বিবিসি
ভারতশাসিত কাশ্মীরে সাংবাদিকদের জন্য খবর সংগ্রহের কাজ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। সেখানে সম্প্রতি সাংবাদিকদের মারধর, হেনস্তা ও গ্রেফতারের ঘটনা যেভাবে বাড়ছে তাতে সাংবাদিকরা উদ্বিগ্ন।
সাংবাদিকদের হেনস্তা আর মারধরের ঘটনা ঘটছে প্রায়ই। সাংবাদিকরা বলছেন, অনেক সময় কেন তাদের মারধর করা হচ্ছে তা বুঝতেও তাদের বেগ পেতে হচ্ছে।
গত বছর ৩৭০ ধারা বিলোপের পর থেকে কাশ্মীরে নিরাপত্তা বাহিনীর কড়াকড়ি আরো বেড়েছে। নিয়মিতই সাংবাদিকদের থানায় ডেকে পাঠানো হচ্ছে, খবরের সূত্র জানতে চাওয়া হচ্ছে বলে স্থানীয় সাংবাদিকরা বলছেন।
শ্রীনগরে বিবিসির সহযোগী সাংবাদিক মজিদ জাহাঙ্গীর বলছেন, ‘শুধু খবরের সূত্রই নয়, কখনো খবরটা কেন প্রকাশ করা হলো সেটাও যুক্তি দিয়ে বোঝাতে হয়। কয়েক জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়েছে—যার মধ্যে এক জন নারী সাংবাদিকও আছেন’, বলছিলেন তিনি।
জুন মাসে সরকার এক নতুন গণমাধ্যম নীতিমালা তৈরি করেছে, যাতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ব্যাপকভাবে খর্ব হচ্ছে বলেও তিনি বলছেন। গত মঙ্গলবারও নিরাপত্তা বাহিনী ও উগ্রপন্থিদের মধ্যে এক বন্দুকযুদ্ধ চলাকালে সেই ঘটনার খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে পুলিশের লাঠি-লাথি আর গালিগালাজ খেয়েছেন এক সাংবাদিক। কামরান ইউসুফ নামের ওই সাংবাদিক বলছেন, পুলওয়ামার ওই বন্দুকযুদ্ধের খবর জোগাড় করতে গিয়ে সম্পূর্ণ অকারণে তাকে মারা হয়েছে।
বিবিসির কাছে সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে কামরান ইউসুফ বলেন, ‘মঙ্গলবার খুব ভোরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমি পুলওয়ামার মারওয়াল গ্রামে যায়, যেখানে বন্দুকযুদ্ধ চলছিল। রাস্তায় গাড়ি স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে আরো বেশ কয়েকজন সহ-সাংবাদিক ও চিত্রগ্রাহককে দেখতে পেয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে যাই, কয়েকটা ছবিও তুলি।
‘হঠাত্ই কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর এক সদস্য এসে আমাদের সরে যেতে বলেন। যখন আমরা দূরে সরে যাচ্ছি তখনই জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের কয়েকজন অফিসার থামতে বলেন। সঙ্গী সাংবাদিকরা সরে গেলেও আমাকে তারা ধরে ফেলে পেটাতে থাকে। কেন যে তারা মারছে, সেটা বোঝার অবকাশও পাইনি, শুধু মনে হচ্ছিল যে আমাকে মেরেই না ফেলে,’ জানাচ্ছিলেন কামরান ইউসুফ। তাকে যে মারা হচ্ছে, তা দূর থেকে দেখে ইউসুফের দেওয়া ঘটনার বর্ণনা একেবারে সঠিক বলে বিবিসিকে জানিয়েছেন ওখানে হাজির আরো কয়েকজন সাংবাদিক।
কাশ্মীর এডিটার্স গিল্ডসহ সেখানকার প্রবীণ সাংবাদিকরা এই ঘটনার নিন্দা করে দোষী পুলিশ কর্মীদের শাস্তির দাবি তুলেছেন। পুলিশ বলছে, ওই সাংবাদিক বন্দুকযুদ্ধের জন্য যে জায়গা ঘেরা ছিল, তার ভেতরে চলে গিয়েছিলেন এবং তাকে সরে যেতে বলা হলে তিনি পুলিশের সঙ্গে অশান্তি করেন। যদিও পুলিশের এই বয়ানকে একেবারে অসত্য বলে জানিয়েছেন ইউসুফ। রাজ্য পুলিশের মহানির্দেশক দিলবাগ সিং অবশ্য এই ঘটনাকে দুর্ভাগ্যজনক বলে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
কাশ্মীরের সাংবাদিকরা জানাচ্ছেন, নিয়মিতই সাংবাদিকদের মারধর, হেনস্তা ও গ্রেফতার করা হচ্ছে। পুলিশ প্রশাসন যেমন হেনস্তা করে, তেমনই বিক্ষোভকারী জনতা থেকে শুরু করে উগ্রপন্থিদের দিকে থেকেও তাদের ভয়ের পরিবেশে কাজ করতে হচ্ছে।
সাংবাদিক মজিদ জাহাঙ্গীর বলছিলেন, ‘আপনারা কলকাতা বা দিল্লিতে সাধারণত যেভাবে খবর জোগাড় করেন, আমাদের একেবারে অন্যভাবে কাজ করতে হয়। নিরাপত্তাবাহিনী-বিক্ষোভকারী বা যাদের নন স্টেট অ্যাক্টর্স বলা হয়—সবদিক থেকেই আমাদের সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়।’
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশানাল ভারতশাসিত কাশ্মীরে সাংবাদিকদের হেনস্তার ঘটনাগুলোকে নিন্দা জানিয়েছে। তারা এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলেছে, ২০১৯ এর ৫ আগস্টের পর থেকে অন্তত ১৮ জন সাংবাদিকের ওপরে শারীরিক হামলা, হেনস্তা বা হুমকির ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছে তারা।
