বিক্ষোভের মধ্যে হাটহাজারী মাদ্রাসা বন্ধ ঘোষণা

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২২:০৬

ছাত্রদের অব্যাহত বিক্ষোভের মুখে চট্টগ্রামে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা আহমদ শফির মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসা বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। প্রতিষ্ঠানটির সহকারী শিক্ষা সচিব এবং আহমদ শফির পুত্র মাওলানা আনাস মাদানীকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারসহ ছয় দফা দাবি বাস্তবায়নে ছাত্রদের দুই দিনের টানা বিক্ষোভের মধ্যেই বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে এ আদেশ দেওয়া হয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশে এই প্রথম কোনো কওমি মাদ্রাসা বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হলো। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ২৪ আগস্ট কওমি মাদ্রাসাসমূহের কিতাব বিভাগের কার্যক্রম শুরু ও পরীক্ষা গ্রহণের জন্য কতিপয় শর্তসাপেক্ষে অনুমতি প্রদান করা হয়। কিন্তু শর্তসমূহ যথাযথভাবে প্রতিপালিত না হওয়ায় চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী উপজেলার আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসাটি পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত নির্দেশক্রমে বন্ধ করা হলো।’

আমাদের হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, ছাত্ররা দাবি আদায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তারা বলছেন, কওমি মাদ্রাসা সরকারের কোনো আদেশ নির্দেশ মানতে বাধ্য নয়। গতকাল অপরাহ্নে মাদ্রাসা বন্ধের গুজব ছড়িয়ে পড়লে মাদ্রাসার ভেতরে থাকা হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিক্ষুব্ধ হয়ে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। তাদের হামলা থেকে বাদ যায়নি হেফাজত আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফির কক্ষও। সহকারী পরিচালক মাওলানা শেখ আহমদ, মুফতি জসিম ও মাওলানা ওমরের রুমে ভাঙচুর চালানো হয়। মারধর করা হয় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ও ইসলামী ঐক্যজোটের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মঈনুদ্দিন রুহীকে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিপুল পরিমাণ সদস্য মাদ্রাসার মূল ফটকের সামনে অবস্থান নিয়েছে। সেখানে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। মাদ্রাসার ভেতরে হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছে। আহমদ শফিসহ সিনিয়র শিক্ষকরা মাদ্রাসায় অবরুদ্ধ হয়ে আছেন।

গত বুধবার ছাত্রদের বিক্ষোভ শুরু হয় ছয় দফা দাবিতে। ছাত্রদের দাবিগুলো হলো হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক আল্লামা শফির ’দুর্নীতিবাজ ও বিতর্কিত’ ছেলে মাওলানা আনাস মাদানীকে অনতিবিলম্বে মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কার, ছাত্রদের প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা বাস্তবায়নে হয়রানি বন্ধ, বয়োবৃদ্ধ আল্লামা শফি শারীরিকভাবে অসুস্থ ও চলতে সম্পূর্ণ অক্ষম হওয়ায় তাকে মহাপরিচালকের পদ থেকে অব্যহতি দিয়ে নতুন মহাপরিচালক নিয়োগ, মাদ্রাসার শিক্ষক নিয়োগ কিংবা অপসারণের ক্ষমতা মজলিসে শুরাকে প্রদান, বিগত শুরার হক্কানি আলেমদের পুনরায় নিয়োগ এবং শুরা থেকে বিতর্কিত ও চিহ্নিতদের বহিষ্কার। বুধবার রাতে আহমদ শফির সভাপতিত্বে শুরার বৈঠকে ছাত্রদের তিনটি দাবি মেনে নেওয়া হয়। মাওলানা আনাস মাদানীকে অব্যাহতি দেওয়া হলে সাময়িকভাবে আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেয় শিক্ষার্থীরা। শনিবার মজলিশে শুরার বৈঠক করে ছাত্রদের ছয় দফা দাবির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলা হলেও গতকাল সকালে আহমদ শফি শিক্ষকদের ডেকে দুই মাসের জন্য মাদ্রাসা বন্ধ ঘোষণার কথা জানালে ছাত্ররা গতকাল বেলা সাড়ে ১১টা থেকে মাদ্রাসার মাঠে পুনরায় অবস্থান নেয়। আনাস মাদানী বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন। তার পক্ষের শিক্ষক ও স্টাফরা মাদ্রাসা ছেড়ে চলে গেছেন।

হাটহাজারী মাদ্রাসা, হেফাজতে ইসলাম ও কওমি মাদ্রাসা বোর্ডের (বেফাক) ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে আনাস মাদানীর বিরুদ্ধে। আরো অভিযোগ আছে, বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় আহমদ শফি দাপ্তরিক কাজে ছোট ছেলে মাওলানা আনাস মাদানীর ওপর নির্ভর হয়ে পড়েন। এই সুযোগে মাওলানা আনাস মাদানী স্বেচ্ছাচারী হয়ে পড়েন। তিনি তার অনুগতদের রেখে বাকি শিক্ষকদের বরখাস্ত, পছন্দের শিক্ষক নিয়োগ, চাঁদাবাজিতে জড়িত হয়ে পড়েন।

এদিকে গুরুতর অসুস্থ শতবর্ষী আহমদ শফিকে হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে অবসর প্রদান ও তার পুত্রকে বহিষ্কারের দাবিতে আন্দোলনে সারাদেশের কওমি মাদ্রাসাগুলো বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে মানববন্ধন করেছেন ঢাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের নেতৃত্বে ছাত্ররা। তারা অবিলম্বে দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান।