ব্যাংকিং সেক্টর জনকল্যাণে ব্যবহার দরকার

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:৩০

একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাংকিং ব্যবস্থার দায়দায়িত্ব অনেকখানি। সমতাভিত্তিক প্রবৃদ্ধি সৃষ্টির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হিসেবে ব্যাংকিং সেক্টরকে স্ব স্ব ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়া দরকার। আবার যারা ঋণগ্রহীতা তারা যদি সঠিকভাবে এবং সঠিক সময়ে ব্যাংকঋণ পরিশোধ করে, তাহলে সেটি দেশ এবং জাতির জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে। ব্যাংকিং খাতকে জনকল্যাণ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং আয়বৈষম্য দূরীকরণে কাজ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং ৫৯টি ব্যাংককে একযোগে কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ঢাকার বাইরে সরিয়ে দিতে হবে। করোনার প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই সরকারপ্রধানের প্রয়াসে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ১ লাখ ১১ হাজার ১৩৭ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছিল। কটেজ, স্মল, মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজের যে প্রণোদনা প্যাকেজ ছিল, তার ১৫ শতাংশ অন্তত গ্রামীণ এলাকায় দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সম্প্রতি এই বাধ্যবাধকতা ব্যাংকগুলোর ওপর থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে। যেখানে গত ১১ বছরের বেশি সময়ে যে উন্নয়ন হয়েছে তা মূলত গ্রামীণ অবকাঠামোর অর্থনীতি নির্ভর করে। কৃষি ও কৃষিজ শিল্পের ওপর নির্ভর করে, সরকারপ্রধান সুস্পষ্টভাবে গ্রামীণ অর্থনীতিকে সাহায্য করতে নির্দেশনা দিয়েছেন। সেখানে এ ধরনের নির্দেশনা সরকারের প্রয়াসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। করোনায় কিন্তু গ্রামীণ অর্থনীতিনির্ভর সিএসএমই খাতটিতে বেশ বড় রকমের ধাক্কা লেগেছে। এদেশের প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র খামারিদের অধিকাংশের অবস্থান হচ্ছে গ্রামীণ এলাকায়। সেসব এলাকায় যদি জামানতবিহীন সরল সুদে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে বাধ্য করা যেত, তবে তা দেশের উন্নয়নের গতিকে সঠিক দিকনির্দেশনায় ধারণ করত বলেই বিশ্বাস। প্যাকেজ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যারা উচ্চবিত্ত ও ধনবান শ্রেণি, তারা যে গতিতে সব সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করছেন, সে তুলনায় প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র শ্রেণি কিন্তু প্যাকেজের সুফল পাচ্ছে না। কেননা, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র শ্রেণির ক্ষেত্রে প্যাকেজের অর্থ ছাড় করতে দেরি করছে। গ্রামীণ অঞ্চলের শাখা ব্যবস্থাপকেরা সচরাচর ব্যক্তিগত পর্যায়ে উদ্যোক্তা তৈরি অর্থায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্ব না দিয়ে বেসরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিতে বেশি তত্পর থাকে। যেসব গ্রামের অধিবাসী প্রবাসে থাকেন, তাদের ক্ষেত্রে যত না ভোগ্যপণ্যজাত ঋণ বিতরণে ব্যাংকাররা সচেষ্ট থাকেন, ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পে ঋণ চাইলেই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাধা দেন। এটি আসলে কখনো দূর করা যায়নি। ব্যাংকারদের বর্তমান প্রজন্মের ক্ষেত্রে মাইন্ডসেট হচ্ছে স্বল্প পরিশ্রমে বেশি ঋণ দেখানো। ফলে করোনাকালেও বিত্তশালীরা যেখানে সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণের সুবিধা পাচ্ছেন, সেখানে সরকারি সদিচ্ছা সত্ত্বেও একশ্রেণির ব্যাংকারের কারণে প্রণোদনা প্যাকেজের সুবিধা পাচ্ছেন না ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা।

গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে বটমআপ অ্যাপ্রোচ এবং টপ ডাউন অ্যাপ্রোচের মধ্যে ভার্টিকেল এবং হরাইজন্টাল কো-অর্ডিনেশন দরকার। স্বল্পমেয়াদি সাহায্য সহায়তা দরকার হচ্ছে কেবল হঠাত্ করে সামষ্টিক অর্থনীতির চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে যে ধাক্কা লেগেছে তা কাটিয়ে ওঠার জন্য। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে গ্রামীণ প্রতিটি জনপদে সততা, নিষ্ঠা এবং সুুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও তথ্যের আদান-প্রদানের মাধ্যমে ব্যাংক চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুফল নিতে পারে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহার করতে পারে। ব্যাংকিং সেক্টরে যে অর্থের লেনদেন হয় তা জনগণের টাকা। এই টাকার সদ্ব্যবহার করে জনকল্যাণে ব্যবহার করা দরকার। ঋণ অবলোপন করে আর যা-ই হোক, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাশাপাশি ঐ বাণিজ্যিক ব্যাংকও সমদোষে দোষী। স্থানীয় পুঁজির সংরক্ষণ ও বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। গিনি সহগকে বণ্টন ব্যবস্থাপনায় ব্যাংকিং খাতের উদ্যোগী ভূমিকা রাখা দরকার। এঞ্জেল ইনভেস্টার, সিড মানি এবং স্টার্টআপ ফান্ডিংয়ে দুর্নীতিমুক্তভাবে ব্যাংকঋণ বিতরণ করা দরকার। পাশাপাশি যারা ঋণগ্রহীতা তাদেরও অবশ্যই সততা, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার পরিচয় দিতে হবে।   দেশের প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যেসব দুষ্কর্ম বিভিন্ন সময়ে ঘটেছে, সেগুলো কিন্তু প্রচলিত আইনের আওতায় বিচারে আনলে ব্যাংকিং সেক্টর সঠিক মাত্রায় দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে গতিময়তা দিতে পারত। তরুণ উদ্যোক্তা তৈরিতে কোলেটারাল ফ্রি লেন্ডিংয়ের ব্যবস্থা দরকার। প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের আইনকানুনের ধার অনেকেই ধারছে না।

সরকার যে দারিদ্র্য দূরীকরণ করেছে তা কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে অপ্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যমে করেছে। জবাবদিহি না থাকার কারণে ব্যাংকিং সেক্টরে গতিময়তার বদলে ইচ্ছাকৃতভাবে ভিন্ন মাত্রার ব্যাংকিং ব্যবসায়-বাণিজ্য করে যাচ্ছে কৃষি ব্যাংক, উন্নয়ন ব্যাংক এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। বিভিন্ন ব্যাংকের চার্জেস শিডিউল বাংলাদেশ ব্যাংকের যাচাই-বাছাই করা উচিত। এতে করে নির্দিষ্ট উপকারভোগীরা বঞ্চিত হচ্ছে। এই যে বঞ্চনা, এটি বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে আশানুরূপ সাফল্যে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।

n লেখক : ম্যাক্রো ও ফিন্যান্সিয়াল

 ইকোনমিস্ট এবং আইটি এক্সপার্ট