অবিরাম ভারী বর্ষণ আর উজানের ঢলে নদনদীতে পানি বৃদ্ধির ফলে কুড়িগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ফের বন্যা দেখা দিয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে হাজার হাজার পরিবার। নদনদীর তীব্র ভাঙনে বাড়ছে জনদুর্ভোগ। এ বিষয়ে ইত্তেফাক প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর।
কুড়িগ্রাম :ধরলা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় চতুর্থ দফা বন্যার কবলে পড়েছে কুড়িগ্রামের মানুষ। বাড়ছে তিস্তা ব্রহ্মপুত্রসহ অন্যান্য নদনদীর পানিও। দীর্ঘ দেড় মাসের বন্যার ধকল কাটতে না কাটতেই আবারও নদনদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন চরাঞ্চলের মানুষ। বৃহস্পতিবার বিকালে ধরলা নদীর পানি সেতু পয়েন্টে বিপত্সীমার ৩৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। গত ২৪ ঘণ্টায় ধরলায় ১৫ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়েছে ৪২ সেন্টিমিটার। ফলে ধরলার পাশাপাশি ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নিম্নাঞ্চলগুলোতেও পানি ঢুকতে শুরু করেছে।
এদিকে ভারী বর্ষণে কুড়িগ্রাম শহরে সৃষ্টি হয়েছে মারাত্মক জলাবদ্ধতার। কুড়িগ্রাম ফায়ার সার্ভিস, হাসপাতাল রোড, হাটিরপাড়, রৌমারী পাড়াসহ শহরের অন্তত ৩০টি পয়েন্টে হাঁটু থেকে কোমর পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। আকস্মিকভাবে ধরলা নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এর অববাহিকায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অন্তত ১০ হাজার পরিবারের প্রায় ৪৫ হাজার মানুষ। তীব্র স্রোতের মুখে জেলার ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদের ২০টি পয়েন্টে ভাঙন শুরু হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম জানান, হঠাত্ করে অস্বাভাবিক পানিবৃদ্ধির ফলে আবার বন্যার কবলে পড়েছে নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষ। ক্ষতি হয়েছে বিভিন্ন ফসলাদির। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের জন্য বলা হয়েছে।
ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) :গত কয়েক দিনের বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে সবকটি নদনদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এ উপজেলায় আবারও বন্যা দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে তৃতীয় দফা বন্যায় উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে ৩ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। প্লাবিত এলাকার বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। বন্যাকবলিত এলাকায় সংকট দেখা দিয়েছে গো-খাদ্যের।
ভূরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম) :ভূরুঙ্গামারীতে টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে দুধকুমার ও ফুলকুমার নদের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তীরবর্তী এলাকার প্রায় ১৪টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে ওই গ্রামগুলোর কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যায় রোপা আমন ধান ও সবজিখেত তলিয়ে গেছে। পুকুর ডুবে গিয়ে ভেসে গেছে মাছ। এছাড়া রাস্তাঘাট ভেঙে গেছে।
নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম) : নাগেশ্বরীতে পর পর দুই দফা বন্যার ক্ষত কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আশ্বিনের প্রথম সপ্তাহে দেখা দিয়েছে তৃতীয় দফা বন্যা। তলিয়ে গেছে নিম্নাঞ্চল।
উলিপুর (কুড়িগ্রাম) : উলিপুরে অবিরাম বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ফলে নদী অববাহিকার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বোরো ধান ও সবজিখেতে তলিয়ে গেছে। এদিকে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে নদনদীর তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে মসজিদ, পাকা রাস্তা, আড়াই শতাধিক বসতভিটা ও কয়েকশ’ হেক্টর আবাদি জমি নদীগর্ভে চলে গেছে।
গঙ্গাচড়া (রংপুর) : তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় গঙ্গাচড়ায় শেখ হাসিনা গঙ্গাচড়া সেতুর মহিপুর-কাকিনা সংযোগ সড়কে আবারও ভাঙন দেখা দিয়েছে। পানির তোড়ে যে কোনো সময় সড়ক ও সেতু ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। এছাড়া গত দুই দিনে লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের ইচলী এলাকায় অর্ধশত ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের ভয়ে লোকজন তাদের বাড়িঘর অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে। পূর্ব ইচলি, পশ্চিম ইচলী, বাগেরহাট, শংকরদহ, জয়রামওঝা এালাকায় প্রায় দুই হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
ঝিনাইগাতী (শেরপুর) : গত দুই দিনের অবিরাম বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিতে নিম্নাঞ্চলের শত শত একর জমির আমন ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। মহারশি নদীর রামেরকুড়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে উপজেলা পরিষদ চত্বর, কোর্ট বিল্ডিং, পোস্ট অফিস, সাব রেজিস্ট্রি অফিস চত্বরে পানি প্রবেশ করে দাপ্তরিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়। সদর বাজার, ধানশাইল, আয়নাপুর বাজারে নদীর পানি প্রবেশ করায় দুর্ভোগে পড়েন ক্রেতা-বিক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা।
