ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিক ফেডারেশনের (আইডিএফ) হিসেবে বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি ডায়াবেটিক রোগীর প্রতি তিনজনে একজন ডায়াবেটিস জনিত অন্ধত্বের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সচেতনতার অভাবে, ডায়াবেটিস আছে এমন লোকজনের মধ্যে অর্ধেকই জানেন না যে তাদের ডায়াবেটিস রয়েছে। ফলে প্রতিবছরই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডায়াবেটিসজনিত অন্ধত্ব এবং অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু। গত বুধবার রাতে রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি রেফারেল নেটওয়ার্ক তৈরি’ শীর্ষক প্রকল্প উদ্বোধন ও চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি এবং অরবিস ইন্টারন্যাশনাল যৌথ উদ্যোগে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
প্রকল্পের অংশ হিসেবে অরবিস ইন্টারন্যাশনাল এবং বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি (বাডাস) গোপালগঞ্জ, বগুড়া, নেত্রকোণা ও শেরপুরে ডায়াবেটিস রোগ ও ডায়াবেটিসজনিত চোখের সমস্যা নির্ণয়ে ৪০০ কমিউনিটি স্বাস্থ্য ক্লিনিকগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, জেলা পর্যায়ে ৪টি ডায়াবেটিস হাসপাতালে প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ তৈরিসহ জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধিতে ৬০টি আউটরিচ ক্যাম্প স্থাপন করবে। পাশাপাশি ডায়াবেটিসজনিত চোখের রোগের প্রয়োজনীয় চিকিত্সা ও ফালো-আপের জন্য গোপালগঞ্জের শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, বগুড়া স্বাস্থ্যসেবা হাসপাতাল ও ময়মনসিংহের ডা. কে. জামান বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালে রেফার করা হবে।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিক সরকারি এক জরিপে (স্টেপস-২০১৮) দেখা গেছে, দেশের প্রাপ্ত বয়স্কদের ৬ দশমিক ৪ শতাংশ অর্থাত্ ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে ৭৬ লাখের বেশি মানুষই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এ ছাড়া আরও কয়েক লাখ শিশু জন্মগতভাবে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা প্রায় ১০ দশমিক ১ মিলিয়ন বা ১ কোটি ১ লাখ যাদের ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন বা ২৫ লাখ ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথিতে আক্রান্ত। পাশাপাশি, প্রতিবছর বাংলাদেশে ০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুর মধ্যে প্রায় ৩ হাজার নতুন করে ডায়াবেটিকে আক্রান্ত হচ্ছে।
অসচেনতার কারণে ডায়াবেটিকে আক্রান্ত শিশুদের কেউ কেউ দৃষ্টিহীন আবার অনেকে ভুগছে চোখের মারাত্মক জটিলতায়। অরবিস ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতিসহ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীরা ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিতকরণ ও সুচিকিত্সার জন্য গৃহীত কার্যক্রমকে স্বাগত এবং সরকারি সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, অসচেতনতা ও প্রচারের অভাবে এখনো ডায়াবেটিসে আক্রান্ত বেশিরভাগ ব্যক্তি চোখের চিকিত্সা করাচ্ছেন না। অথচ ৭০ ভাগ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির অন্ধ হাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তিনি ডায়াবেটিসজনিত চক্ষু স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়তে নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার সুপারিশ করার পাশাপাশি এই রেফারেল নেটওয়ার্ক তৈরিতে সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে পূর্ণ সমর্থন এবং সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক এ কে আজাদ খান ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি চোখের চিকিত্সায় এই কর্মসূচি গ্রহণের জন্য অরবিসকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, দেশব্যাপী ৫৪টি বাডাস হাসপাতালে ডায়াবেটিস রোগীর চক্ষু পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিত্সা দিতে চক্ষু চিকিত্সা সেবাকে সমন্বয় করা জরুরি। যেন ডায়াবেটিসের চিকিত্সা নিতে আসা রোগীরা একই সাথে চোখের পরীক্ষা করাতে পারেন। এতে করে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথিজনিত অন্ধত্ব প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে সভা-প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন অরবিস ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা. মুনীর আহমেদ। সঞ্চালনা করেন প্রোগ্রাম ডিরেক্টর মোহাম্মদ আলাউদ্দিন। আরো বক্তব্য রাখেন গোপালগঞ্জের শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের পরিচালক প্রফেসর ডা. সাইফুদ্দিন আহমেদ, সিবিএইচসির লাইন প্রতিনিধি এনসিডিসির লাইন ডিরেক্টর নূর মোহাম্মদ, স্বাস্থ্য অধিদফতরের এডিজি প্রফেসর এএইচএম এনায়েত হোসেন প্রমুখ।
