দিদার হাসান
বাংলাদেশে দুজন জ্ঞানী পণ্ডিতকে আমরা সত্যসন্ধানী ও নির্মোহবাদিতার উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে জানি ও মানি—তার একজন জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, অন্যজন জাতীয় অধ্যাপক ড. সালাহ্উদ্দীন আহমদ। বয়সে অগ্রজ যিনি, তিনি একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী; অনুজ যিনি, তিনি একজন ইতিহাসবিজ্ঞানী। আজ ইতিহাসবিজ্ঞানীর ৯৮তম জন্ম দিন। ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের এই দিনে ফরিদপুরে তার জন্ম। পুরো নাম তার আবুল ফয়েজ মুহম্মদ সালাহ্উদ্দীন আহমদ। কিন্তু নিজেই একপর্যায়ে নাম ছেঁটে শুধু সালাহ্উদ্দীন আহমদ লেখা শুরু করেন। ২০১৫ সালের ১৯ অক্টোবর তিনি প্রয়াত হয়েছেন ৯২ বছর বয়সে। তিনি ছিলেন একজন রেডিক্যাল হিউম্যানিস্ট। সমবয়সি তার বিদুষী স্ত্রী শিক্ষাবিদ হামিদা খানম প্রয়াত হয়েছেন ২০১১ সালে। তিনিও ছিলেন মানবতাবাদী। ‘ঝরা বকুলের গন্ধ’ নামে চমত্কার একটি স্মৃতি-আলেখ্য লিখেছেন তিনি শেষ বয়সে। যে গ্রন্থ পাঠে তাদের সম্পর্কে জানা যায় অনেক কিছু। সালাহ্উদ্দীন আহমদ আমৃত্যু মানবতাবাদের অসাম্প্রদায়িক ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধর্ম নিরপেক্ষ আদর্শ ধারণ ও লালন করেছেন। যেহেতু তিনি ছিলেন চিন্তানায়ক, ভারত উপমহাদেশের মানবতাবাদের প্রধান প্রবক্তা মানবেন্দ্রনাথ রায়ের ভাব শিষ্য, সে কারণে তার চিন্তা-চেতনা ও কর্মাদর্শ তার গুরুর ভাবাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত। অর্থাত্ যুক্তিবাদের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত তার মতাদর্শ। সব ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে একজন মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচিন্তার মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তিনি। তার প্রপিতামহ, পিতামহ, পিতা এবং তিনি নিজে তো বটেই সবাই ছিলেন উচ্চশিক্ষিত। প্রপিতামহ ছিলেন কলকাতায় মাদ্রাসার একজন ফারসি মৌলভি বা শিক্ষক। আর তার পুত্র মৌলভী আহমদ প্রথম বাঙালি মুসলমান হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে ১৮৮৬-৮৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় হয়ে অনার্স ও এমএতে দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম হন।
১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সরকারের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। পরে এসডিও ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক থাকা অবস্থায় ময়মনসিংহে তিনি ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রয়াত হন। আহমদের পুত্র আবু আহমেদ ফয়েজুল মহীও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ করে পিতার মতোই ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। তার সুযোগ্য পুত্র সালাহ্উদ্দীন আহমদ রিপন কলেজ থেকে আইএ, প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অনার্স, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ, পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এএম ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে বাবা-দাদার পথে না গিয়ে তিনি আত্মনিয়োগ করেন গবেষণা ও অধ্যাপনায়। সালাহ্উদ্দীন আহমদ ছাত্রজীবনে কিছুকাল যুক্ত ছিলেন ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে। ১৯৪৬ সালে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তিনি যুক্ত হন রেডক্রসের কর্মী হিসেবে। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতাটি তার জীবনবোধ বদলে দিয়েছে। বলেছেন, কবিতাটির অন্তর্নিহিত দেশপ্রেম, মানবতাবোধ একপর্যায়ে তাকে টেনে নিয়ে যায় সমাজতন্ত্রের দিকে নিপীড়িত মানুষের প্রতি মমত্ববোধ জন্মেছে ঐ কবিতা পাঠ করেই। দেশ ভাগের পরে ঢাকায় এসে জগন্নাথ কলেজে যোগ দেন ইতিহাসের লেকচারার হিসেবে ১৯৪৮ সালে। একই পদে ও বিভাগে ১৯৫৪ সালে গিয়ে যোগ দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে, পরে সেখানে একপর্যায়ে রিডার ও অধ্যাপক পদে বৃত হন। ১৯৬৩ সালে আমন্ত্রিত হয়ে তিনি ভিজিটিং লেকচারার হিসেবে কাজ করেন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া এবং শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৭২ সালের নভেম্বরে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং সেখান থেকে ১৯৭৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৮৮ সালে অবসর নিয়ে সেখানে সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে পড়িয়েছেন আরো কয়েক বছর। শিক্ষায় তার মূল্যবান অবদান বিবেচনায় সরকার তাকে একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করেছে। এছাড়াও তাকে ইতিহাসচর্চা, সংস্কৃতি ও শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য স্বর্ণপদক দিয়ে সম্মানিত করেছে বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতি, রবীন্দ্র পদক দিয়ে জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ ও স্বর্ণপদক দিয়ে মার্কেন্টাইল ব্যাংক। তিনি ছিলেন বাংলা একাডেমি ও এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের সম্মানিত একজন ফেলো। সালাহ্উদ্দীন আহমদ ছিলেন একজন রেনেসাঁপুরুষ। তিনি মনে করতেন উনিশ শতকীয় রেনেসাঁ আন্দোলন বাংলায় আধুনিক যুগের সূচনা করেছিল।
আধুনিক ধ্যান-ধারণাপুষ্ট এক মানবতাবাদী মানুষ হিসেবে তিনি এ-ও মনে করতেন—শতাব্দীপ্রাচীন ধর্মভিত্তিক মাদ্রাসা শিক্ষাই এ অঞ্চলের মুসলমানদের জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, চিন্তাচেতনায় পিছিয়ে থাকার মূল কারণ। ইতিহাসবিদ ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন তার এই শ্রদ্ধেয় শিক্ষক সম্পর্কে লিখেছেন, ‘তার যে ইতিহাসচর্চা তার মধ্যে উত্কীর্ণ একাধারে সর্বজনীনতা ও বিজ্ঞানমনস্কতা। তিনি বাংলার ইতিহাসের মানবিক, উদারবাদী ও অসাম্প্র্রদায়িক ঐতিহ্য যে পরিমাণ পাঠকের সামনে হাজির করেছেন তা দৃষ্টান্তমূলক।’ অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন তার এই শ্রদ্ধেয় শিক্ষক সম্পর্কে লিখেছেন—শ্রেণীকরণ করলে তাকে সামাজিক ঐতিহাসিকই বলতে হবে।’ সালাহ্উদ্দীন আহমদ— এই মানবতন্ত্রী শিক্ষাবিদ জীবনে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও পাণ্ডিত্যে অনেক সমৃদ্ধ হয়েও অতিসাধারণ হয়ে থাকার মানসিকতা পোষণ করেছেন। ছিলেন হিতবাদী, স্থির, পরমত সহিষ্ণু। কিন্তু ন্যায় ও সত্য বলায় অবিচল। প্রবাদতুল্য এই মনীষীর কাছে জাতি অশেষ ঋণী। জন্মদিনে তাকে স্মরণ করি অতল শ্রদ্ধায়।
n লেখক :সাংবাদিক
