নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় বাইতুস সালাত মসজিদে বিস্ফোরণের জন্য স্থানীয়দের অবৈধ গ্যাস ও বিদ্যুত্ সংযোগকে দায়ী করা হয়েছে। একই সঙ্গে মসজিদের নির্মাণকাজে ত্রুটি ছিল, যার কারণে মাটির নিচের পাইপের ছিদ্র থেকে মসজিদের ভেতরে গ্যাস জমা হয়। আর ঐ গ্যাস থেকেই বিস্ফোরণ ঘটে।
দুর্ঘটনার কারণ তদন্তে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (টিজিটিডিসিএল) প্রতিবেদনে এ তথ্য দেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এতে স্থানীয়ভাবে কারা অবৈধ সংযোগ নেওয়ার কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে তা উল্লেখ রয়েছে। তবে অবৈধ গ্যাস ও বিদ্যুত্ সংযোগের নেপথ্যে তিতাস ও ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) দায়দায়িত্ব আছে কি না এবং এতে এ দুই সরকারি কোম্পানির কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত কি না তা উল্লেখ করা হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বলেন, তিতাসের প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য বিষয়গুলো মন্ত্রণালয় আরো খতিয়ে দেখবে। এ প্রতিবেদনই শেষ নয়। এ দুর্ঘটনায় কেউ দায়দায়িত্ব এড়াতে পারবে না। সরকারের কোম্পানি কিংবা গ্রাহক—যার দায় তাকেই বহন করতে হবে। ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে সেজন্য বিতরণ ও সার্ভিস পাইপলাইন নিয়মিত পরিদর্শন, পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ৪ সেপ্টেম্বর রাতে ঐ মসজিদে বিস্ফোরণে অর্ধশতাধিক মানুষ দগ্ধ হন। তাদের মধ্যে শিশুসহ ৩১ জন মারা যান। এ দুর্ঘটনা তদন্তে তিতাস গ্যাসের মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) প্রকৌশলী মো. আবদুল ওহাবকে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। গতকাল ঐ কমিটি মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় গ্রাহক শওকত আলী এবং বারেক দেওয়ান মসজিদের পাশে এক ইঞ্চি ব্যাসার্ধের গ্যাস বিতরণ লাইন থেকে তিন ইঞ্চি লাইনে অবৈধভাবে শিফট করেন। স্থানীয়ভাবে ওয়েল্ডার দিয়ে তারা দুটি রাইজার শিফট করেন। কিন্তু আগের সার্ভিস লাইনটি নিয়ম অনুযায়ী বন্ধ না করে বন্ড প্লাগ করে গ্যাস প্রবাহ বন্ধ করা হয়। মসজিদ নির্মাণ ও সম্প্রসারণের সময় পরিত্যক্ত লাইনটির পাইপের র্যাপিং নষ্ট হয় এবং পাইপে মাটির স্পর্শে মরিচাজনিত কারণে ছিদ্র হয়। মসজিদের ৪ নম্বর পিলারের বেইজের নিচে ছয়টি ছিদ্র পাওয়া গেছে। সার্ভিস লাইনটির ওপর চার ইঞ্চির আরসিসি করা রাস্তাও আছে। ছিদ্র দিয়ে বের হওয়া গ্যাস ঐ রাস্তা দিয়ে সোজা বের না হয়ে পাশের মসজিদের ভেতরে ঢুকেছে। তার মানে মসজিদের ফ্লোরের কাজ মানসম্মত হয়নি। ছড়িয়ে পড়া গ্যাস মসজিদের বিভিন্ন স্থানে ফ্লোর টাইলসের সংযোগস্থল এবং লিকেজ পয়েন্ট হতে প্রায় ৫০ ফুট দূরে কলাপসিবল গেটের নিচ থেকেও বের হয়ে এসি কক্ষে জমা হতে পারে।
এছাড়া মসজিদটিতে থাকা দুটি বিদ্যুত্ সংযোগের একটি বৈধ এবং অন্যটি অবৈধ। দুর্ঘটনার দিন রাত ৮টা ৪০ মিনিটে যখন মসজিদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অংশে মুসল্লিরা নামাজ আদায় করছিলেন তখনই বিদ্যুত্ চলে যায়। পুরো মসজিদ অন্ধকার হয়ে গেলে মুয়াজ্জিন তাদের বৈদ্যুতিক ডিস্ট্রিবিউশন বোর্ডের চেঞ্জ ওভার সুইচের মাধ্যমে অন্য একটি বৈদ্যুতিক ফিডার লাইনে সংযোগ স্থাপন করেন। এ থেকে সৃষ্ট স্পার্কে মসজিদে জমাকৃত গ্যাসে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। মসজিদ কমিটির বর্তমান সভাপতি আ. গফুর এবং জমিদাতা শামসুদ্দিন সর্দার অবৈধ বিদ্যুত্ লাইনটির সংযোগ গত রমজানে ডিপিডিসির স্থানীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে মৌখিকভাবে কথা বলে নেওয়া হয় বলে স্বীকার করেছেন। তবে এ সংযোগ ডিপিডিসির কারা দিয়েছেন তা তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
তদন্ত প্রতিবেদনে নারায়ণগঞ্জে তিতাসের নিয়ন্ত্রণাধীন গ্যাস পাইপ নেটওয়ার্ক, বিভিন্ন শ্রেণির সংযোগ পরিদর্শন করে লিকেজ শনাক্ত এবং অবিলম্বে তা মেরামতের সুপারিশ করা হয়েছে। এজন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় জনবল ও লজিস্টিক সহায়তা দিতে বলা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদন জমাদানকালে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জ্বালানি বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আনিছুর রহমান, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এ বি এম আবদুল ফাত্তাহ্ ও তিতাস গ্যাস কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী মো. আল-মামুন।
