দালানকোঠা নির্মাণসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নে ইটের ব্যবহার চলিয়া আসিতেছে বহুকাল ধরিয়া। কিন্তু এই ইট পুড়াইতে জ্বালানি হিসাবে লক্ষ লক্ষ টন কাঠ ও কয়লা পোড়ানো হয়। ইহাতে যে গ্রিন হাউজ গ্যাস তৈরি হয়, তাহা আমাদের পরিবেশ ও প্রতিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। সনাতন পদ্ধতিতে ইট তৈরির জন্য মাটির সংস্থান করিতে গিয়া ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের ভূমি (টপ সয়েল) তথা উর্বর কৃষিজমি নষ্ট হয়। এই জন্য ইটের বিকল্প হিসাবে কংক্রিট ব্লক উত্পাদন ও ব্যবহারের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হইতেছে বহুদিন ধরিয়া। কিন্তু এই ধারণা কার্যকর করা যাইতেছে না কেন, ইহাই বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশ পরিবেশ রক্ষা ও টিকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবত্সরের মধ্যে সরকারি স্থাপনায় ইটের ব্যবহার শূন্যের কোঠায় নামাইয়া আনিবার লক্ষ্য নির্ধারণ করিয়াছে সরকার। কিন্তু ব্লকশিল্প উত্পাদন ও বিকাশে আমাদের কোনো অগ্রগতি পরিলক্ষিত হইতেছে না।
দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশ সনাতন পদ্ধতির ইটভাটা বন্ধ করিয়া দিয়াছে। চীন ও ভারতও সনাতন ইট ব্যবহার হইতে সরিয়া আসিয়াছে। বাংলাদেশও একই লক্ষ্যে ২০১৩ সালে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন প্রণয়ন (যাহা ২০১৯ সালে সংশোধিত) করে, যাহার উদ্দেশ্য হইতেছে ব্লক কারখানাকে এই দেশে উত্সাহিত করা। এখন আর নূতন করিয়া ইটভাটা স্থাপনের লাইসেন্স দেওয়া হইতেছে না। উপরন্তু লাইসেন্স না লইয়াও কংক্রিট ব্লক কারখানা স্থাপন করা যায়। বলা হইতেছে, ইটের বিকল্প হিসাবে ব্লক শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী, দামে সস্তা ও পরিবেশবান্ধব। এত উপকার থাকিবার পরও মানুষ কেন ইহাকে গ্রহণ করিতেছেন না? প্রকৃতপক্ষে ইটভাটায় মাটি পুড়াইয়া তৈরি করা হয় ইট। আর আগুনে না পুড়াইয়া মাটি, সিমেন্ট বা অন্য কোনো ম্যাটারিয়াল দিয়া কারখানায় তৈরি করা হয় ব্লক। বাংলাদেশে মাত্র ৫০-৬০টি কোম্পানি ব্লক তৈরি করে। অথচ বেসরকারি হিসাবে ইটভাটাই আছে প্রায় আট হাজার। ব্লক কারখানা না বাড়িবার মূল কারণ হইল কাঁচামালের সংকট। সিমেন্ট ব্যবহার করিলে দূষণের আশঙ্কা আছে, যাহাতে খুব লাভ হইবে না। আবার আমদানিকৃত সিমেন্ট ব্যবহার করিলে খরচ বাড়িবে। তবে পাথর, নদীতে ড্রেজিং করিয়া তোলা বালু বা মাটি, ককশিট, নির্দিষ্ট মাত্রায় সিমেন্ট ইত্যাদি কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহার করিলে তাহা লাভজনক হইতে পারে।
ব্লক কারখানার উদ্যোক্তারা এই শিল্প বিকাশে কয়েকটি প্রতিবন্ধকতার কথা বলিতেছেন। যেমন—এই শিল্পে রহিয়াছে দক্ষ কর্মীর অভাব, ঋণপ্রাপ্তির অনিশ্চয়তা, প্রশিক্ষণ ও সরকারের পক্ষ হইতে প্রচার-প্রচারণার অভাব, দামে সস্তার কথা বলা হইলেও বাস্তবে তাহা সুলভ নহে, হলো ব্লক, সলিড ব্লক ও থার্মাল ব্লকসহ বেশ কয়েকটি ব্লকের দাম হাতের নাগালে নাই, আইন করিলেও আইনের প্রয়োগ নাই, ইটভাটার লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়া থামিয়া নাই ইত্যাদি। আবার সরকার আগামী কয়েক বত্সরের মধ্যে সরকারি স্থাপনায় সনাতন ইটের ব্যবহার শতভাগ শূন্যের কোঠায় নামাইয়া আনিবার যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছে তাহা সাধুবাদযোগ্য হইলেও এই ব্যাপারে নাই বাস্তবমুখী পদক্ষেপ। অতএব, সরকারি প্রকল্পগুলি কংক্রিট ব্লক ব্যবহার করিয়া উপকৃত ও লাভবান হইলে বেসরকারি উদ্যোক্তারাও নিঃসন্দেহে তাহার অনুসরণ করিবেন।
