চির অসহায়ের নাম কৃষক

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২২:০৬

মো. শাহীন সরদার

 

বাংলাদেশ রূপকল্প ২০২১-২০৪১ নিয়ে এগিয়ে চলেছে। এ দেশের মানুষের একটা বিশাল অংশ তাদের জীবনধারণের জন্য কৃষির ওপর নির্ভর করে। কৃষির সঙ্গে জড়িত জনগোষ্ঠীকে অবহেলিত রেখে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়ানো অসম্ভব। কৃষির বিশাল অংশের বাইরের অধিকাংশই জানে না, এক মণে কতটা ধান বা পেঁয়াজ হয়, গণনা কষ্ট হলেও রান্নার চুলায় একটি চাল বা পেঁয়াজ আসতে প্রতিটি কৃষকের কতটা শ্রম প্রয়োজন তা আঁধারেই থেকে যায়। একটি চালের কথাই ধরা যাক—পানি-কাদামাটিতে নেমে বীজতলা তৈরি করে ধানের বীজ ফেলা হয়, কাদাপানিকে ভালোমতো চাষ করে জমি তৈরি করে বীজতলা থেকে সংগ্রহকৃত চারা লাগানো হয়। সেই চারাকে প্রতিনিয়ত আগাছা দমন করে, পানি ও সার-কীটনাশক দিয়ে বড় করতে হয়। এরপর কয়েক মিনিটের শিলা বৃষ্টি বা বন্যা এসে ক্ষণিকেই সব শেষ করে দিয়ে যায়। যদি এমন না হয় তবে পাকলে সেগুলো কাটা হয়। বাড়িতে এনে মাড়াই করে শুকানো হয়, ময়লাগুলো পরিষ্কার করতে হয়। এরপর চাল হতে আরো কিছু প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এই যে প্রতিটা ‘হয়’ সহজে লিখে ফেললাম, প্রতিটি ‘হয়’ সম্পন্ন করতে রক্ত পানি করতে হয়, পানিকে ঘাম করতে হয়। কৃষককে কিন্তু এই একটি চাল তৈরি করতে সবকিছু (সার, কীটনাশক, তেল, মেশিন, যন্ত্রপাতি) নির্দিষ্ট দামেই কিনতে হয়। এভাবেই প্রতিটি ফসল উত্পাদিত হয়ে এসি রুমের খাবার টেবিলে আসে।

এরপর ভাগ্যবান কৃষকের বাম্পার ফলন হলে, যত নগদ খরচ করে উত্পাদন করতে হয়েছে (হাড়ভাঙা শ্রম বাদেই) সেটাও পায় না। কৃষকদের পক্ষে কথা বলারও কেউ নেই। যুগ যুগ ধরেই এই বৈষম্য চলে আসছে। এটাই কৃষি ও কৃষকের চিত্র। আমরা প্রায়ই শুনি—কৃষক ফসলের দাম পাচ্ছে না, ফসল ফেলে দিচ্ছে, পচে যাচ্ছে। তখন তাদের হাহাকার শোনার কেউ নেই। কিন্তু এক বছরের নির্দিষ্ট সময় কোনো পণ্যের দাম বাড়লেই বলার লোকের অভাব হয় না। কারণ দুটি—এক. আমরা জন্মগতভাবে স্বার্থবাদী—নিজেদের স্বার্থ জড়িত বিষয়ে আমরা উদ্বিগ্ন থাকি, দুই. কৃষকদের কার্যকর এবং শক্তিশালী প্রতিনিধি অনুপস্থিত, তাদের অধিকার, দুদর্শা উপলব্ধি করার, কথা বলার কেউ নেই। অতিউচ্চমূল্য বা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কখনোই কাম্য নয়।

তাহলে ভিন্ন চিন্তা কী? কৃষি নিয়ে প্রয়োজন সুচিন্তিত দূরদর্শী পরিকল্পনা করে এগোনো। কৃষিকাজকে সম্মানজনক পেশার মর্যাদা দেওয়া। কৃষিকে লাভজনক করা। মৌসুমের শুরুতেই ভালো দাম পাওয়ার ব্যবস্থা। পচনশীল পণ্যের সংরক্ষণ পদ্ধতি বের করা। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো। কৃষকের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া। কৃষকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো। কৃষিতে সমস্যাগুলো খুঁজে বের করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া। পণ্যের বাজার সৃষ্টি ও সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণ। কৃষকেরা যাতে দাম পায় সেজন্য আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা। তাহলে আমরা নিজেরাই স্বয়ংসম্পন্ন হতে পারব একসময়। প্রাণিসম্পদ সেক্টর (গরু) এর বাস্তব উদাহরণ।

বাংলাদেশে আজ লাখ লাখ শিক্ষিত বেকার। কৃষি লাভজনক ও সম্মানজনক হলে বেকার শিক্ষিত জনগোষ্ঠী কৃষিতে ফিরে আসবে। বেকারত্ব কমবে। কৃষিতে আগ্রহ সৃষ্টি হবে, পতিত জমি কৃষির আওতায় আসবে, কৃষিজমির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হবে। এভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িত জনগোষ্ঠী এগিয়ে যাবে, জিডিপিতে আবদান রাখবে, মাথাপিছু আয় বাড়বে, দারিদ্র্যের হার কমবে, রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়িত হবে।

শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ