বিবিসি
শিনজো আবে এত দিন ধরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন যে, বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলের মানুষের কাছেই তার মুখটি পরিচিত হয়ে উঠেছিল। আবের স্থলাভিষিক্ত ইয়োশিহিদে সুগাও কী তার পূর্বসূরির মতো পরিচিতি পাবেন? এক মাস আগেও সম্ভবত খুব কম লোকই জাপানে কী ঘটতে যাচ্ছে, সে বিষয়ে ধারণা করতে পেরেছিল।
টোকিও অলিম্পিকের আগে আবে পদত্যাগ করবেন—এটি কারো প্রত্যাশাতেই ছিল না। এই টোকিও অলিম্পিকের আয়োজন ছিল আবের অতি আকাঙ্ক্ষিত। আবের প্রস্থানের চেয়েও সুগা যে তার স্থলাভিষিক্ত হবেন, এ ধারণা করা লোকের সংখ্যা ছিল আরো কম। ৭১ বছর বয়সী সুগা পরিচিত ছিলেন আবের ‘ফিক্সার’ হিসেবে; যার কাজ পর্দার আড়ালে থেকে দায়িত্ব সমাধা করা।
সম্প্রতি তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, নিজেকে কী আপনি চমত্কার লোক মনে করেন? সুগার উত্তর, ‘আমি তাদের কাছে খুবই চমত্কার, যারা তাদের কাজ ঠিকঠাক করতে পারে।’ জনসমক্ষে তাকে খুব একটা হাসতে দেখা যায় না। সরকারি মুখপাত্র হিসেবেও তিনি তেমন আকর্ষণীয় নন। প্রশ্ন পছন্দ না হলে সেসব বিষয়ে উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় জাপানি সাংবাদিকদের কাছে সুগার ডাকনাম ‘লৌহ প্রাচীর’।
দীর্ঘদিন ধরে টোকিওর বাসিন্দা অর্থনীতিবিদ জেসপার কোলের মতে, পর্দার আড়ালে থেকে যারা লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করেন তাদের হাতে অন্য কোনো বিকল্প না থাকাতেই তারা সুগাকে দলীয় নেতৃত্বে এনেছেন।
সুগার যে রাজনৈতিক দক্ষ নন, তা নয়। জাপানের মুখ্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে তিনি তার পূর্বসূরিদের চেয়েও অনেক বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করেছেন। দৃঢ়তা ও শৃঙ্খলার জন্য তার খ্যাতি আছে; জাপানের ‘বাইজেন্টাইন’ আমলাতন্ত্র কীভাবে কাজ করে, সে সম্বন্ধেও তিনি ব্যাপক ধারণ দেন। কিন্তু এসব গুণ কি তাকে নির্বাচনে জেতাতে পারবে? টোকিওর সোফিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কোইচি নাকানোর মতে, সুগার এসব গুণ নির্বাচনে জেতার জন্য যথেষ্ট নয়।
‘তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন, কেননা তার রয়েছে গণমাধ্যমসহ বিরোধীদের ভয় দেখানো, পর্দার আড়ালে হওয়া চুক্তিগুলোতে প্রভাব বিস্তার করা এবং আমলাতন্ত্রকে ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণের রাজনৈতিক দক্ষতা। কিন্তু যখন দলের মুখ হয়ে ওঠার বিষয় থাকবে, যখন এক বছরের মধ্যে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের নির্বাচন দেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়বে, তখন তিনি আর অতটা যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন না, কেননা তিনি খুব একটা বাকপটু নন,’ ভাষ্য নাকানোর।
সুগার বাগ্মিতার ঘাটতি দেখা গেছে সোমবার দলের নেতৃত্ব নির্বাচনের ভোটে জয়ী হওয়ার পর দেওয়া ভাষণেও। অনভ্যস্ত টানে, দীর্ঘ বিরতি নিয়ে তিনি সমর্থকদের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আমলাতন্ত্রের স্বার্থান্বেষী ভূমিকা ও অন্ধ আনুগত্যের নজির গুঁড়িয়ে দেওয়ার।
তবে নতুন প্রধানমন্ত্রীকে এখনই বাতিলের খাতায় ফেলতে রাজি নন জেসপার কোল। সুগাকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন বলেই জানেন, ৭১ বছর বয়সি এ ব্যক্তি নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে কতটা সচেতন। তিনি এমন মানুষ, যিনি ভোর ৫টায় ঘুম থেকে ওঠেন এবং ১০০ বার উঠবস করেন। তারপর সব খবরের কাগজ পড়ে ফেলেন। ভোর সাড়ে ৬টার মধ্যেই তিনি ব্যবসায়ী, উপদেষ্টা এবং বাইরের সব অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে বৈঠক শুরু করে দেন। তিনি স্পঞ্জের মতো শুষে নেন এবং দেশের জন্য সবকিছুই করতে চান। তিনি ক্ষমতার সঙ্গে আসা চাকচিক্য কিংবা জৌলুসের ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী নন । ‘চাকচিক্য আর জৌলুসকে’ সন্তর্পণে এড়িয়ে চলার এ অভ্যাস সুগা সম্ভবত তার অতীত থেকে রপ্ত করেছেন। স্ট্রবেরি চাষির এ সন্তান জন্ম নিয়েছিলেন উত্তর জাপানের ছোট্ট একটি গ্রামে। ১৮ বছর বয়সে তিনি টোকিও চলে আসেন। নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খরচ জোগাতে তাকে একটি কার্ডবোর্ড ফ্যাক্টরিতেও কাজ করতে হয়েছিল। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর এই অতীতই জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে তার বেশির ভাগ পূর্বসূরিদের থেকে আলাদা করেছে। যেমন শিনজো আবে, আট বছর ধরে জাপানের ক্ষমতায় থাকা আবের বাবা ছিলেন জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, দাদা ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। আবের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল জাপানে দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা। ২০১২ সালে তিনি নির্বাচিত হওয়ার আগে জাপান তার আগের তিন দশকে ১৯ জনকে প্রধানমন্ত্রী পদে দেখেছিল।
