ট্রাম্প না বাইডেন—সতর্ক দৃষ্টি বিশ্বনেতাদের

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:৩৪

শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন

নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে হতে যাচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। বর্তমান রিপাবলিক দলীয় প্রসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখবেন—নাকি ডেমোক্রেটিক দলীয় প্রার্থী জো বাইডেন নতুন ইনিংস শুরু করবেন—তার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি বিশ্বনেতাদের। মার্কিন নির্বাচন ২০২০-এ ঘুরেফিরে আলোচনায় থাকছে চীন, কোভিড-১৯ ও প্রার্থীদের পররাষ্ট্রনীতি ভাবনা। তবে সাধারণ মার্কিনিরা চাকরি চায়, অর্থনৈতিক দুরবস্থার অবসান চায়, করোনার ভ্যাকসিন চায়।

ট্রাম্পের খেয়ালিপনা কূটনীতিতে অনেক পুরোনো মিত্র হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর প্রতি ট্রাম্পের বিতৃষ্ণার কথা তিনি নিজেই বলে বেড়ান। বিপরীতে ইউরোপ ও চীনা নেতাদের মতে, বাইডেনের সঙ্গে আলোচনা করার সুযোগ রয়েছে। তবে বাইডেনকে যেভাবে চীনের প্রতি নমনীয় ভাবা হচ্ছে—সমীকরণ ততটা সরল নয়। ডেমোক্র্যাটদের ৯২ পাতার ইশতেহারে স্বাস্থ্যসেবা, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি চীনের কথা বলা হয়েছে ২২ বার। এমনকি জিনজিয়াং প্রদেশের উইঘুর মুসলিমদের ওপর দমন-পীড়ন ও হংকংয়ে আন্দোলনকারীদের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছে বাইডেন শিবির। ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি বাতিল করা, চীনের ওপর নিষেধাজ্ঞা, জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণাসহ বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন একপাক্ষিকভাবে। যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী পুরোনো মিত্ররা পাশে ছিল না এসব সিদ্ধান্তে; কিন্তু বাইডেন হয়তো ঠিক সে পথে আগাবেন না। তিনি চীন-ইরান-রাশিয়া-তুরস্ককে মোকাবিলায় নতুন বাণিজ্য এবং ন্যাটোর সামরিক জোট শক্তিশালী করবেন। তবে বাইডেন আদতে ডেমোক্রেটিক শিবিরে জয় ফেরাতে পারবেন কি না—তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা বিশ্বরাজনীতির এমন গুরুত্বপূর্ণ টার্নিংয়ে এমন এক জনকে মনোনয়ন দিয়েছে যার পূর্বসূরি বারাক ওবামা বা হিলারি ক্লিনটনের মতো নিজস্ব বিশেষ কোনো কারিশমা নেই। শারীরিকভাবে বাইডেন ফিট নয়। মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার হয়েছে দুই বার। ১৯৮৮ সালে ও ২০০৮ সালে নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে চেয়েও পারেননি। রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা অর্জনে যতবারই ওপরে উঠতে চেয়েছেন ততবারই ব্যর্থ হতে হয়েছে।

বাইডেন রানিং মেট হিসেবে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদের জন্য প্রথমবারের মতো ভারতীয় বংশোদ্ভূত এক কৃষ্ণাঙ্গ নারী কমলা হ্যারিসকে বাছাই করছেন। কৃষ্ণাঙ্গ যুবক জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকে কেন্দ্র করে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনের ভোট নিজ ঘরে আনতে এমন সিদ্ধান্ত বলে ভাবা হচ্ছে। তবে কমলা হ্যারিসকে বাছাই করা বাইডেনের সংকটের কারণ হতে পারে। বাইডেনের বর্তমান বয়স ৭৭। জয়ী হয়ে হোয়াইট হাউজে যাওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়লে কমলা হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এছাড়া বাইডেনের দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচন করতে পারার মতো শারীরিক সক্ষমতা নেই। ফলে ২০২২-এর নির্বাচনে কমলা হ্যারিস হবেন ফেভারিট প্রার্থী।

এক অশ্বেতাঙ্গ নারীকে ভাইস প্রেসিডেন্ট/প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেনে নিতে মার্কিন সমাজের রক্ষণশীল এবং খ্রিষ্টান মূল্যবোধে বিশ্বাসী অংশ প্রস্তুত বলে মনে হয় না। ২০১৬ সালে হিলারি ক্লিনটনের পরাজয় সে আভাসই দেয়। মার্কিন পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ইতিহাসে কোনো নারীকে প্রেসিডেন্ট পদে মেনে নিতে পারেনি। বিপরীতে ট্রাম্পের জন্য পজিটিভ দিক হলো, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে মার্কিন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে টানা দুই মেয়াদে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার অলিখিত নিয়মে দাঁড়িয়েছে। তবে প্রতি চার বছর পরপর নভেম্বরে হওয়া মার্কিন নির্বাচনে প্রায়শই ‘অক্টোবর বিস্ময়’ একটা ঘটনা ঘটে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে ব্যক্তিগত ইমেইল সার্ভারের মাধ্যমে সরকারি ইমেইল চালাচালি করার ঘটনা ফাঁস হওয়াকে তার পরাজয়ের বড় কারণ হিসেবে ভাবা হয়। ফলে ২০২০ সালে এসে ট্রাম্প বা বাইডেন অক্টোবরে কী বোমা ফাটান তার দিকে ভোটারদের নজর রয়েছে। ট্রাম্প খেয়ালি কূটনীতির কারণে নানা দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বিচ্ছিন্ন করেছেন; কিন্তু চলতি মাসে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বড় ধরনের বিজয় পেয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ভূমিধস পরিবর্তন এনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আরব দেশের সঙ্গে ইসরাইলের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে দিয়েছেন। ফলে মার্কিন নির্বাচনে প্রভাবশালী ইহুদি লবি নিরঙ্কুশ সমর্থন পেতে যাচ্ছেন তিনি।

তবে নতুন অক্ষ তৈরির বিশেষ এই বিশ্বপরিস্থিতির সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কে হচ্ছেন—তা গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৬ সালে মাও সেতুংয়ের মৃত্যুর পর কুয়া ফেঙের নমনীয় পররাষ্ট্রনীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছিল। ঠিক তেমনি ট্রাম্প না বাইডেন—কে পাচ্ছেন হোয়াইট হাউজের চাবি তার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করছে আগামীর বিশ্বরাজনীতির গতিবিধি।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়