ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম
দেখা যাচ্ছে, বিশেষজ্ঞরা করোনার বিপরীতে মানুষের হার্ড ইমিউনিটির ওপর নজর রাখছেন। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিষয়টির ওপর কম গুরুত্ব দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে। গবেষণায় আরো দেখা যাচ্ছে, করোনাসহ সব মহামারির সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের যোগসূত্র রয়েছে। মানবজাতি কর্তৃক প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণে পরিবেশ বিপর্যয়ের গুরুত্ব না দেওয়ায় প্রকৃতির ভারসাম্যহীনতা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, একটি দাঁড়িপাল্লার এক পাশে পুরো পৃথিবী, অন্য পাশে অনেকগুলো গোল্ডবার রাখা হলো। এমতাবস্থায় মানুষকে যদি বলা হয়, গোল্ডবার অথবা পৃথিবী—এ দুটির যে কোনো একটি পছন্দ করতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই মানুষ গোল্ডবারের দিকে নজর দেবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, মানুষ কখনো চিন্তাই করবে না যে পৃথিবী না থাকলে কখনো গোল্ড উত্পন্নই হবে না। এইভাবে মানুষ ‘পরিবেশ বিপর্যয়’ প্রতিনিয়ত উপেক্ষা করে প্রাকৃতিক সম্পদ সংগ্রহে মগ্ন। ফলশ্রুতিতে প্রাকৃতিক সম্পদের ভারসাম্যহীনতা জলবায়ু পরিবর্তনকে উত্সাহিত করতে দেখা যাচ্ছে।
আজ জলবায়ু পরিবর্তনে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন হুমকির সম্মুখীন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনে সমগ্র পৃথিবীতে মানুষ পানিদূষণ, বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পুষ্টিকর খাবারের অভাবসহ বিভিন্ন ধরনের মহামারির সম্মুখীন হচ্ছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি লাগামহীনভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নত দেশের তুলনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যে উপস্থাপিত তত্ত্ব-উপাত্ত বিশ্লেষণে বলা যেতে পারে যে জলবায়ু পরিবর্তনে আগামী ২০২০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে বছরে ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ স্বাভাবিক হিসাবের চেয়ে অতিরিক্ত মারা যাবে। তার মধ্যে বেশির ভাগ মানুষই পুষ্টিহীনতা, ডায়রিয়া, ম্যালেরিয়া ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে মারা যাবে। ফলে স্বাস্থ্য খাতে বছরে ২-৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে কার্ডিওভাস্কুলার ও শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত রোগের প্রাদুর্ভাবও বেড়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে বয়স্ক মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে বায়ুতে দূষিত উপাদান, পোলেনসহ অন্যান্য ক্ষতিকর পদার্থের উপস্থিতি দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। এতে মানুষ অ্যাজমা ও শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত জটিল রোগের শিকার হচ্ছে। অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বৃষ্টিপাতের প্যাটার্নও পরিবর্তন হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বছরে প্রায় ৬০ হাজারের ওপরে অতিরিক্ত লোক মারা যাচ্ছে। এমতাবস্থায় একুশ শতকে সমগ্র পৃথিবীতে বন্যা, খরা ও সাইক্লোনের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পৃথিবীতে সব প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য অজৈব উপাদানের গুরুত্ব অপরিসীম। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত, বাতাসসহ সব অজৈব উপাদানের সঙ্গে প্রাণিকুলের যোগসূত্র রয়েছে। বন্যপ্রাণীসহ সব প্রাণীই বেঁচে থাকার জন্য নির্দিষ্ট মাত্রার অজৈব উপাদানের উপস্থিতিতে টেকসই জীবন যাপন করে থাকে। যদি জলবায়ু পরিবর্তনে অজৈব উপাদানসমূহ সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি বা কম বিদ্যমান থাকে, তাহলে প্রাণীসমূহ তাদের নির্দিষ্ট বাসস্থান থেকে অন্যত্র স্থানান্তরের চেষ্টা করে।
যা হোক, বিজ্ঞানসম্মতভাবে দেখা যাচ্ছে যে প্রতিটি প্রাণীরই বেঁচে থাকার জন্য ইকোসিস্টেমের গুরুত্ব অপরিসীম। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনে প্রাণিকুলের বেঁচে থাকার জন্য ইকোসিস্টেম ব্যাপক বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে যে করোনা ভাইরাসটি বন্যপ্রাণী থেকে মানুষের শরীরে স্থানান্তরিত হয়েছে। অনেকের মতে, ভাইরাসটি চীনের উহান প্রদেশের বন্যপ্রাণী বেচাকেনার জন্য অনুমোদিত ওয়েট মার্কেটের সাপ অথবা বাদুড় থেকে মানুষের দেহে প্রবেশ করেছে। আবার অন্য তথ্যে দেখা যাচ্ছে যে ভাইরাসটি পেঙ্গুলিন থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাচ্ছে, মাইগ্রেটরি পাখিসমূহই অ্যাবিএন ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ অন্যান্য ভাইরাসের মানুষের শরীরে স্থানান্তরে ভূমিকা রেখেছে।
প্রকৃতিতে প্রাণিকুলের বেঁচে থাকার জন্য জৈব ও অজৈব উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত সহনশীল স্বাস্থ্যসম্মত ইকোসিস্টেমের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। অজৈব ও জৈব উপাদানসমূহের ভারসাম্যহীনতার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবই দায়ী। মোটা দাগে বলা যেতে পারে যে জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট প্রকৃতির ভারসাম্যহীনতার কারণে বন্যপ্রাণী তাদের বাসস্থান পরিবর্তন করে মানুষের সংস্পর্শে চলে আসে। এমতাবস্থায় মানুষের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বন্যপ্রাণীর তুলনায় কম হওয়ায় করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে মানুষ অতি সহজেই মৃত্যুর শিকার হচ্ছে।
বন্যপ্রাণীর টেকসই জীবন যাপনের জন্য জৈব বৈচিত্র্যেরও গুরুত্ব রয়েছে। আবার জৈব বৈচিত্র্য ইকোসিস্টেম সার্ভিসের ওপর নির্ভর করে। বৈচিত্র্যময় জীবের উপস্থিতিতে প্রাণিকুলের মধ্যে পরিপূর্ণ খাদ্যশৃঙ্খল দৃশ্যমান থাকতে দেখা যায়। যদি কোনো এক প্রাণী পরিবেশ থেকে বিলুপ্ত হয়, তাহলে প্রাণীসমূহের খাদ্যশৃঙ্খলের মধ্যে খাদ্যের ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে বিলুপ্ত প্রাণীর অনুপস্থিতিতে অন্যান্য প্রাণীর খাদ্যশৃঙ্খলের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা পরিলক্ষিত হয়। এভাবে যদি একের পর এক প্রাণী পরিবেশ থেকে বিলুপ্ত হতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে দেখা যাবে যে জীবিত অনেক প্রাণীই উপযুক্ত খাদ্য ও বাসস্থানের অভাবে নিজস্ব পরিবেশ পেরিয়ে অন্য পরিবেশে চলে আসার চেষ্টায় ব্রত থাকবে। প্রাণীসমূহের বিলুপ্তের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবই বিদ্যমান।
বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে জৈব বৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় করোনা ভাইরাসের আগমনের বিষয়টিও উড়িয়ে দেওয়া যায়নি। ভবিষ্যতে করোনা ছাড়া অন্যান্য মহামারিও দেখা দিতে পারে। চলমান করোনার মহামারি থেকে পরিবেশ বিপর্যয়ের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নজরে আনা উচিত। জলবায়ু পরিবর্তন মানবজাতি কর্তৃক কার্যক্রমের ফলাফল। আজ এই জলবায়ু পরিবর্তনে গোটা পৃথিবীর পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়ন, বনায়ন ধ্বংস, জমিতে যত্রতত্র সার ও কীটনাশক প্রয়োগ, বন্যপ্রাণী শিকার, জমিতে অপরিকল্পিত শস্য পরিবর্তন এবং জলাশয় ভারাটসহ বিভিন্ন কারণে জলবায়ু পরিবর্তন দিনে দিনে বেড়েই চলছে।
এমতাবস্থায় পরিবেশ বিপর্যয়ের গুরুত্ব অনুধাবন করে জলবায়ু পরিবর্তন কমানোর ওপর বিশেষ নজর দেওয়া উচিত। তাছাড়া জাতিসংঘের এজেন্ডা অনুযায়ী নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম ও উন্নত দেশে পরিণত হতে হলে জলবায়ু পরিবর্তন কমানোর ওপর বিশেষ নজর দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে, প্রতিটি দেশে পরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়নসহ বনজ সম্পদ বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট ম্যানগ্রোভ বনায়নসহ অন্যান্য বনায়নের ওপরও গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। তাছাড়া উদ্যোক্তাদেরও শিল্পায়ন ও নগরায়ণ বৃদ্ধির সময় পরিবশে বিপর্যয়ের বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন কমানোর ওপর নজর দিতে হবে।
যা হোক, যে কোনো দেশের পরিবেশ বিপর্যয়ের বিষয়ে সরকারের পাশাপাশি জনগণকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সমগ্র বিশ্বকে একই ফ্রেমে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আবার আঞ্চলিকতার দিক দিয়েও প্রতিটি দেশের সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে ১ কোটির ওপর গাছ লাগিয়েছেন, যা জলবায়ু পরিবর্তন কমিয়ে পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশ পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হুমকির সম্মুখীন। উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসরত মানুষ প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৬০০ পরিবারকে জলবায়ু পরিবর্তনে টেকসই বাড়ি হস্তান্তর করেছেন। ভবিষ্যতে উক্ত আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে আরও ৪ হাজার ৪০৯ জন ক্লাইমেট রিফিউজিকে পুনর্বাসন করার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন। সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত সংসদ অধিবেশনে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী বলা যেতে পারে, ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনে ১৯টি জেলার ৭০টি উপজেলার প্রায় ৪ কোটি মানুষ তাদের নিজস্ব এলাকা থেকে অন্যত্র স্থানান্তরিত হতে পারে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আরো বলেছেন, সম্প্রতি জলবায়ু পরিবর্তনে তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ৫ থেকে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়েছে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগে উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত লবণাক্ততার প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মোটা দাগে বলা যেতে পারে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণের নিমিত্তে সারা বিশ্বে প্রশংসার দাবি রাখেন।
n লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
