বাংলাদেশ তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী: প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:২০

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশ তুরস্কের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো জোরদারে আগ্রহী। আংকারায় নবনির্মিত বাংলাদেশ চ্যান্সেরি (দূতাবাস) কমপ্লেক্সের ভার্চুয়াল উদ্বোধনকালে গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ তুরস্কের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। আমরা দুই দেশের জনগণের স্বার্থে এই সম্পর্ককে আরো এগিয়ে নিতে চাই।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও তুরস্কের সম্পর্কের শিকড় ইতিহাস, বিশ্বাস ও ঐতিহ্য এবং পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে অনেক গভীরে প্রোথিত। অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কভুসোগলু তুরস্কের রাজধানী আংকারার ঐ কমপ্লেক্সে উপস্থিত ছিলেন। আংকারায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম আল্লামা সিদ্দিকী অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ দেন। এ উপলক্ষ্যে চ্যান্সেরি কমপ্লেক্সের ওপর একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস, প্রেস সচিব ইহসানুল করিম, আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ গণভবন প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন।

প্রায় ৫০ বছর আগে ১৯৭৪ সালে স্থাপিত দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, যদিও তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির ১৩ শতকে বাংলা জয়ের ফলে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরো অনেক আগেই স্থাপিত হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ঐতিহাসিক এই সম্পর্ক উদ্যাপন অনুষ্ঠানে আমি ২০১২ সালের ১৩ এপ্রিল তুরস্কের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের আমন্ত্রণে আংকারা সফরের কথা উত্ফুল্ল চিত্তে স্মরণ করছি।’

প্রধানমন্ত্রী চলমান রোহিঙ্গা সংকটে সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করায় তুরস্ক সরকারকে ধন্যবাদ জানান এবং ভবিষ্যতে এই সংকট সমাধানে আরো সহযোগিতার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসার পর ইতিমধ্যে তিন বছর পার হয়ে গেছে এবং তাদের অবশ্যই ফিরে যেতে হবে। আমি মনে করি, তুরস্ক এ ব্যাপারে ভূমিকা পালন করতে পারে।’

শেখ হাসিনা বলেন, রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১ অর্জনে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী আরো অনেকগুলো কূটনৈতিক অফিস স্থাপন করছে, আর এর মাধ্যমে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। আংকারায় এই স্থায়ী দূতাবাস কমপ্লেক্স তুরস্কের সঙ্গে বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো জোরদারে বাংলাদেশ যে অগ্রাধিকার দিচ্ছে তার প্রমাণ। তেমনি ঢাকায় সম্প্রতি নির্মিত তুর্কি দূতাবাসও সম্পর্ক জোরদারে তুরস্কের আগ্রহের প্রমাণ। তিনি বলেন, ‘আমি আশা করছি, চলমান মুজিববর্ষে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের উপস্থিতিতে শিগিগরই ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে তুরস্কের দূতাবাস ভবনের উদ্বোধন করা হবে।’

প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও তুরস্কের সহায়তায় বাংলাদেশ দূতাবাসের এই কমপ্লেক্সের নির্মাণ সম্পন্ন করতে দুই বছরেরও কম সময় লেগেছে। দূতাবাস কমপ্লেক্সে লাল রঙের ইট বাংলাদেশি স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরবে। ভবনটি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি আবক্ষ ভাস্কর্য ও একটি শহিদ মিনার ধারণ করে আছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি এটা জানতে পেরে খুব খুশি যে এই কমপ্লেক্সে চমত্কার একটি মিলনায়তনসহ সব ধরনের সুবিধা রয়েছে।

বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস মহামারি সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, কোভিড-১৯ মহামারির কারণে বিশ্ব জুড়ে বেশির ভাগ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অর্থনীতি বিপর্যস্ত হওয়ায় বিশ্ব এক কঠিন সময় পার করছে। বাংলাদেশে আমরা সফলভাবে এ ভাইরাসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছি। শেখ হাসিনা মারাত্মক মহামারি মোকাবিলায় সাফল্যের জন্য তুর্কি নেতৃত্বের প্রশংসা করে বলেন, ‘বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে এর চিকিত্সা সরবরাহ পাঠানোর উদ্যোগের আমিও প্রশংসা করি।’

প্রধানমন্ত্রী তুর্কি ভাষায় প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীর ইভার্শন উদ্বোধন করেন।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তৃতায় বলেন, তুরস্ক ও বাংলাদেশের ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্কের শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। তিনি বলেন, ‘আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামে ভারত উপমহাদেশের মানুষের দ্ব্যর্থহীন সমর্থনের কথা আমরা সব সময় স্মরণ করি।’ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যাপক সাফল্যের প্রশংশা করে তিনি বলেন, একটি স্থিতিশীল অর্থনীতি নিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় একটি সাফল্যের গল্প। তিনি বলেন, ‘শক্তিশালী অর্থনীতি এবং বিপুলসংখ্যক যুব জনসংখ্যা নিয়ে বাংলাদেশ হবে এশিয়ায় আমাদের অন্যতম প্রধান অংশীদার।’

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার এক বিপুল জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের বদান্যতার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং তার ও তুরস্কের ফাস্ট লেডির রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনের কথা স্মরণ করেন।

আংকারায় বাংলাদেশ চ্যান্সেরি কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজ ৩ সেপ্টেম্বর সফলভাবে শেষ হয়। কমপ্লেক্সটির মূল বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে চ্যান্সেরি বিল্ডিং, দূতাবাসের আবাসিক ভবন, ২২৯ আসনের ‘বিজয় একাত্তর’ নামক হাইটেক অডিটোরিয়াম, স্বয়ংক্রিয় যান্ত্রিক ও বৈদ্যুতিক সিস্টেম, মসজিদ, জিমনেসিয়াম, বাংলাদেশি আইটেমের জন্য প্রদর্শনকেন্দ্র, বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ ও আর্থসামাজিক বিকাশের ওপর রেফারেন্স বইসহ প্রন্থাগার।