ধামতীর পির সাহেব মাওলানা আবদুল হালিম (রহ)

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২০:৩৬

কুমিল্লা জেলার ঐতিহ্যবাহী ধামতী ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ এবং ধামতী দরবারের পির সাহেব হুজুর, উস্তাজুল ওলামা মাওলানা আবদুল হালিম (রহ) আমাদের ছেড়ে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন গত ২ সেপ্টেম্বর, ২০২০ বুধবার। তার বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই মেয়ে, নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য শিষ্য ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। কুমিল্লা জেলার দেবীদ্বার উপজেলাধীন ধামতী গ্রামে ২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৪ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা উপমহাদেশের অন্যতম আধ্যাত্মিক রাহবার ফুরফুরা শরিফের পির মুজাদ্দিদে জামান আবু বকর সিদ্দিকী আল-কুরাইশী (রহ)-এর অন্যতম খলিফা পিরে কামেল মাওলানা আজিম উদ্দীন আহমদ (রহ)। তিনি ফাজিল পর্যন্ত লেখাপড়া করেন পিতার প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী ধামতী ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসায়। ছাত্রজীবনের প্রতিটি স্তরে তিনি অনন্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। তারপর তিনি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া ঢাকা থেকে হাদিসশাস্ত্রে কামিল ডিগ্রি অর্জন করেন। এই মাদ্রাসায় তিনি বরেণ্য মুহাদ্দিসদের কাছে ইলমে দিন হাসিল করেছিলেন। এসব মুহাদ্দিসের মধ্যে মাওলানা মুফতি সৈয়দ আমীমুল ইহসান মোজাদ্দেদী (রহ), মাওলানা আবদুর রহমান কাশগড়ী (রহ), মাওলানা যাফর আহমদ উসমানী (রহ), মাওলানা খতিব উবায়দুল হক জালালাবাদী (রহ) এবং মাওলানা আলাউদ্দীন আল-আজহারী (রহ) উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ধামতী ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসায় অধ্যয়নকালীন তিনি দেশবরেণ্য হাদিস বিশারদ শায়খুল হাদিস মাওলানা ছফিউল্লাহ মুসাপুরী (রহ)কে উস্তাদ হিসেবে পান।

স্বীয় পিতা ধামতী দরবারের প্রতিষ্ঠাতা পিরে কামেল মাওলানা আজিম উদ্দিন আহমদ (রহ)-এর সান্নিধ্যে তিনি ইলমে তাসাউফের আধ্যাত্মিক দীক্ষা লাভ করেন। ১৯৭৪ সালের মে মাসে স্বীয় পিতা ও মুরশিদের ইন্তেকালের পর আমৃত্যু হজরত মাওলানা আবদুল হালিম (রহ) ধামতী দরবারের পির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭৩ সালে তিনি দেশসেরা দিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঐতিহ্যবাহী ধামতী ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার উস্তাদ হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন এবং ১৯৭৫ সালে অত্র প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ২০০৪ সালে তিনি অত্র প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। ইলমে দিনের প্রসারই ছিল মাওলানা আবদুল হালিম (রহ)-এর জীবনব্যাপী ব্রত। তাই তিনি অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর ধামতী ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসাকে এমন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলেছেন, যেখান থেকে বিশ্বব্যাপী বিচ্ছুরিত হয়েছে দিনি শিক্ষার আলো। তার প্রচেষ্টায় অত্র মাদ্রাসা সমগ্র বাংলাদেশে অনন্য খ্যাতি অর্জন করতে সক্ষম হয়। এই মাদ্রাসা থেকে বহু মুহাদ্দিস ও আলেম বেরিয়েছেন, যাদের অনেকেই দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে ইসলামের সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের অনেক মাদ্রাসারই অধ্যক্ষ ও মুহাদ্দিস এই মাদ্রাসারই কৃতী ছাত্র।

ধামতীর পির সাহেব মাওলানা আবদুল হালিম (রহ) ছিলেন বড় অন্তরের অধিকারী। উদার দৃষ্টিভঙ্গি ও সহূদয়তার মতো গুণের কারণে সর্বস্তরের মানুষের কাছে তিনি জনপ্রিয় ছিলেন। দলমতনির্বিশেষে সব মানুষকে আপন করে নেওয়ার গুণ ছিল তার সহজাত। তিনি খুবই অনাড়ম্বর ও সহজ-সরল জীবন যাপন করতেন। তার পোশাক পরিচ্ছদ, খাদ্য-খাবার ও বসবাসের উপায়-উপকরণ সবই ছিল খুবই সাদাসিধে। তিনি রাসুলে কারিম (স) ও সাহাবায়ে কেরামের পূর্ণাঙ্গ অনুসারি ছিলেন। তিনি সম্পূর্ণ দুনিয়াবিমুখ একজন বুজুর্গ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ছিলেন সুন্নতের পরিপূর্ণ পাবন্দ, সর্বদা হাসিখুশি, প্রাণবন্ত ও দরাজদিলের অধিকারী। ইন্তেকালের পূর্বমুহূর্তেও তাসবিহ হাতে জিকির করতে দেখা গেছে তাকে। প্রচারবিমুখ এই মনীষীর বিনয় ও সৌজন্যতা ছিল তার মধুর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। স্বভাবগতভাবে তিনি বেশ গম্ভীর ও মিতভাষী ছিলেন। তবে তার মাঝে কৌতুক, রসবোধও ছিল। অন্তর্গত বিশ্বাস, বোধ ও শুদ্ধাচারে তিনি ছিলেন অটল। বহু মানুষ তার পবিত্র পরশে পাপাচারমুক্ত জীবনের সন্ধান পেয়েছে।

মাওলানা শাহ আহমদ হাসান সিদ্দিকী ও শাহ মুহাম্মদ বাহাউদ্দীন আহমদকে দরবারের নতুন পরিচালক হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তারা উভয়েই উদার আচরণ, নিরহংকার জীবনধারা ও মার্জিত ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষকে মোহিত করে থাকেন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মরহুম পির সাহেব হুজুরকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন এবং নবনিযুক্ত পরিচালকদ্বয়কে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করার তাওফিক দান করুন। আমিন!

 lলেখক :প্রাবন্ধিক ও কলেজশিক্ষক