সুধীর সাহা
ভারত-চীন সীমান্তে উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে পঞ্চমুখী পরিকল্পনায় সম্মত হয়েছে ভারত ও চীন। গত ১০ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার রাজধানী মস্কোয় অনুষ্ঠিত হয় একটি উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠক। বৈঠকের পর সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা পুনঃস্থাপনে সম্মত হয়েছে উভয় দেশ। গত চার মাস ধরে ভারত-চীন সীমান্তের পূর্ব লাদাখে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) বরাবর উত্তেজনা হ্রাস করতে সম্মত হয়েছে দুটি দেশ। গত মে মাসের গোড়ার দিক থেকে এলএসি বরাবর বেশ কয়েকটি জায়গায় ভারত ও চীনের সেনা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। গত ৭ সেপ্টেম্বর ৪৫ বছরের মধ্যে প্রথমবার ভারত-চীন সীমান্তে শূন্যে গুলি চালিয়েছিল উভয় দেশের সেনারা। এখন একটি যুদ্ধ যুদ্ধ পরিস্থিতিতে গত ১০ সেপ্টেম্বর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র মধ্যে দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি দুই দেশের শান্তি স্থাপনে কতটুকু ফলপ্রসূ হবে তা এখন নতুন করে ভাবনার বিষয়।
জয়শংকর ও ওয়াং ই-র বৈঠকের পর যে পাঁচটি বিষয় ভারত-চীন যৌথ বিবৃতিতে জায়গা করে নিয়েছে তা হলো : ১. দীর্ঘ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সুফল থেকে শিক্ষা নিয়ে মতবিরোধকে সংঘাতে পরিণত না করা; ২. দুই পক্ষের সেনাদের মধ্যে আলোচনা বৃদ্ধি করা এবং দ্রুত সেনা সরিয়ে তাদের মধ্যে যথার্থ দূরত্ব তৈরি করা, যাতে উত্তেজনা হ্রাস পায়; ৩. ভারত-চীন সীমান্তসংক্রান্ত অতীতের সমস্ত চুক্তি ও প্রোটোকল মেনে চলা। সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতি বজায় রাখা। উত্তেজনা বৃদ্ধি হতে পারে এমন পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকা; ৪. সীমান্তসংক্রান্ত বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বহাল রাখা। সীমান্তসংক্রান্ত সব মেকানিজম চালু রাখা; ৫. পরিস্থিতি শান্ত হলেই নতুন আস্থাভাজন পদক্ষেপের কাজ দ্রুত শেষ করা।
বৈঠকে দুই দেশই স্বীকার করেছে যে সীমান্ত সমস্যা কোনো দেশের জন্যই মঙ্গলজনক নয়। উভয়েই বলেছে, সীমান্ত সমস্যা মেটাতে সময় ও উদ্যোগ প্রয়োজন। তারা আরো স্বীকার করেছে, শান্তি ও স্থিতি বজায় রাখতে না পারলে ভবিষ্যতে দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলো এগিয়ে নেওয়া যাবে না। তাই দুই দেশের স্বার্থেই দ্রুত জট খোলা প্রয়োজন। ভারত ও চীন উভয় দেশই সীমান্ত এলাকায় উসকানিমূলক আচরণ ও গুলি চালানো বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। বৈঠকে ভারত দাবি করেছে, অবিলম্বে সংঘর্ষের ক্ষেত্রগুলো থেকে সেনা সরানোর প্রক্রিয়া শুরু করা হোক। এই সংঘর্ষের জন্য চিনকে দায়ি করে ভারত আহ্বান করেছে, এই অনভিপ্রেত ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না হয়। অন্যদিকে চীন বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ভারতীয় অবস্থানের উলটো সুরে গান গেয়েছে।
বাস্তবে কোনো পক্ষই কিন্তু কাজটি করছে না। চীনের সঙ্গে সীমান্ত বিতর্ক নিয়ে মস্কোয় কূটনৈতিক স্তরে কথা শুরুর পরদিনই সীমান্তের বাস্তব চিত্রটি বুঝতে সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ। অন্যদিকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয় লাদাখ ও চীনের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করার উদ্দেশ্যে। ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল এম এম নরবণে পরিস্থিতি সম্পর্কে উভয় বৈঠকে রিপোর্ট করেন। লাদাখের পরিস্থিতি ঠিক কী অবস্থায় রয়েছে, দুই দেশের সেনা কোথায় এবং কী অবস্থানে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে, তা নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন ভারতের সেনাপ্রধান। ভারতীয় সেনা কতটা প্রস্তুত রয়েছে এবং চীন তার অনমনীয় মনোভাব আগামী দিনেও চালিয়ে গেলে সেক্ষেত্রে আসন্ন শীতে কীভাবে সীমান্তের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সম্ভব, তা নিয়েও সেনাপ্রধান প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে অবহিত করেন। ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহার করে সীমান্তে উত্তেজনা হ্রাস করার প্রশ্নে দুই দেশই একমত হয়েছে মস্কোর বৈঠকে। কিন্তু এর পরের রাজনাথদের বৈঠকের নির্যাস কিছুটা ভিন্ন। তাদের সিদ্ধান্ত, যত দিন চীন কোনো ভরসাযোগ্য আস্থাভাজন পদক্ষেপ গ্রহণ না করছে, তত দিন ভারতও সীমান্ত থেকে সেনা তুলে আনবে না। ভারত চীনকে কোনোভাবেই ভরসা করতে পারছে না। ইতিপূর্বে তারা চীনকে ভরসা করেছিল; কিন্তু ফলশ্রুতিতে প্যাংগং লেকের কাছে ৫ থেকে ৮ নম্বর গিরিশিখর খুইয়েছে। এই পরিস্থিতিতে লাদাখ সীমান্তসংলগ্ন যে কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থানগুলোতে ভারতীয় সেনা বর্তমানে রয়েছে, তা থেকে ভারত এই মুহূর্তে সরে আসতে চায় না। অন্তত তারা চীনের কাছ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ দেখার অপেক্ষা করবে।
এশিয়ার জায়েন্ট এই দুটি দেশ একে অপরের সঙ্গে হঠাত্ করেই সীমান্ত সমস্যায় জড়িয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে গত কয়েক বছর ধরে ইরানে চীনের বিপুল বিনিয়োগে ভারতের কপালে ভাঁজ ফেলেছে। নেপালের সঙ্গেও ভারতের সম্পর্কের অবনতির সুযোগ নিয়েছে চীন। চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের রসায়ন বরাবরই মধুর। মিয়ানমার, পাকিস্তান ও ইরানের বন্দরগুলোর সাহায্যে চীনা নৌবাহিনী ভারত মহাসাগরে আধিপত্যের পায়তারা করছে। চীন-ভারত সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজ করলে তাতে দুই দেশের কেউ-ই ভালো থাকবে না। ভালো থাকবে না পাকিস্তান, নেপাল, ইরান কিংবা মিয়ানমারও। কিন্তু সবচেয়ে বেশি বিপদগ্রস্ত হবে বাংলাদেশ। কেননা, ভারত ও চীন—দুই দেশের সঙ্গেই আছে বাংলাদেশের ভালো একটি সম্পর্ক এবং সীমান্ত যোগাযোগ। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের রয়েছে ঐতিহ্যগত হূদয়ের সম্পর্ক। অর্থনৈতিক বিচারে চীনের সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। তাই চীন-ভারত সমস্যা টিকে থাকলে ভালো থাকবে না বাংলাদেশও।
n লেখক :সাবেক সেনা কর্মকর্তা
