হেফাজতে ইসলামের সর্বোচ্চ নেতা, আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী বড় মাদ্রাসার দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময়ব্যাপী দায়িত্ব পালন করা মহাপরিচালক, বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা বোর্ডের সভাপতি (সাবেক) মরহুম শাহ আহমদ শফী হুজুরের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল শনিবার যোহর নামাজের পর বেলা দুপুর ২টার দিকে দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসা মাঠ প্রাঙ্গণে পাখিয়ারটিলা কওমি মাদ্রাসার পরিচালক, শাহ আহমদ শফীর বড় সন্তান মাওলানা মোহাম্মদ ইউসুফের ইমামতিতে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। লাখো মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে স্মরণকালের বৃহত্ নামাজে জানাজা শেষে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর ইচ্ছে অনুযায়ী মাদ্রাসা ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে বায়তুল আতিক জামে মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালীসহ আশপাশের জেলাগুলোর বহু কওমি মাদ্রাসা থেকে বিপুল শিক্ষার্থী, আলেম, দেশবরেণ্য আলেমেদ্বীন আল্লামা শাহ আহমদ শফীকে শেষ বিদায় জানাতে আসলে মানুষের ঢলে উত্তর চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। কয়েক বর্গকিলোমিটার এলাকায় নামাজে জানাজায় শরিক হন লাখ লাখ মানুষ। জানাজা নামাজে শরিক হওয়া স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, হুজুরের একান্ত প্রচেষ্টায় এদেশের কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব হয়েছে।
এদিকে আহমদ শফীর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য ও শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ আরো অনেকে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালের দিকে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী অসুস্থ হয়ে পড়লে রাতে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সকালে হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা মেডিক্যাল বোর্ড বসান। তার শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় দুপুরের দিকে চিকিত্সকরা তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। পরে শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে তাকে হাসপাতালের আইসিইউতে থাকাবস্থায় এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় নিয়ে আজগর আলী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভর্তির কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। এর আগে চমেক হাসপাতালের এক চিকিত্সক সাংবাদিকদের জানান, বৃহস্পতিবার আল্লামা শফীর হার্টে মারাত্মক সমস্যা দেখা দেয়। বর্তমানে তার অবস্থা সংকটাপন্ন। তাই উন্নত চিকিত্সার জন্য দ্রুত ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন।
আহমদ শফী চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থানার পাখিয়ারটিলা গ্রামে ১৯১৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। আহমদ শফীর শিক্ষাজীবন শুরু হয় রাঙ্গুনিয়ার সরফভাটা মাদ্রাসায়। এরপর পটিয়ার আল জামিয়াতুল আরাবিয়া মাদ্রাসায় (জিরি মাদ্রাসা) লেখাপড়া করেন। ১৯৪০ সালে তিনি হাটহাজারীর দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং পরে ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসায় শিক্ষালাভ করেন। তবে আহমদ শফী ১৯৪৬ সালে চট্টগ্রামে ফিরে আসেন এবং আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসায় শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৮৬ সালে মাদ্রাসাটির মজলিশে শুরা তাকে মহাপরিচালক বা মুহতামিম নিযুক্ত করে। পরবর্তীতে তিনি মাদ্রাসাটির শায়খুল হাদিসের দায়িত্ব পান। তিনি ২০১০ সালে হেফাজতে ইসলাম নামে একটি ধর্মীয় সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। ২০২০ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর আহমদ শফীর পদত্যাগ এবং তার ছেলে আনাস মাদানীকে বিভিন্ন অভিযোগে মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কারসহ ৫ দফা দাবি নিয়ে দারুল উলুম হাটহাজারী মাদ্রাসার ছাত্ররা আন্দোলন শুরু করে। দুপুর দিকে এ আন্দোলন শুরু হয়, রাতে আনাস মাদানীকে বহিষ্কার করা হয় এবং পরদিন আহমদ শফী স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন।
