মতে, কঠিন, গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আলোচনার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্ক অনেক সময় ভূমিকা রাখতে পারে। আরেকটি অসম্ভাবনীয় উপাদানও এক্ষেত্রে কাজ করতে পারে। তা হলো—শীতের সময় গালওয়ান ভ্যালির দুটি ঢালু অংশের সংযোগস্থলে উত্তোলিত রেখা (রিজ) মানুষের থাকার জন্য উপযোগী থাকে না।

ভারতের সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) বিনোদ ভাটিয়া বলছেন, এ সময়ে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কাজ করতে হয় সেনাদের। এক্ষেত্রে হয়তো, দুই পক্ষের সেনাবাহিনী এ প্রতিকূলতা এড়াতে চায়। বিভিন্ন খবরে বলা হচ্ছে, ভারতীয় সেনারা সম্প্রতি কয়েকটি রিজ দখলে নিয়েছে। যেখান থেকে চীনা পোস্টগুলো ওপর থেকে দেখতে পাওয়া যায়। সরকারিভাবে এ খবরের সত্যতা পাওয়া যায়নি। তবে আলোচনার ক্ষেত্রে ভারত এ বিষয়টিকে দরকষাকষির টুলস হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। দুই দেশের জন্য আরো কিছু সংকট থাকতে পারে। ভারতে কোভিড-১৯-এর সংক্রমণ আতঙ্কজনক হারে বাড়ছে। সংকটের মুখে পড়েছে অর্থনীতিও। যে কোনো সশস্ত্র সংঘাত এসব ইস্যু মোকাবিলায় ভারতের সামর্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা বেড়েছে চীনের। হংকংয়ে নিরাপত্তা আইন জারি করায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নিন্দার মুখে পড়েছে দেশটি। 

কত দ্রুত শান্তি ফিরবে সেটা নিশ্চিত করে বলছে পারছেন না বিশ্লেষকরা। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক স্টিমসন সেন্টারের চীনা প্রোগ্রামের পরিচালক ইয়ুন সান বলছেন, যৌথ বিবৃতিতে অনেক বিষয় বিস্তারিত নেই। তা এখনই সবকিছু ঠিক হচ্ছে সেটা বলা সত্যিই কঠিন। কুগেলম্যান বলছেন, এলএসিতে বিরোধ কয়েক দশকের। কয়েক দিনে এর সমাধান হবে না। তবে সমাধানের পথে এটি ভালো সূচনা হতে পারে। কোনো আলোচনা না হওয়ার চেয়ে কিছু আলোচনা ভালো লক্ষণ। আমাদের সতর্কভাবে আশাবাদী হতে হচ্ছে।